জলবায়ু পরিবর্তনে অস্তিত্ব সংকটে চলনবিল
রুহুল আমিন, চলনবিল সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১০
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চলনবিলের অস্তিত্ব আজ সংকটের সম্মুখীন। আগে বর্ষা মৌসুমে টানা ৪ মাস চলনবিলে পানি থৈ থৈ করতো। সেই চলনবিল এখন প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে জমিতে সেচ দিতে পারছে না বিল এলাকাস্থ ৯ উপজেলার কৃষকগণ। শেষ সেপ্টেম্বরে চলনবিলের এমন পানিশূন্য অবস্থা আগে কখনও দেখা যায়নি। প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত না হলে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে জমিতে সেচ দিয়ে রবি ফসল আবাদ করতে হবে বলে কৃষক ও কৃষি বিভাগ জানিয়েছে।
প্রাপ্ততথ্যে জানা যায়, চলনবিল এলাকায় তিন দশক আগের তুলনায় বৃষ্টিপাত অনেক হ্রাস পেয়েছে। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এক দশক আগেও যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হতো এখন তা অনেক হ্রাস পেয়েছে। যার দরুন সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে বিলের নিচু অঞ্চলের ক্ষেত-খামার পানিশূন্য হয়ে পড়েছে, যা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। আগাম বন্যার পানি চলনবিল থেকে নেমে যাওয়ায় মাছের অস্তিত্বও বিপন্ন হবার পথে। বিগত এক দশকে চলনবিল থেকে হারিয়ে গেছে অনেক প্রজাতির মাছ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম তার সাম্প্রতিক গবেষণা রিপোর্টে এ কথা উল্লেখ করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আশির দশকেও মে থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত প্রচুর বৃষ্টিপাত হতো। আষাঢ় মাসে চলনবিলের নিচু ও সামান্য নিচু অঞ্চলে বর্ষার পানি প্রবেশ করার পর নভেম্বর মাসের প্রথম পক্ষ পর্যন্ত কম-বেশি বর্ষার পানি অবস্থান করতো। ১৯৯১ সালের পর থেকেই আবহাওয়া অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। বৃষ্টি অনিয়মিতভাবে হতে থাকে। ১৯৯২ সালে বৃষ্টিপাত হ্রাস পায় এবং চলনবিলে পানি সংকট দেখা দেয়। এরপর তিন বছর স্বাভাবিক বন্যা হলেও ১৯৯৬ সালে আবারও পানি সংকটে ফসলের ক্ষতি হয়। বিগত ৫ বছরে চলনবিলে বৃষ্টিপাত আগের তুলনায় অনেক হ্রাস পেয়েছে। এ বছর বৃষ্টিপাত হয়েছে আরও কম। বিগত ৫ বছরের তুলনায় এবারে বন্যার পানির উচ্চতা কম ছিল। তবে এত দ্রুত পানি বিল থেকে নেমে যাওয়ার ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটেনি। এ বছর বর্ষার পানির সাথে মাছের পোনার আগমন ঘটেছিল অপেক্ষাকৃত কম।
এ বছর বিলের কিছুটা নিচু জমিতে বোনা আমন ধান ক্ষেত পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। ৯ উপজেলায় ৫৮ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় বৃষ্টি না হওয়ায় এসব বোনা আমন ধান বিনষ্ট হবার আশংকায় কৃষকেরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। তাড়াশ, সিংড়া, আত্রাই, গুরুদাসপুর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া উপজেলায় মোট ৭০ হাজার হেক্টরের মত সরিষার আবাদের পরিকল্পনা রয়েছে কৃষক ও কৃষি বিভাগের। কিন্তু আত্রাই থেকে বাঘাবাড়ি পর্যন্ত ক্ষেত খামার পানিশূন্য হয়ে পড়ায় সরিষার আবাদ করতে সমস্যায় পড়বে কৃষকগণ। এক মাস আগেই ক্ষেত পানিশূন্য হয়ে পড়ায় সেখানে প্রচুর ঘাস গজাবে। ঘাস পরিষ্কার করে জমিকে চাষ উপযোগী করতে কৃষকদের মোটা অংকের অর্থ খরচ করতে হবে। প্রতি বছর ৯ উপজেলার কৃষক বিনাচাষে কাদায় ভুট্টার বীজ বপন করে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে। কিন্তু এ বছর ভুট্টার আবাদে বাড়তি খরচ গুণতে হবে কৃষককে।
এদিকে বন্যার পানি আগাম নেমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গত বছরের চেয়ে আরও নিচে নেমে যাওয়ার আশংকা করছে কৃষকরা। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এতে দ্রুত আগাম বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় তারাও বিস্মিত।