নবীনগর প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদে সমৃদ্ধ
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:৫৮
ইতিহাসের অন্যতম উপাদান প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ। বিশেষত: কাল নির্ণয়ে সভ্যতার বিশ্লেষণে এর গুরুত্ব অপরিহার্য।
গৌরবের কথা নবীনগর উপজেলা প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানকার বিভিন্ন গ্রামে এমন কিছু মূর্তি পাওয়া গেছে, যেগুলি বাংলাদেশের ইতিহাসে কতিপয় প্রচলিত ধারণাকে পর্যন্ত আমূল পাল্টে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয়, শিবপুর ইউনিয়নের বাঘাউরা গ্রামের ভান্ডারী বাড়ি সংলগ্ন একটি অতি প্রাচীন পুকুর শতাধিক বছর পূর্বে পূন: খননকালে পাথরে নির্মিত একটি বিষ্ণু মূর্তি পাওয়া যায়। মূর্তিটি বর্তমানে কলকাতার একটি যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। কালো পাথরের খোদিত চতুর্ভূজ বিষ্ণু মূর্তিটির পাদমূলে উত্কীর্ণ লিপিটি নিম্নরূপ ঃ [ ‘সিদ্ধিরস্ত] সম্বত্ ৩ মাঘ দিনে ২৭ শ্রী মহিপাল দেব কীর্তিরিয়ং নারায়ণ ভট্টর কাখ্যা সমতটে বিলকীন্দকীয় পরম বৈষ্ণবস্য বণিক লোকদত্তস্য বসুদত্ত সুতস্য মাতা পিত্রোরাত্ন নশ্চ পুন- যশোভি বৃদ্ধয়ে।’
অর্থাত্- শ্রী মহিপাল দেবের রাজত্বের ৩য় বত্সরে ২৭শে মাঘ বসু দত্তের পুত্র সমতটের বিলকীন্দক নিবাসী পরম বৈষ্ণব বণিক লোকদত্ত কর্তৃক তাঁর মা-বাবা ও নিজের পূণ্য, যশ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নারায়ণ ভট্টারকের মূর্তি নির্মিত।
মূর্তিটির পরিমাণ- ৩((১(-৬(। এর একটি আলোকচিত্র ঐতিহাসিক রাখাল দাস বন্দোপাধ্যায় রচিত ‘বাংগালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে রয়েছে। ইতিপূর্বে ঐতিহাসিকদের ধারণা ছিল, পাল রাজাদের রাজ্যসীমা পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা (প্রাচীন নাম সমতট) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়নি। কিন্তুু এ মূর্তি পাওয়ার পর বাংলার ইতিহাসে পাল বংশের বৌদ্ধ রাজাদের রাজত্ব সম্পর্কে নতুন তথ্য সন্নিবেশন করতে হয়। উত্কীর্ণ লিপির ‘বিলকীন্দক’ গ্রামটির বর্তমানে অস্তিত্ব নেই। গ্রামটি ছিল সম্ভবতঃ বাঘাউড়ার দক্ষিণ দিকে। শত শত বছরের বিবর্তনে গ্রামটি বিলুপ্ত হলেও রাজস্ব বিভাগের নথিপত্রে ‘বিলকান্দা’ নামে একটি মৌজার অস্তিত্ব এখনও আছে। বাঘাউড়ার নারায়ণ বা বিষ্ণু মূর্তিটি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে সামান্য মতবিভেদ রয়েছে। অধিকাংশ ঐতিহাসিককের অভিমত হলো, এ মূর্তিলিপির ‘ শ্রী মহিপাল দেব’ প্রকৃতপক্ষে পালবংশীয় প্রথম মহীপাল (৯৮৮-১০৩৮ খ্রীঃ)। তিনি সমতটের শাসকও ছিলেন। বাঘাউড়ার পর, উপজেলার নাটঘর গ্রামের শিব মূর্তিটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রায় তিনশ বছর পূর্বে গ্রামের চৌধুরী বাড়ির একটি পুকুর খননকালে এই মূর্তিটি আবিষকৃত হয়। কালো পাথরে নির্মিত ৪((১(-৪( পরিমাপের এই দ্বাদশ ভূজা অনন্য শিব মূর্তিটি নৃত্যভঙ্গীতে উত্কীর্ণ।
দুই হাতে অনন্ত নাগের লেজ ও ফনা, দুই হাতে শিবের বাঁশি, দুই হাত অঞ্জলিবদ্ধ, চার হাতে ত্রিশূল, শংখ, সর্প, ফুল স্তবক আর দুইটি হাত বর্তমানে বিনষ্ট। মাথাটি কারুকার্য খচিত। পদতলে বৃক্ষমূর্তি।
প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক শ্রী নলিনী কান্ত ভট্টশালী মাসিক ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে নাটঘরের শিবমূর্তি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন- ‘ভারতে প্রাচীন ভাস্কর্যের এরুপ উজ্জ্বল নিদর্শন আর একটিও নেই। প্রকৃতপক্ষে, শিবমূর্তিটি হাতে বাঁশি আছে- এমন মূর্তি সমগ্র ভূ-ভারতে আর দু’টি নেই।