ঈদুল আযহা ও কুরবানির মাহাত্ম্য

প্রত্যেক বছরের ন্যায় এবারও আমাদের মাঝে পবিত্র ঈদুল আযহা পশুত্ব প্রবৃত্তির কুরবানি করে মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করার সুমহান পশরা নিয়ে হাজির। প্রত্যেক সামর্থবান ব্যাক্তি এই কুরবানিতে অংশগ্রহণ করবেন। কেবল মাত্র পশু যবেহতেই কুরবানির পূর্ণাঙ্গ দাবী আদায় হয়না। কেননা যারা কুরবানি করবেন তাদের জন্য অবশ্যই কিছু বিধিবিধানও মানতে হবে। নিম্নে সে সমস্ত বিষয়ে আলোচনা পেশ করা হলো। হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লা-হু আলাইহি অসাল্লাম নবী হবার পর মক্কায় তেরটি বছর কাটান। তারপর তিনি আল্লাহ্র নির্দেশে মদীনায় চলে যান। অতঃপর কিছুদিনের মধ্যে তিনি আল্লাহ্র তরফ থেকে কুবানী দেবার আদেশ পান। এই হুকুম পাবার পর তিনি দশ বছর বেচেঁছিলেন। তাই ঐ দশ বছরই তিনি কুরবানি করতে থাকেন। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (স.) দশ বছর মদীনায় অবস্থান করেন এবং কুরবানিও করতে থাকেন (তিরমিযী, ১ম, খন্ড, ১৮২ পৃষ্ঠা, মিশকাত ১২৯ পৃষ্ঠা)। হাফেজ ইবনুল কাইয়িম বলেন, তিনি (স.) কখনো কুরবানি ফাঁক দেননি (যা-দুল মাআ-দ, ১ম খন্ড, ২৪৬পৃষ্ঠা)। তাই কোন সামর্থবান মুসলমানের পক্ষে কুরবানি ত্যাগ করা মোটেই উচিত নয়। এমনকি ধার করেও যদি কুরবানি দেওয়া সম্ভব হয় তাও দেওয়া উচিত। যেমন হযরত আয়শা (রা.) একদা রসূলুল্লাহ (স.) কে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমি দেনা করেও কুরবানি দেব কি? তিনি (স.) বললেন , হ্যাঁ। কারণ, এই দেনা শোধ হবেই (দারাকুতনী, ২য় খন্ড, ৫৪৪ পৃষ্ঠা)। এই হাদীসটিও মুহাদ্দিসীনে কিরাম ও ফকীহদের নিকট আমলযোগ্য। তবে কুরবানি-দাতাদের একটা কথা সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে যে, ঐ টাকা যেন সূদের টাকা না হয় এবং তাদের কুরবানি যেন লোক দেখানো কিংবা দুনিয়ায় নাম পাওয়া অথবা অহংকার প্রকাশ প্রভৃতির জন্য না হয়। কারণ, কুরবানির ব্যাপারে আল্লাহ বলেন: আল্লাহ্র কাছে (তোমাদের) কুরবানির পশুর গোশ্ত এবং রক্ত কখনই পৌঁছায় না। বরং তোমাদের মনের তাক্ওয়া ও আল্লাহভীতিই তাঁর কাছে পৌঁছায় (সূরা হজ্ব, ৩৭ আয়াত)। কেননা কুরবানির গরু, ছাগল, ভেড়া, উট ও দুম্বার কোনো প্রয়োজন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার নাই। তিনি চান তাকওয়া। মানুষ তার মনের পশুকে কুরবানি করে পশুত্বপ্রবৃত্তির ধ্বংসসাধন করে মনুষ্যত্ববোধকে যদি জাগ্রত ও উচ্চকিত না করে তাহলে এই কুরবানি নিছক লোক দেখানো ও অনুষ্ঠান সর্বস্ব ছাড়া আর কিছু হবে না। হাবীল ও কাবীলের কুরবানির ব্যাপারেও আল্লাহ বলেন, আল্লাহ কেবল মুত্তাকী ও আল্লাহভীরুদেরই কুরবানি কবুল করে থাকেন (সূরা মায়েদা, ২৭ আয়াত)। রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, ইয়াওমুন নাহের (অর্থাত্ বকরাঈদের দিনে) আদম সন্তান যত কাজ করে তন্মধ্যে আল্লাহ্র কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ (কুরবানির পশুর ) রক্তপাত। ঐ পশুর কেয়ামতের দিনে তার শিং ও পশম এবং খুরসহ নিশ্চয়ই হাজির হবে। আর ওর খুন যমীনে পড়ার আগেই আল্লাহ্র কাছে তা কবুলিয়াতের (গৃহীত হবার) দরবারে পৌঁছে যায়। অতএব তোমরা কুরবানি করে নিজেদের মনকে তৃপ্ত কর (তিরমিযী, ইবনে মাজা, মেশকাত, ১২৮ পৃষ্ঠা)। একদা সাহাবায়ে কেরাম রসূলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞেস করেন, কুরবানি কি? হে আল্লাহ্র রসূল! তিনি বললেন, এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীম আলায়হিস সালা-মের সুন্নত ও আদর্শ। তাঁরা আবার প্রশ্ন করলেন, এতে আমাদের লাভ কি? তিনি বললেন, প্রত্যেক পশমের বদলে একটি করে নেকী আছে (মুসনাদে আহমাদ, ইবে মাজা, মেশকাত ১২৯ পৃষ্ঠা)। একদা তিনি হযরত ফাতিমা (রা.) কে বলেন, ঐ পশুর প্রত্যেক রক্তবিন্দুর বদলে তোমার একটি কোরে গোনাহ্ মাফ হবে এবং ঐ পশুটিকে তার রক্ত ও গোশ্তসহ তোমার দাঁড়িপাল্লাতে সত্তর গুণ ভারী করে দেওয়া হবে ( মিরআত, ২য় খন্ড, ২৬২ পৃষ্ঠা)। কথাটি শুনে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রসূলুল্লাহ! এ নেকী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর বংশের জন্য খাস, না সর্বসাধারণ সবার জন্যেও? তিনি (স.) বললেন, এটা মুহাম্মদ (স.) এর বংশ ও সবার জন্য (বায়হাকী, কানযুল উম্মাল, ৫ম খন্ড, ১১৯ পৃষ্ঠা) ও ৫১ পৃষ্ঠা, মুস্তাদরেকে হাকেম, ৪র্থ খন্ড, ২২২ )। এ ব্যাপারে তিরমিযীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ তুহফাতুল আহ্ওয়াযী প্রণেতা আল্লামা আবদুর রহমান মুবারকপুরী এবং তাঁর শিক্ষাগুরু ইমাম হোসাইন দেহলভী বলেন, কুরবানি দেনেওয়ালাকে যাকাত দেনেওয়ালা ও ঘরে বসবাসকারী হওয়ার এবং মুসাফির না হওয়ার শর্তের ব্যাপারে হাদীসে কোন দলীল পাওযা যায় না। বরং মুসাফিরের কুরবানি করার ব্যাপারে হাদীসে ফিকেহর উল্টো দলীল পাওয়া যায়। যেমন ইমাম বুখারী (রহ.) মুসাফিরের কুরবানি করার ব্যাপারে একটি বাব বা পরিচ্ছেদ রচনা করেছেন এবং ঐ বাবের অধীনে একটি হাদীসও উল্লেখ করেছেন যে, রসূলুল্লাহ (স.) মক্কা সফরে কুরবানি করেছেলেন (ফাতা-ওয়া নাযীরিয়্যাহ, ২য় খন্ড, ৪৫৩ পৃষ্ঠা)। তাই ইমাম ইবনে হায্ম বলেন কুরবানির ব্যাপারে মুকীম ও মুসাফির অর্থাত্ ঘরে বসবাসকারী ও সফরকারীর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। থাকলো নাখ্য়ী বর্ণিত, হযরত ওমর হজ্ব করতেন কিন্তু কুরবানি দিতেন না হাদীসটি মুসাল এবং হযরত আলী বর্ণিত মুসাফেরে উপরে কুরবানি নেই, হাদীসটির এক রাবী হা-রিস ডাহা মিথ্যুক আর ইবনে মসউদের সাথীগণ হজ্বে কুরবানি দিতেন না এদ্বারা একথা প্রমাণিত হয় না যে, মুসাফিরকে আদৌ কুরবানি দিতে হবেনা। বরং এর দ্বারা শুধু এইটুকু প্রমাণিত হয় যে, তাঁরা কুরবানি দিতেন না। কিন্তুু রসূলুল্লার হাদীসের মোকাবেলায় অন্য কারো আমলই দলীলযোগ্য হতে পারে না। কারণ, কুরবানি করা ভাল কাজ। এই ভাল কাজ থেকে বিরত থাকা ততক্ষণ বৈধ হবে না যতক্ষণ রসূলুল্লাহ (স.) থেকে কোন হাদীস না পাওয়া যাবে (আল মুহাল্লা,৭ম খন্ড, ৩৭৫ পৃষ্ঠা)। অতএব কোন মুসাফির যদি সফরে থাকাকালিন কুরবানি দেবার সামর্থ রাখে তাহলে সে রসূলুল্লাহ (স.) এর আজীবন-সু্ন্নত পালনের চেষ্টা অবশ্যই করবেন। যদি কারো পক্ষে সত্ নিয়তে আল্লাহরওয়াস্তে সওয়াবের উদ্দেশ্যে ধার করেও কুরবানি দেওয়া সম্ভব হয় তাহলে সে তাও করার চেষ্টা করবে। কোন যয়ীফ হাদীসেও একথার প্রমাণ পাওয়া যায় না যে, রসূলুল্লাহ (স.) অথবা খুলাফায়ে রাশিদীন কুরবানি না করে তার দামটা সদাকাহ করে দিয়েছেন। কারণ, কুরবানি না কোরে তার দাম সদাকাহ করলে ইসলামের একটি মহান নিদর্শন ত্যাগ করা হয়। তাই কুরবানির পশু যবেহ করাটাই সামর্থবানদের জন্য অপরিহার্য (মিরআত, ২য় খন্ড, ৩৫০ পৃষ্ঠা)। দেওবন্দের সাবেক মুফতী মওলানা শাফী (রহ.) বলেন, কুরবানির তিনদিনে পশুর দাম সদকাহ করলে কুরবানি আদায় হবেনা। বরং সে সর্বদা গোনাহ্গার হবে। কারণ, কুরবানি স্বতন্ত্র একটি ইবাদত। যেমন নামায পড়লে রোযা এবং রোযা রাখলে নামায আদায় হয়না, যাকাত দিলে হজ্ব আদায় হয়না। আল্লাহ্ আমাদেরকে প্রকৃত বিষয় জানার এবং তা আমল করার তাওফিক দান করুন আমীন! E-mail:mzhazadi@yahoo.com