সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের রক্ষণাবেক্ষণ
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৩, ২১:২৪
বাংলাদেশের ইতিহাসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানেই অগ্নিঝরা ভাষণ দিয়েছিলেন। তাঁর সেই ভাষণে বাঙালি উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল। দেখেছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন। তারপর দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী বীরত্বব্যঞ্জক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বাঙালি পরাজিত করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে। অর্জন করেছিল স্বাধীনতা। আর এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই (তত্কালীন রেসকোর্স ময়দান) পরাজয়ের দলিলে স্বাক্ষর করেছিল পাকিস্তানি ঘাতকেরা। সুতরাং এই উদ্যানটি আমাদের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’। তাই তো এ উদ্যানেই জ্বলছে শিখা চিরন্তন। এত ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এ উদ্যানের করুণ অবস্থা দেখে আমরা মর্মাহত হই। বিশেষত আমরা যখন সেখানে নিয়মিত জুয়ার আসর বসতে দেখি, উদ্যানটি যখন ভাসমান যৌনকর্মীদের ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হয়, মাদকাসক্তদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত হয় তখন আমরা হতবাক না হয়ে পারি না।
এ উদ্যানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৯৮ সালের ২৯শে মার্চ এখানে স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল । এরপর কেটে গেলো পনেরটি বছর। এখনো শেষ হয়নি স্বাধীনতাস্তম্ভের নির্মাণ কাজ। উদ্যানের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে যে উন্মুক্ত মঞ্চ নির্মিত হয়েছে তা কার্যত ভবঘুরেদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। স্থানটি ভবঘুরেদের রান্না বা জামাকাপড় শুকানো অথবা তাদের বসবাসের স্থান হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। শহীদদের নামের তালিকা লেখা ফলকটি পরিণত হয়েছে ভবঘুরেদের কাপড় শুকানোর মাধ্যমে।
মাদক সেবন ও বিক্রির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে উদ্যানটি। বাতাস ভারী হয়ে ওঠে গাঁজার ধোঁয়ায়। প্রকাশ্যেই বসছে গাঁজার আসর। উদ্যান চত্বরে ঘেরা দিয়ে জায়গা দখল করে চলছে ফুসকা ও চটপটিসহ হরেক রকমের দোকান।
এ উদ্যানের উত্তর-পশ্চিম কোণের প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ে সিটি কর্পোরেশনের আবর্জনা রাখার ধাতব বক্স। সেটি উপচে পড়ে আশেপাশের স্থানটি আবর্জনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি পেরিয়ে উদ্যানের ভেতরের দিকে চলতে থাকলে দেখা যায়, সারা মাঠে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ডাবের ছোবা, বিস্কুট-চিপসের প্যাকেট, তরিতরকারির খোসা, ভাঙা ডিমের খোসা, বাঁশ-কাঠ-কাগজের টুকরো ও পলিথিনের ব্যাগ। এমন কোনো আবর্জনা নেই, যার স্থান হয়নি এই উদ্যানটিতে।
স্বাধীনতা স্তম্ভ, শিখা চিরন্তন, জলাধার, অ্যাপ্রোচ প্লাজা, উন্মুক্ত মঞ্চ, কালীমন্দির— এসব স্থাপনা নির্মাণ এবং জায়গা দখল করে দোকানপাট বসায় উদ্যানের বহু গাছ ইতিমধ্যে কাটা পড়েছে। কৃত্রিমভাবে উদ্যানের সৌন্দর্য বাড়াতে গিয়ে উদ্যানটি আরো হতশ্রী হয়ে পড়ছে। তাই যে গাছগুলো অবশিষ্ট আছে, তা আর কাটা কোনোমতেই উচিত হবে না। এই গাছগুলোকে রেখেই নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে।
এ উদ্যানের রক্ষণাবেক্ষণ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় না গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তদারকি করবে তা ঠিক করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এ উদ্যান সংরক্ষণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পুকুরটির সংস্কার, পরিকল্পনা অনুসারে এম্ফিথিয়েটারের দায়িত্ব বাংলা একাডেমীকে দেওয়া, একটি অংশে সবুজ ঘাসে ঢাকা চত্বর সৃষ্টি করা এবং পুলিশ ক্যাম্প সরানো। গাঁজা ও জুয়ার আসর যেন কোনোভাবেই না বসতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। ইদানীং এখানে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে। এখানে শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা অন্য কোনো বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। মোটকথা, ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজরিত এই স্থানটিকে ঢাকার সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বড় বড় শহরগুলোতে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে উদ্যান ও বড় ময়দানগুলোকে সংরক্ষণ করা হয়। আমাদের পাশের দেশ ভারতের কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পার্কের সামনের ময়দানকে (গড়ের মাঠ) সংরক্ষণ করা হয়েছে চমত্কারভাবে। এমনকি সেখানে ময়দানের পরিবেশ রক্ষার জন্য কলকাতার ঐতিহ্যবাহী বইমেলাও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে শহরের উপকণ্ঠে মিলনমেলা ময়দানে। দিল্লিতে নেহেরু পার্ক, লন্ডনের বিখ্যাত হাইড পার্ক ও নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্ক রয়েছে সুরক্ষিত। সেখানে কোনো স্থাপনার কথা কেউ ভাবতেই পারে না। মানুষ সেখানে বিনোদন ও বেড়ানোর জন্য আসে। সভা-সমিতিও হয় অল্প। গত বছর দুনিয়া কাঁপানো ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল নিউইয়র্কের জুকোটি পার্ক। আবার কিছুদিন আগে তুরস্কের জনগণ একটি উদ্যানকে রক্ষার জন্য কত বড়ই না আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। এমনকি একটি উদ্যান উচ্ছেদ করে শপিং কমপ্লেক্স তৈরির সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সেখানে সরকার পতনের আন্দোলন পর্যন্ত শুরু হয়ে গিয়েছিল। জনগণের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্ক সরকারকে শেষ পর্যন্ত সরকারি সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়েছে। এ থেকে অনুধাবন করা যায়, ওইসব দেশের নাগরিকরা উদ্যান রক্ষায় কতটুকু তত্পর। আমাদের দেশের মানুষও ধীরে ধীরে সচেতন হয়ে উঠছে। পরিশেষে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ সকল উদ্যান সংরক্ষণের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়