দীর্ঘ প্রতীক্ষার মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের উদ্বোধন আজ
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৩, ২২:১৯
নির্ধারিত সময়ের আগেই চালু হচ্ছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার। আজ বিকাল সাড়ে তিনটায় গুলিস্তানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। এরপর তিনি সেখান থেকে ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে গাড়িতে চড়ে কুতুবখালি প্রান্তে যাবেন এবং সেখানে ফলক উন্মোচন করবেন। ফ্লাইওভার উদ্বোধন উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে আজ বিকাল সাড়ে ৪টায় এক সুধী সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী। আগামীকাল শনিবার থেকে ফ্লাইওভারটি যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ২২ জুন এ ফ্লাইওভারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। দেশের দীর্ঘতম এই ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা ছিল এ বছরের ডিসেম্বর। কিন্তু অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই এর উদ্বোধন সম্ভব হচ্ছে।
চার লেনের এ ফ্লাইওভারের মোট দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার। প্রথমে এর দৈর্ঘ্য ছিল ৭ কিলোমিটার। পরে মহানগরীর উন্নয়ন পরিকল্পনা মাথায় রেখে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে সমন্বয় ও পলাশী অভিমুখে ফ্লাইওভার সম্প্রসারণের কারণে এর দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়। প্রধান প্রধান সড়ক ও বাস টার্মিনালের সঙ্গে ফ্লাইওভারটির সংযোগ রাখা হয়েছে। এর ৬টি প্রবেশমুখ এবং ৫টি বের হওয়ার পথ রয়েছে।
ফ্লাইওভারটির নির্মাণ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। তবে এটি নির্মাণে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে কোন অর্থ ব্যয় হয়নি। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে এ প্রকল্প সম্পন্ন করেছে ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। ওরিয়ন গ্রুপই সম্পূর্ণ অর্থায়ন করেছে। ফ্লাইওভারটির ডিজাইন করেছে কানাডীয় কোম্পানি লি কানাডা। এটি নির্মাণ করছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল লিমিটেড। নির্মাণ কাজের ব্যবস্থাপনা করছে লাসা নামে ভারতের আরেকটি কোম্পানি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ফ্লাইওভারের গুলিস্তান, পলাশী, মতিঝিল ও কুতুবখালি পর্যন্ত পথ খুলে দেয়া হবে। সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ডের জনপথের কিছু কাজ বাকি আছে। ঢাকা ওয়াসার ইউটিলিটি লাইন, বিভিন্ন প্রকার অবৈধ দখলদারীদের অপসারণে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে জনপথ, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক এবং পুরাতন ডেমরা সড়কের সংযোগকারী র্যাম্প নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি। ডিসেম্বরের মধ্যেই এসব কাজ শেষ হবে।
ফ্লাইওভারে যানবাহন প্রবেশের সময় টোল দিতে হবে না। বের হওয়ার পথে টোলের জন্য নির্ধারিত অর্থ দিতে হবে। তবে জনসাধারণের প্রবেশে কোন বাধা থাকবে না, টোলও দিতে হবে না। যানবাহন অনুযায়ী নির্ধারিত টোলের হার: ট্রেইলার ২০০ টাকা, ট্রাক ১৫০ টাকা, বাস ১৫০ টাকা, ট্রাক (চার চাকা) ১০০ টাকা, মিনি বাস ১০০ টাকা, পিকআপ ৭৫ টাকা, মাইক্রোবাস ৫০ টাকা, জিপ ৪০ টাকা, প্রাইভেট কার ৩৫ টাকা, অটোরিক্সা ১০ টাকা, দুই চাকার বাহন ৫ টাকা।
ওরিয়ন গ্রুপ নিজেই ফ্লাইওভারটির ব্যবস্থাপনা, টোল আদায় এবং রক্ষণাবেক্ষণ করবে। চালুর পর থেকে ২৪ বছর টোল আদায় করবে ওরিয়ন গ্রুপ। টোল থেকেই নির্মাণ ব্যয় তুলে নেবে তারা। পরে এটি হস্তান্তর করা হবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কাছে। তবে প্রতিদিন যে টোল আদায় হবে তার শতকরা ৫ ভাগ দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের খাতে জমা হবে। ফ্লাইওভারটির আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ১০০ বছর।
এই প্রথমবারের মতো টোল আদায়ে ব্যবহার করা হবে এভিসি (অটোমেটিক ভেহিকেল ক্লাসিফিকেশন) পদ্ধতি। ফ্লাইওভার ব্যবহারকারী গাড়িতে প্রি-পেইড স্টিকার লাগানো থাকবে। কোন গাড়ি ফ্লাইওভার অতিক্রম করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল কেটে নেয়া হবে। এছাড়া টোল প্লাজাতেও নগদ টোল পরিশোধ করা যাবে।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৮ সালে বিশ্বব্যাংক গুলিস্তান থেকে যাত্রাবাড়ি পর্যন্ত দুই কিলোমিটার ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য আড়াইশ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের একটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী ফ্লাইওভারটি নির্মাণ কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর। ২০০০ সালে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের আওতায় একটি সমীক্ষা সম্পন্ন হয়। এতে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার ছাড়াও মহানগরীর তিনটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের উন্নয়ন, প্রধান প্রধান সড়ক সংস্কার ও উন্নয়ন, আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন, পথচারী চলাচলের জন্য ফুটপাত ও ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু এ প্রকল্পের অন্যসব কাজ শেষ হলেও গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ শুরু বিলম্বিত হতে থাকে। অবশেষে ২০০৩ সালে এ ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ হাতে নেয় তত্কালীন সরকার। কিন্তু সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের পরিবর্তে প্রকল্পটি বিল্ট-ওন-অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার (বিওওটি) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই বছর যখন প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় তখন এর বিনিয়োগ ব্যয় ধরা হয় ৬৭০ কোটি টাকা এবং এর মোট দৈর্ঘ্য ছিল ৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার। প্রায় দুই বছর পর ২০০৫ সালের ২১ জুন ফ্লাইওভারটি নির্মাণে ওরিয়ন গ্রুপের সাথে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের চুক্তি হয়। কিন্তু কাজ শুরুর পূর্ব মুহূর্তে তত্কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে এ প্রকল্পের সকল কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে ‘জনগুরুত্বপূর্ণ’ এই ফ্লাইওভার নির্মাণে কার্যক্রম পুনরায় গ্রহণ করে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে পুনরায় সমীক্ষা পরিচালনার মাধ্যমে ফ্লাইওভারের নকশা আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন। এরপর সংশোধিত নকশায় ফ্লাইওভারের মোট দৈর্ঘ্য বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার।