কুমারী পূজায় ছিল উপচে পড়া ভিড়
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৩, ২২:২৯
ঊমা’র স্বামীর ঘরে ফিরে যাওয়ার দিন এলো ঘনিয়ে। তিন দিন আগেই ‘অকাল বোধনে’ কৈলাশ থেকে তার অধিষ্ঠান হয়েছিল ঠাকুর ঘরে। পাঁচটি দিন পিতৃগৃহ ঘুরে যাওয়া। মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের বোলে ধ্বনিত হচ্ছে বাঙালি হিন্দুর হূদয়তন্ত্রীতে আনন্দের জোয়ার। আবার বিষাদের সুরও। আজ নবমী। কাল বিদায়। দেশের ২৮ হাজার পূজামণ্ডপ এখন গম গম করছে উত্সবের রোশনাইয়ে। সুপার সাইক্লোন পাইলিনের প্রভাবে ঝড়ো হাওয়া আর বাদলা ক্ষাণিকটা চিন্তার রেখা ফেলছে বটে, তবে ঠাকুর দেখার আনন্দে এতটুকুন ছেদ পড়ছে না। মণ্ডপে মণ্ডপে উলু-ধ্বনি, মন্ত্রপাঠ, কাসর-ঘণ্টা দর্শনার্থীদের ভিড়।
গতকাল শনিবার ছিল মহাষ্টমী বিহিত পূজা। রাতে হয় সন্ধিপূজা। মধ্যাহ্নে ছিল প্রসাদ বিতরণ। রাতে সন্ধিপূজার আগে সন্ধ্যায় হয় আরতি প্রতিযোগিতা। প্রতিবছরের মত এবারও ঢাকার রামকৃষ্ণ মঠ মিশনে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী কুমারী পূজা। এই মণ্ডপেই গতকাল ঢল নেমেছিল ভক্তদের। সকাল আটটা থেকে থেমে থেমে চলছিল উলু ধ্বনি, শঙ্খ ধ্বনি। কিন্তু তখনও পূজা মঞ্চে আসেনি কুমারী ‘ঊমা’। তবে ভক্তরা সেই কাকভোর হতেই দূর-দূরান্ত থেকে এসে জড়ো হতে শুরু করেছেন মন্দির প্রাঙ্গণে। বেলা ১১টায় সাড়ে পাঁচ বছরের শিশু আদৃতা চৌধুরী দেবীর সাজে বসলো পূজা মঞ্চে। আদৃতার বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। বাবা মলয় কান্তি চৌধুরী ব্যবসায়ী। মা মুক্তা চৌধুরী গৃহিণী। আদৃতা চৌধুরীকে ‘ঊমা’ জ্ঞানে দুর্গার আসনে অধিষ্ঠান রেখে সব স্ত্রীলোক ভগবতীর এক একটি রূপ, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর প্রকাশ-এ ভাবনা থেকে পূজা দেয়া হয় ১১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত। সকালে আদৃতাকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। গলায় ফুলের মালা, কপালে চন্দন, নানা অলঙ্কার বিভূষিতা কুমারী আদৃতাকে দেবীজ্ঞানে পূজা দেয়া হয়। কুমারী পূজায় দেবীর মঞ্চে অধিষ্ঠানের আগে মন্ত্রপাঠ ও ফুল বেলপাতার আশীর্বাদ পৌঁছে দেয়া হয় সবার হাতে। এরপর শত শত হিন্দু নারীর উলুধ্বনি আর বিনম্র ভক্তির মধ্য দিয়ে কুমারী পূজা সূচনা হয়।
তান্ত্রিকধারা মতে, কুমারী আদ্যাশক্তি মহামায়ার প্রতীক। কামরূপ কামাক্ষ্যা, নেপালের বিভিন্ন মন্দির, বাংলাদেশের ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে মূলত কুমারী পূজা হয়ে থাকে।
কুমারী পূজায় রামকৃষ্ণ মিশনের বড় চত্বর পেরিয়ে সড়কমালা ছাপিয়ে ছিল ভক্তদের ভিড়। পুরো এলাকা জনারণ্যে পরিণত হয়। সকাল থেকেই নিরাপত্তা রক্ষায় সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ, আনসারের পাশাপাশি অন্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। ছিল র্যাব সদস্যদেরও কড়া প্রহরা। মিশনের প্রবেশমুখে গোপীবাগ মোড় থেকে গোপীবাগ মাজার পর্যন্ত সড়কে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। দর্শনার্থী ও পূজারীদের ব্যাপক ভিড়ে টিকাটুলী, পুরানো ইত্তেফাক মোড়সহ ওই এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। মোড় থেকে হেঁটে ভক্তরা কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনি অতিক্রম করে সুশৃঙ্খলভাবেই পূজামণ্ডপে প্রবেশ করেছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে ভিড় উপচে পড়ে। আধা ঘন্টার কুমারী পূজা শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
রামকৃষ্ণ মিশন মন্দিরের পুরহিত স্বামী স্থিরাত্মানন্দ কুমারী পূজার তাত্পর্য সম্পর্কে বলেন, ‘দুর্গাপূজায় যে প্রতিমা পূজা করি সেটারই বাস্তব রূপ কুমারী পূজা। সমস্ত নারীর মধ্যেই মাতৃরূপী দেবী অধিষ্ঠান করেন। যে মা’কে মাটির প্রতিমায় দেখলাম- সেই মাকে সমস্ত নারীর প্রতিমায় দেখলাম। তার ফলে সমস্ত নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আসে, নিজেদের আধ্যাত্মিক উন্নতি হয়, সামাজিক উন্নতি হয়।’
ঢাকা ছাড়াও রামকৃষ্ণ মিশনের নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল ও দিনাজপুরসহ কয়েকটি মঠ এবং কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী পূজামণ্ডপেও গতকাল কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়।
আজ শুক্লাপক্ষের নবমী তিথিতে সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে মহানবমী পূজা। আগামীকাল বিজয়া দশমীতে দুর্গাদেবীর দশমী বিহিত পূজা সমাপন ও বিসর্জন।