বিশ্বজননী দুর্গার আগমন: শান্তি ও সম্প্রীতির বিশ্বায়ন
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:৫০
বাংলাদেশে এবার পূজা ও ঈদ পাশাপাশি উদযাপিত হবে শান্তিপূর্ণভাবে এ আকাঙ্ক্ষা জনগণের। সর্বজনীন দুর্গোত্সব হয়ে উঠুক বিশ্বজনীন দুর্গোত্সব। ঘুছে যাক গ্লানি, শুচিপূর্ণ হোক ধরণীতল। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার আশীর্বাদে প্রতিষ্ঠিত হোক বিশ্বশান্তি, পরাজিত হোক সন্ত্রাস ও অপশক্তি
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিকট দুর্গাপূজার ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক তাত্পর্য রয়েছে। ভারতবর্ষে তথা এই উপমহাদেশে দুর্গাপূজার বিস্তার ঘটেছে সাংস্কৃতিক ভিত্তি, সামাজিক তাত্পর্য অবলম্বনে। পশুশক্তি বধে দেবী দুর্গার আরাধনা করে উপকৃত হয়েছিলেন স্বর্গের দেবতাগণ। মর্ত্যলোকে অনুরূপভাবে শান্তিপ্রিয় মানুষ অপশক্তি ও সন্ত্রাস দমনে দেবী দুর্গার নিকট থেকে প্রেরণা লাভ করেছে। অশুভ সামাজিক শক্তি, রাজনৈতিক শক্তি যখন জনগণের শান্তি ও সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে তত্পর হয় এবং সমাজে সন্ত্রাসের তাণ্ডব বেড়ে যায় তখন সম্মিলিত সামাজিক শক্তি, সাংস্কৃতিক শক্তি অপশক্তি প্রতিরোধে সোচ্চার হয়। দেবতারা যেমন দেবী দুর্গার আরাধনা করেছে অসুর শক্তি বধ করে আত্মরক্ষার জন্য। তেমনি মর্ত্যলোকের মানুষ শুভ শক্তির বিজয়ে প্রেরণা লাভ করেছে দেবী দুর্গার অসুর দমনের দৃষ্টান্ত থেকে। বর্তমান বিশ্বে চলছে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা। সন্ত্রাসের ভয়ংকর থাবা অশান্ত করে পৃথিবী। শান্তিকামী মানুষ চায় জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকার বাস্তবায়ন, সন্ত্রাস প্রতিরোধ এবং শান্তি ও নিরাপত্তা স্থাপন। অশান্ত ধরণীতলে প্রতিবছর দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে শান্তির বারতা নিয়ে। দেবী দুর্গা বিশ্ববাসীর শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রতীক রূপে পূজ্য হন। এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রতিবছর অনাড়ম্বরে ও সাড়ম্বরে পালিত হয় দুর্গোত্সব। এ উত্সবের মহিমা ও তাত্পর্য অনুভব করেন বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ। সর্বজনীন দুর্গোত্সব নিয়ে আসে আনন্দের আয়োজন, শান্তির আবাহন। প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেবী-দুর্গার তাত্পর্যময় উপস্থিতি ঘটে পূজারীদের নিকট। দেবী দুর্গা দশভূজা, বিচিত্র শক্তির প্রতীক।
ভারতে কয়েক লক্ষ মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়াসহ প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দুর্গাপূজার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির কারণ হলো সন্ত্রাস দমন ও শান্তি স্থাপন। দুর্গাপূজার তাত্পর্যমূলত সন্ত্রাস ও অশুভ শক্তি দমন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা। এজন্য বিশ্বব্যাপী এ পূজার সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে তার গ্রহণযোগ্যতা। সর্বজনীন দুর্গোত্সব বিশ্বজনীন আনন্দের উত্স। আনন্দকামী ও শান্তিপ্রিয় সর্বশ্রেণীর সাধারণ মানুষের নিকট তাই এ ধর্মীয় উত্সব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উত্সব হিসেবে গণ্য ও গৃহীত।
‘রূপং দেহী, জয়ং দেহী, যশো দেহী, দ্বিষো জহি’ অর্থাত্ মা দুর্গা তুমি আমাকে রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং শত্রুর কবল থেকে মুক্ত কর— এই প্রার্থনা এবং চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে মহালয়ার পুণ্য তিথিতে মর্ত্যলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয় বিশ্বজননী দেবী দুর্গাকে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক শীর্ষস্থানীয় সামাজিক অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গোত্সব। বসন্তকালেও এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তাকে বলে বাসন্তী পূজা। তবে শারদীয় দুর্গোত্সব অধিক জনপ্রিয়।
শাস্ত্রীয় বিধানে আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষে অনুষ্ঠিত হয় শারদীয় দুর্গোত্সব। বর্তমানে পাশ্চাত্য, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মসূত্রে বসবাসরত বাঙালিরা মহাসমারোহে দুর্গোত্সবের আয়োজন করে থাকেন। এ কারণে সারা বিশ্বেই বর্তমানে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দুর্গোত্সব। ২০০৬ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্রেট হলে স্থানীয় বাঙালি অভিবাসীবৃন্দ ও জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ভয়েসেস অব বেঙ্গল সিজন নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর অঙ্গ হিসেবে আয়োজন করেন বিশাল দুর্গোত্সবের। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ দিন অর্থাত্ ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচদিন অনুষ্ঠিত হয় দুর্গোত্সব। এই পাঁচটি দিন পরিচিত দুর্গা ষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে। সমগ্র পক্ষটি আবার দেবী পক্ষ নামে আখ্যায়িত হয়। দেবী পক্ষের সূচনা হয় পূর্ববর্তী অমাবস্যার দিন। এই দিনটি পরিচিত হয় ‘মহালয়া’ নামে। দুর্গাপূজা মূলত পাঁচদিনের অনুষ্ঠান হলেও মহালয়া থেকেই প্রকৃত উত্সবের সূচনা। শারদীয় দুর্গোত্সবের পূর্বাপর উত্সব হিসেবে মহালয়া উত্সব, লক্ষ্মীপূজা, দিপাবলী ও শ্যামাপূজা সমন্বয়েই বর্তমানে উদযাপিত হয় শারদোত্সব বিশেষত বাঙালি সনাতনী সমাজে। প্রকৃত পক্ষে শারদোত্সবের শুভারম্ভ মহালয়া দিয়ে এবং দিপাবলী ও শ্যামাপূজা দিয়ে সমাপনী। শ্যামাপূজা হেমন্ত ঋতুর প্রারম্ভে হলেও বিন্যাসটি পরিগণিত হয় শারদীয় উত্সবের অন্তর্ভুক্ত বলে। প্রথাগত অনুসৃতি রয়েছে মহালয়া অমাবশ্যায় (পার্বণ শ্রাদ্ধে) যে পূর্ব পুরুষদের শ্রদ্ধার সাথে আমন্ত্রণ জানিয়ে মহাশক্তি মহামায়া দেবী দুর্গার জাগরণ তথা বোধন করা হয় তাদেরই আবার বিদায় জানানো হয় দীপান্বিতা অমাবস্যায় দীপাবলি উত্সবের মাধ্যমে। দীপান্বিতা উত্সবের আনুষ্ঠানিকতায় আবাহনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় মহামায়া শ্যামামায়ের পূজা কৃষ্ণপক্ষের শেষ তিথি অমাবশ্যায়।
দেবী দুর্গা মূলত পূজিতা হন দশভূজারূপে। তবে অঞ্চলভেদে পূজিতা হন অষ্টাদশভূজা, অষ্টভূজা, শতভূজারূপেও। এর প্রত্যেকটিরই রয়েছে একেকটি তাত্পর্য। মা যে সবদিকই দেখছেন এবং নিয়ন্ত্রণ করছেন সেটাই নির্দেশিত হচ্ছে এর মাধ্যমে। মায়ের দশহাতে দশ প্রহরণের ব্যাখ্যা রয়েছে। আবার তাত্পর্য বিমণ্ডিত রয়েছে মহামাতার চলচিত্রে বিন্যস্ত সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের প্রতীক সমাহার এবং সকল বর্ণের প্রতীকের সম্মিলন। প্রকৃতি প্রতিনিধি নয়টি গাছের চারা (কদলী, কচু, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বেল দাড়িম্ব, অশোক, মান ও ধান) দিয়ে নবপত্রিকা। বা কলাবৌ সাজিয়ে মঞ্চশোভিত করা হয় যা একাধারে প্রতীক প্রকৃতি পূজার। দুর্গাপূজায় বিবিধ উপচার ও বিষয়ের সমন্বয় ও সমাহারে পূজার সর্বতোমুখী আয়োজনে দুর্গোত্সব পরিণত হয়েছে সর্বজনীন এক মহোত্সবে। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—
‘মার অভিষেক এসো এসো ত্বরা
মঙ্গল ঘট হয়নি ভরা
সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থ নীড়ে’।
পরাশক্তির অধিকারী অসুরকে বধ করার জন্য মা দুর্গা সুসজ্জিত দশ হাতে দশ অস্ত্রে। তাঁর দশ হাত প্রতীক দশদিক রক্ষার। তাঁর পায়ের নিচে রয়েছে উদ্ধত সিংহ আর উদ্ধত অসুর। সিংহ রাজসিক আর অসুর প্রতীক তানসিক শক্তির। পশুরাজ সিংহ বহন করে সাত্ত্বিক পুণ্যাশ্রয়ী দেবীকে। দেবী কাঠামোতে শোভা পায় দেব সেনাপতি কার্তিক, যিনি প্রতীক শক্তির। সিদ্ধিদাতা গণপতি গনেশ, বিদ্যাদায়িনী সরস্বতী ও প্রভূত ঐশ্বর্যময়ী শ্রীদেবী লক্ষ্মী। সবার উপরে উপবিষ্ট রয়েছেন মঙ্গলের বার্তাবাহী দেবাদিদেব মহাদেব। সকলেই শোভা পান দেবীর এক এক শক্তির প্রতীক হিসেবে। তিনি সর্বভূতের প্রাণরূপী মহাদিব্য মূর্তি মা ও জগত্ মঙ্গলময়ী দুর্গা। মহাদেবী মা দুর্গার কৃপায় ত্রিলোকবিজয়ী মহিষাসুরের বিনাশ ঘটে এবং দোতারা ফিরে পান তাঁদের হূতরাজ্য। দেবীর কৃপায় অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে জয় হয় শুভ শক্তির তথা ধর্মশক্তির। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে দুর্গাপূজা পালিত হয়ে থাকলেও ভারতীয় উপমহাদেশে এ উত্সবের জাঁকজমক সর্বাধিক। বাংলাদেশেও এ উত্সব পালিত হয় বিশেষ উত্সাহে। রাজধানীসহ সর্বোত্র পূজামন্ডপের সংখ্যা বাড়ছে।
বাংলাদেশে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জন এফ মরিয়ার্টি বলেছিলেন, ‘দুটি সম্প্রদায়ের বড় দুটি ধর্মীয় উত্সব শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হওয়ায় প্রমাণ হচ্ছে এ দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।’ বিগত দিনগুলোতে এ দেশে যারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে তত্পরতা চালিয়েছে পরিণামে তাদেরই ক্ষতি হয়েছে। দেবতার প্রাসাদে হামলাকারীরা সন্ত্রাসী, ধার্মিক নয়। এ জন্য সন্ত্রাসী ও অপশক্তির পরাজয় ঘটেছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে। বাংলাদেশে এবার পূজা ও ঈদ পাশাপাশি উদযাপিত হবে শান্তিপূর্ণভাবে এ আকাঙ্ক্ষা জনগণের। সর্বজনীন দুর্গোত্সব হয়ে উঠুক বিশ্বজনীন দুর্গোত্সব। ঘুছে যাক গ্লানি, শুচিপূর্ণ হোক ধরণীতল। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার আশীর্বাদে প্রতিষ্ঠিত হোক বিশ্বশান্তি, পরাজিত হোক সন্ত্রাস ও অপশক্তি।
লেখক: সাহিত্যিক ও গবেষক