দুর্গাপূজা
সার্বজনীন
উত্সব
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:৪৮
রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণের শাসনামলে বাংলায় দুর্গাপূজার শুভ সূচনা হয়। একসময় দ্বিতীয় কালাপাহাড়ের অভ্যুদয় ঘটে এবং বাংলা, বিহার, উড়িষ্যায় ধ্বংসের বিভীষিকার সূচনা হয়। রাজা কংসনারায়ণ সম্রাট আকবরের কাছে সুরক্ষা প্রার্থনা করেও খুব একটা আশ্বস্ত হতে পারেনি। পরে তাহেরপুরে প্রত্যাবর্তন করে জমিদারীতে মনোযোগ দিলেন, কিন্তু মনের অগোচরে আশঙ্কায় স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। অবশেষে পন্ডিতদেরকে ডেকে প্রায়শ্চিত্তকল্পে মহাযজ্ঞে ব্রতী হতে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। বাসুদেবপুরের ভট্টাচার্য বিখ্যাত তান্ত্রিক রমেশ শাস্ত্রী তখন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সর্বশ্রেষ্ঠ পন্ডিত হিসাবে সুপরিচিত। কিভাবে দুষ্টগ্রহের প্রভাব থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় এরূপ রাজার প্রশ্নের উত্তরে শাস্ত্রী বিধান দিলেন যে, “শাস্ত্রে বিশ্বজিত্, রাজসুয়, অশ্বমেধ ও গোমেধ যজ্ঞের বিধান আছে। প্রথম দুটির জন্য রাজা অধিকারী নয় এবং শেষ দুটি কলিতে নিষিদ্ধ এবং ক্ষত্রিয়ের করণীয়।” রাজা বিমর্ষ হলেন। রমেশ শাস্ত্রী উত্তর দিলেন, “বিধান আছে, তা হচ্ছে কলিতে মহাযজ্ঞ হচ্ছে দুর্গোত্সব। এ যজ্ঞে সকল যজ্ঞের ফল লাভ হয়। সত্য যুগে সুরথ রাজা এ যজ্ঞে ব্রতী হয়ে ফল লাভ করেছেন এবং ত্রেতা যুগে ভগবান রামচন্দ্র রাবণ বধের উদ্দেশ্যে অকালে মা দুর্গার পূজা করে সফলকাম হয়েছিলেন। অতঃপর রাজা কংসনারায়ণ রাজসিকভাবে দুর্গোত্সবের আয়োজন করেন এবং বলা যায় রমেশ শাস্ত্রীই আধুনিক দুর্গোত্সব পদ্ধতির প্রথম প্রণেতা।
বাংলায় এভাবেই প্রথম প্রতিমায় শারদীয়া মা দুর্গার আবির্ভাব ভাবনা ও রূপদান করা হয়। রাজা কংসনারায়ণ তখনকার দিনে সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয় করে বিশাল আয়োজনের মাঝে দুর্গোত্সবের উদযাপন করে সমগ্র ভারতবর্ষে ব্যাপক সাড়া জাগিয়ে তুলেন। ইংরেজ রাজ-কর্মচারীরাও অংশগ্রহণ করে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। রাজা কংস নারায়ণের অনুকরণে ভাদুড়িয়ার রাজা জগত্নারায়ণ মহাসমারোহে সুরথ রাজার বিধানে বাসন্তী পূজা করলেন। এভাবেই শুরু হলো বাংলায় দুর্গাপূজার সমারোহ, আরতি প্রতিযোগিতা, শারদীয়া উত্সবের আমেজ। রাজা কংসনারায়ণের সভা পন্ডিত ছিলেন কৃত্তিবাস পন্ডিত। তিনি ছিলেন নদীয়া জেলার ব্রাহ্মণ। রাজার অনুরোধে ১৪৬০ শকাব্দে বাংলায় রামায়ণ রচনা করেন, যা কৃত্তিবাসী রামায়ণ নামে বাংলার ঘরে ঘরে নতুন এক আলোড়ন সৃষ্টি করে। রামায়ণকে কেন্দ্র করে শুরু হয় নাটক, যাত্রার পালা, কবিগান ও বিবিধ উত্সব। এসকল আয়োজনের মাঝে বাংলার সামাজিক অঙ্গনে আসে এক নবজাগরণ। সংস্কৃতি অঙ্গনে শুরু হয় এক বিপ্লব, যা শারদীয়া দুর্গোত্সবের মাঝে বিকশিত হয় বাংলার সকল মানুষের মাঝে এবং ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতাকে ছাড়িয়ে সকল ধর্মের লোকজনকে আকর্ষণ করে ব্যাপকভাবে বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ হিসাবে। তবে দুর্গোত্সব রাজা-মহারাজা এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মাঝে প্রথমদিকে সীমিত থাকলেও পরবর্তীতে সার্বজনীন রূপ লাভ করে সকলের মাঝে এর ভিন্ন আবেদনের সূচনা করে।
দিকে দিকে সুর ধ্বনিত হয়:
“মিলেছি আজ মায়ের ডাকে!
ঘরের হয়ে পরের মতো
ভাই ছেড়ে ভাই ক’দিন থাকে।”
বাংলাদেশে পঞ্চাশের দশকেও দুর্গাপূজা ছিলো গ্রামকেন্দ্রিক এক আনন্দঘন আয়োজন। প্রায় প্রতিটি গ্রামে পূজা অনুষ্ঠিত হতো এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা ধর্মীয় ভাবনার ঊর্ধ্বে উঠে সার্বিক সহযোগিতা করতেন। দুর্গাপূজা মন্ডপের আঙ্গিনায়, রামায়ণ কীর্তন, পালাগান, কবির লড়াই অনুষ্ঠিত হওয়ার দৃশ্যই ছিলো গ্রামের সকল মানুষের মাঝে আনন্দঘন এক মহামিলনের কেন্দ্রবিন্দু। দুর্গাপূজা উপলক্ষে মেলাঙ্গনে বসতো আনন্দমেলা, তাতে ন্াগরদোলা থেকে শুরু করে মুরগীর লড়াই সবই ছিলো বিশাল আয়োজনের অংশ। বাংলাদেশে যাদের বয়স এখন ৬০-এর ঊর্ধ্বে সবাই বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে এ উত্সবকে উপভোগ করেছেন। বিভিন্ন রকমের
নারিকেলের সন্দেশ, নাড়ু, নানান রকমের পিঠা, মিঠাই মন্ডা, এসবই ছিলো বাংলার শারদীয় উত্সবের প্রধান আকর্ষণ এবং মিলন মেলার অংশ ।
বস্তুত বাঙালি জীবনে এক উদার, সহনশীল, সমন্বয়ধর্মী, মানবতাবাদী ধারা দৃশ্যমানভাবে প্রবাহিত ছিলো বংশানুক্রমে। তাই বাঙালি কবির পক্ষেই লিখা সম্ভব: “শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।” এ মনোভাব এবং সমন্বয়ধর্মী মতাদর্শ প্রকাশিত হয়েছে আঠার ও ঊনিশ শতকের মরমী কবি লালন ফকিরের গানে—
“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে ।
লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে।”
বাংলার লালিত আদর্শ ও সংস্কৃতির পদমূলে আঘাত করেছে এক “নীরব চক্রান্ত” যা সামপ্রদায়িকতা, ধর্মীয় মৌলবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং উগ্রপন্থী অপশক্তিকে আমন্ত্রণ করে বাঙালির জীবনধারাকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। এ চক্রান্তকে তীব্র ও ভয়াবহ করেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্নর আবদুল মোনায়েম খান। তিনি ১৯৬৪ সালে ভয়াবহ দাঙ্গা বাধিয়ে আঘাত হানেন শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে, গোটা বাঙালির জীবনধারায়। তারপর ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান ১৭ দিনের যুদ্ধের পর হিন্দুদের সম্পত্তি হয়ে যায় শত্রু সম্পত্তি এবং রচিত হয় হিংসার মহীরুহ যার প্রভাব এখনো চলছে। তাই এখন আর গ্রামে-গঞ্জে দুর্গাপূজা তেমন আনন্দের মাঝে অনুষ্ঠিত হয় না, কখনো নিরাপত্তার ভয়ে, আবার কখনো স্থানীয় সরকারের সহযোগিতার অভাবে। দুর্গাপূজা এখন হয়েছে শহরকেন্দ্রিক। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ বড় বড় মহানগরে মহাধুমধাম। অনেক পূজা অঙ্গনে কবিগান বা পালাগানের বদলে চলে মন্ত্রী, উপদেষ্টাদের প্রশংসা এবং তাদের আগমনকে ঘিরে বিশাল আয়োজন। তাদের বাণী দিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ পায়, যেখানে সুন্দর সুন্দর কথা থাকে অথচ তারা তা বিশ্বাস করে না। অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে পূজা হয়। সরকারের সাহায্য এবং দলের সহানুভূতিতে পূজার আয়োজন হয় বিশাল, প্রচার ও প্ররোচনায় ভরপুর। কিছু কিছু পৌরসভায় দলীয় পুজামণ্ডপ হিসাবেও পরিচিতি লাভ করে। আবার নব্য ধনীরা নিজেদেরকে জাহির করার জন্যে কিছু বিনিয়োগ করে ঘোষণা দিয়ে। দেবীদুর্গার পূজা অর্চনা হয়ে উঠেছে অনেকটা রাজনীতি ও দলবাজির মিলনমেলা হিসাবে। এখন পূজার প্রসাদ হচ্ছে খিচুড়ি বা পোলাও বা মিষ্টি-মিঠাই। ঐতিহ্যবাহী নাড়ু বা সন্দেশ যেমন নেই, তেমনি নেই বারোয়ারি দুর্গোত্সবের চেতনা, অনুভূতি বা স্পর্শ। তারপরও বলবো বিজয়া -সন্মিলনের দিনের মতো আমাদের হূদয় ভরে উঠুক প্রাণদাতা, শক্তিদাতা, সম্পদদাতা স্বদেশের প্রগতির ভাবনায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, “একবার করজোড় করিয়া নতশিরে বিশ্বভুবনেশ্বরের কাছে প্রার্থনা কর:
“বাংলার মাটি, বাংলার জল,
বাংলার বায়ু, বাংলার ফল
পুণ্য হউক পুণ্য হউক
পুণ্য হউক হে ভগবান।।”
লেখক:প্রাক্তন সচিব