মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:৫৩
ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রায় দুইশ’ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের পর-১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট ভারতবর্ষের হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য আলাদা দুটি রাষ্ট্র হিন্দুস্থান বা ভারত এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয়। আপস-আলোচনার মাধমেই তা হল। প্রায় দুইশ’ বছর শাসন ও শোষণ করার পর এদেশ থেকে বিদায় নিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু রেখে গেল তাদের চক্রান্ত এবং শোষণের নমুনা। বিপ¬বীদের হাতে ক্ষমতা থাকেনি। ক্ষমতা চলে যায় সুবিধাভোগী শাসকশ্রেণীর হাতে।
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামে পৃথক দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের একাংশ পূর্ব-বাংলা বা পূর্ব-পাকিস্তান এবং অন্য অংশ পশ্চিম-পাকিস্তান নামে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম-পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তত্কালীন পূর্ব-পাকিস্তান বা পূর্ব-বাংলাকে রাজস্ব আদায় এবং শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পশ্চাত্ভূমি হিসেবে পরিগণিত করতে চাইল।
তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হল পূর্ব-বাংলার সচেতন জনগণ। এরই ধারাবাহিকতায় সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়। ঢাকায় কেন্দি য় কমিটি গঠনের পর থেকেই সারা দেশে সাংঠনিক তত্পরতা শুরু হয়। ঢাকার বাইরে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সাংগঠনিক সভা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ১৯৪৯ সালের ৩ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকনাথ ময়দানে আয়োজিত জনসভায় কেন্দ ীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক উপস্থিত ছিলেন। কেন্দ ীয় কমিটির অন্যতম সদস্য আলী আমজাদ খানের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় মুসলিম লীগের শোষণনীতির তীব্র সমালোচনা করা হয়। জনসভার পর ঐ দিন রাতে অনুষ্ঠিত হয় সাংগঠনিক সভা। এ সভায় এডভোকেট আবদুল বারীকে সভাপতি এবং রফিকুল ইসলামকে (রফিক মাস্টার) সাধারণ সম্পাদক করে আওয়ামী মুসলিম লীগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা কমিটি গঠন করা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আওয়ামী মুসলিম লীগের সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হওয়ার পর থেকে এখানে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের শোষণনীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক কার্যক্রম শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন থানা, ইউনিয়ন এবং গ্রাম পর্যায়ে কমিটি গঠন করে আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়া হয়। ছাত্র নেতৃবৃন্দকে নিয়ে গঠিত হয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কমিটি। তত্কালীন মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন আলী আজম ভুইয়া, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবদুর রহমান (বড়হরণ)। আলী আজম ভুঁইয়া তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। কেন্দ ীয় পর্যায়েও তিনি ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন।
১৯৫৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তত্কালীন মহকুমা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পদে এডভোকেট আবদুল বারী এবং এডভোকেট আলী আজম ভুঁইয়া নির্বাচিত হন। সারা দেশের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও শোষক মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করা হয়। কিন্তু ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। তবে গোপনীয়ভাবে রাজনৈতিক তত্পরতা চলতে থাকে।
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এবং বাঙালির ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ছয় দফার প্রতি পূর্ব-বাংলার জনগণ অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। এ আন্দোলন দমানোর জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে ১৯৬৭ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা রুজু করা হয়। এর প্রতিবাদে বাংলার মানুষ সোচ্চার হয়ে ওঠে। এ সময় ‘আঘাত হানার দিন এসেছে’ শীর্ষক একটি প্রচারপত্র বিলি করতে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছাত্রনেতা মাহবুবুল হুদা ভুঁইয়া এবং শফিক খান গ্রেফতার হন। কিন্তু আন্দোলন থেমে থাকেনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়াস্থ নবীনগরের গোপালপুর গ্রামের মোঃ মুজিবুর রহমান (সাবেক হাবিলদার) ছিলেন আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলায় অন্যতম আসামি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সমগ্র ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় পরিণত হয়েছিল। এর প্রধান কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। উত্তরে হবিগঞ্জ থেকে দক্ষিণে কুমিল¬া জেলার ব্রাহ্মণপাড়া পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, আখাউড়া, বিজয়নগর ও সদর থানার বিস্তীর্ণ এলাকা প্রায় ৬৫ কি. মি. সীমান্ত অঞ্চল।