দুর্ভোগ সঙ্গী করে বাড়ির পথে লাখো মানুষ
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৩, ২২:১৫
ঈদের আরো চারদিন বাকি থাকতেই রাজধানীর মানুষ রীতিমতো হুমড়ি খেয়ে পড়েছে গ্রামের পথে। বাস, ট্রেন, লঞ্চ কিংবা আকাশপথে সর্বত্রই এখন ঘরমুখো মানুষের স্রোত। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট নদীবন্দর এবং গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী আন্ত:জেলা বাস টার্মিনাল থেকে কয়েক লাখ মানুষ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। ট্রেন এবং নৌপথের যাত্রীরা অনেকটা নির্বিঘ্নে বাড়ি পৌঁছাতে সক্ষম হলেও সড়ক পথের যাত্রীরা যথারীতিই পড়েছেন যানজটের কবলে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-টাঙ্গাইল এবং ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে তীব্র যানজটে আটকা পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। যানজটের কারণে দূরপাল্লার বাসগুলো ফিরতি যাত্রায় সময়মতো ঢাকায় পৌঁছাতে পারছে না। সে কারণে ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে যথাসময়ে ছেড়ে যেতে পারছে না পূর্বনির্ধারিত ট্রিপগুলো। তিন বাস টার্মিনালসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দূরপাল্লার পরিবহনগুলোর কাউন্টারে অগণিত মানুষ অপেক্ষার প্রহর গুণছেন। পরিবহন মালিকরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে তাদের কিছুই করার নেই।
এদিকে ঈদ উপলক্ষে ঘরে ফেরার পালা পুরোদমে শুরু হওয়ার সাথে সাথেই বিভিন্ন রুটে বাসের ভাড়া অস্বাভাবিকহারে বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষত সায়েদাবাদ ও মহাখালী কেন্দ্রিক বাস সার্ভিসগুলো তাত্ক্ষণিক টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছে। মহাখালী থেকে জামালপুরগামী বিনিময় পরিবহন যাত্রীদের কাছ থেকে ৩০০ টাকা হারে ভাড়া নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মো. মারজানুল হক নামের এক যাত্রী। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এই রুটের ভাড়া মাত্র ১৫০ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে মহাখালী বাস টার্মিনাল মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ঢাকা-জামালপুর রুটের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮৭ টাকা। বিনিময় পরিবহনের মতো জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। কোনো কোনো পরিবহন ভাড়া কিছুটা কম নিলেও তারা আবার দাঁড়ানো যাত্রী বহন করছে। কিন্তু বিষয়টি দেখার কেউ নেই। বাস মালিক সমিতি কেবল ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে।
কল্যাণপুরে এস আর ট্রাভেলস-এর কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যের শতশত যাত্রী অপেক্ষা করছেন নির্ধারিত গাড়ির জন্য। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। যথাসময়ে গাড়ি ছেড়ে যাওয়া দূরের কথা, ঢাকার বাইরে থেকে এসেই পৌঁছায়নি। এ জন্য যাত্রীদের কেউ কেউ উত্তেজিত হয়ে কাউন্টারকর্মীদের সঙ্গে হৈচৈ করছেন। বিষয়টি নিয়ে ইত্তেফাক প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে এস আর ট্রাভেলস-এর জনৈক কর্মকর্তা বলেন, আমরা তো ইচ্ছে করে যাত্রীদের বসিয়ে রাখিনি। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন গন্তব্য থেকে ফিরতি বাস সময়মতো এসে পৌঁছাতে পারছে না। কারণ টাঙ্গাইলে প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ওই এলাকা দিয়ে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলাসহ মোট ২২ জেলার যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এখন ঈদ উপলক্ষে গরুবাহী ট্রাকের আধিক্যের কারণে যানজট আরো বেড়েছে। সে কারণে ঢাকামুখী গাড়িগুলো সময়মতো ফিরে আসতে পারছে না। স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা থেকে পূর্বনির্ধারিত ট্রিপগুলোও ছাড়া সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে অপেক্ষমান যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতির কারণে যাত্রীরা যেমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, তেমনি আমরা হয়রানির কবলে পড়ছি। সড়ক ব্যবস্থাপনা আরেকটু উন্নত হলে এতোটা যানজট হতো না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ঘরমুখো মানুষের চাপে সবগুলো মহাসড়কেই নেমেছে অতিরিক্ত যানবাহন। সেইসঙ্গে গরু বোঝাই ট্রাকের আধিক্য এবং কোথাও কোথাও মহাসড়কের পাশে গরুর হাটের কারণেও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মতোই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া আশুলিয়া, বাইপাইল ও সাভারের নবীনগর এলাকায়ও গতকাল দিনভর প্রচণ্ড যানজট ছিল। বরাবরের মতোই সাভার বাজারকে ঘিরে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে।
অন্যদিকে ঘরমুখো মানুষের চাপে গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার উদ্বোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল শুক্রবার ওই এলাকায় গেছেন। তার নিরাপত্তার জন্য আগের দিন থেকেই সমগ্র গুলিস্তান, সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ি এলাকায় নিরাপত্তারক্ষীদের কড়াকড়ির কারণে যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল বিঘ্নিত হয়। তবে প্রধানমন্ত্রী ফিরে আসার পর একসঙ্গে সব যানবাহন চলতে শুরু করলে প্রচণ্ড যানজট সৃষ্টি হয়। এছাড়া ফ্লাইওভার দেখতে রাস্তায় নেমে আসা হাজার হাজার দর্শনার্থীর কারণেও এই এলাকায় স্থবিরতা দেখা দেয়। মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনের রাস্তায় বড় বড় বাসগুলো দীর্ঘসময় ধরে দাঁড়িয়ে থেকে যাত্রী তোলার কারণে সমগ্র এলাকায় দিনভর তীব্র যানজট ছিল। যদিও টার্মিনালের সামনের রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
গতকাল দুপুরের পর ঘরমুখো মানুষের ভিড়ে সবচেয়ে বেশি যানজট সৃষ্টি হয় সদরঘাটমুখী সড়কে। দীর্ঘসময় যানজটে আটকা থেকে অনেকেই সিএনজি কিংবা রিকশা ছেড়ে পায়ে হেঁটে ঘাটে পৌঁছান। সদরঘাট টার্মিনালেও গতকাল সারাদিন ছিল উপচেপড়া ভিড়। যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় লঞ্চ মালিকরাও স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙ্গে দিনের বেলায় লঞ্চ ছেড়েছেন। সারাবছর কেবলমাত্র সন্ধ্যার পর লঞ্চ ছাড়লেও গতকাল দিনের বিভিন্ন সময় অনেকগুলো লঞ্চ ছেড়ে গেছে সদরঘাট থেকে। এরমধ্যে কোনো কোনো লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অবশ্য বিআইডব্লিউটিএর নৌনিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক সাইফুল হক জানিয়েছেন, প্রত্যেক লঞ্চে যাত্রীদের সর্বাত্মক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ সম্পর্কিত একটি মনিটরিং সেল ২৪ ঘন্টা কাজ করছে। এছাড়া টার্মিনাল এলাকায় ক্লোজ সার্টিক (সিসি) টিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার নেতাদেরও দাবি, যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখছেন এবং এ জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে।
কমলাপুর রেলস্টেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার বিকাল থেকেই প্রতিটি ট্রেনে যাত্রীদের বাড়তি চাপ শুরু হয়। তবে শুক্রবারের প্রতিটি ট্রেন স্টেশন ছেড়ে গেছে যাত্রী বোঝাই হয়ে। অগ্রিম টিকিটধারীদের পাশাপাশি প্রচুর সংখ্যক যাত্রী ভ্রমণ করেছেন তাত্ক্ষণিকভাবে সংগৃহীত স্ট্যান্ডিং (দাঁড়িয়ে ভ্রমণ) টিকিট নিয়ে। কমলাপুরের স্টেশন ম্যানেজার খায়রুল বশির জানান, ঈদের বিশেষ ট্রেনসহ সবগুলো আন্ত:নগর ও নিয়মিত ট্রেনযোগে গতকাল সারাদিনে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। তবে এত মানুষের চাপ সত্ত্বেও রেলস্টেশন এলাকায় তেমন কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।