কোরবানির ঈদে মাংস খান তবে বুঝে শুনে
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৩০
দু’দিন বাদেই ঈদুল আজহা। ঈদ মানেই আনন্দের দিন, উত্সবের দিন। এই আনন্দের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো খাবার। আর কোরবানির ঈদের অন্যান্য খাবারের সাথে মূল আয়োজন হল বিভিন্ন রকমের মাংস। যেমন- গরু, খাসি, মহিষ, এমনকি উটের মাংস। এই ঈদে সবারই মনের প্রবল ইচ্ছা বেশি বেশি করে গোসত খাওয়া। দু-একদিন বেশি খেতে যদিও খুব বাধা নেই, তবুও খাওয়া উচিত রয়ে-সয়ে। সমস্যা হলো তাদের, যাদের পেটের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হূদরোগ আছে কিংবা যাদের এসব রোগের প্রাথমিক লক্ষণ আছে। ঈদকে উপলক্ষ করে সবার বাসায় নানা ধরনের মুখরোচক খাবারের আয়োজন করা হয়। নিজের বাসায় তো বটেই, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের বাসায় ঘুরে ঘুরে প্রায় সারা দিনই টুকিটাকি এটা-সেটা খাওয়া হয়। আমাদের একটু নজর দেয়া দরকার- আমরা কী খাচ্ছি, কতটুকু খাচ্ছি, বিভিন্ন খাবারের প্রতিক্রিয়া কী তার ওপর। মূল সমস্যাটা নিঃসন্দেহে খাবারের পরিমাণে।
অনেকেই একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণ তৈলাক্ত বা চর্বিযুক্ত খাবার খেয়ে হজম করতে পারেন না। এ ছাড়া কোরবানির জন্য গোসতের পরিমাণটা একটু বেশিই খাওয়া হয়। অধিক পরিমাণে গোসত খাওয়ার ফলে পেট ফাঁপে, জ্বালাপোড়া করে, ব্যথা করে, বার বার পায়খানা হয়। পর্যাপ্ত পানি পান না করার দরুন অনেকে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন। যদিও সাধারণভাবে কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেতে কোনো মানা নেই, কিন্তু পরিমাণ বজায় রাখা খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে শুরু থেকেই পরিকল্পনা থাকা দরকার। যেহেতু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই সবাই মাংসের খাবার খাওয়ার জন্য বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাই সকাল আর দুপুরের খাওয়াটা খুব কম রাখাই ভালো। অন্য বাসায়ও যথাসম্ভব কম খান। ঈদের দিন তৈলাক্ত খাবার, পোলাও, বিরিয়ানি ও আমিষ জাতীয় খাবার, যেমন- মুরগি, খাসি বা গরুর মাংস, কাবাব, রেজালা ইত্যাদি খাওয়া হয়। এ ছাড়া আছে চটপটি, দইবড়া কিংবা বোরহানির মতো টক খাবারও। এই জাতীয় খাদ্য সকাল আর দুপুরে পরিহার করাই উত্তম। কারণ বিকেলে প্রচুর পরিমাণে মাংস খাওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই।
ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে অল্প করে সেমাই বা পায়েস খান। তার সঙ্গে কিশমিশ, বাদাম ইত্যাদি খান। ফলের জুস, ডাবের পানি ইত্যাদি খেতে পারেন। খাওয়ার আধঘণ্টা পর দেড় থেকে দুই গ্লাস পানি খেয়ে নামাজ পড়তে যান।
ঈদের দিনে অনেকেই শরবত, কোমল পানীয়, ড্রিংকস এবং ফ্রুট জুস খাওয়া পছন্দ করেন। তবে মনে রাখা উচিত, বাজারে দেশি-বিদেশি ফ্রুট জুস যা পাওয়া যায়, সেগুলোর বেশিরভাগই আসল ফলের রস নয়। কৃত্রিম রঙ ও সুগন্ধি দিয়ে জুস নামের এসব পানীয় তৈরি করা হয়। চটকদার বিজ্ঞাপনের সুবাদে এগুলোই হয়ে যায় তাজা ফলের রস। আবার দীর্ঘদিন ধরে এসব জুস পান করলে শিশুদের তো বটেই, বড়দের পাকস্থলীরও মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। সেইসাথে লিভার ও কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বাজারের ফ্রুট জুস পান করলে কোন উপকার তো হবেই না, বরং স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতএব এসব না খেয়ে সবসময় মৌসুমি ফল খাবেন তাতে মজা ও উপকার দুই-ই পাবেন। লেবুর শরবত, বাসায় বানানো ফলের রস, ডাবের পানি, বোরহানি ইত্যাদি খাওয়া যায়।
যাদের বয়স কম এবং শারীরিক কোনো সমস্যা নেই, তারা নিজের পছন্দমতো সবই খেতে পারেন এবং তাদের হজমেরও কোনো সমস্যা হয় না, শুধু অতিরিক্ত না হলেই হলো, বিশেষ করে চর্বি জাতীয় খাদ্য। বেশি মাংস খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বেড়ে যায়। যাদের এনাল ফিশার ও পাইলস জাতীয় রোগ আছে, তাদের পায়ুপথে জ্বালাপোড়া, ব্যথা ইত্যাদি বাড়তে পারে, এমনকি পায়ুপথে রক্তক্ষরণ পর্যন্ত হতে পারে। তাই প্রচুর পরিমাণে পানি, শরবত, ফলের রস, ইসবগুলের ভূষি ও অন্যান্য তরল খাবার বেশি করে খাবেন। পেটে গ্যাস হলে ডমপেরিডন, এন্টাসিড, রেনিটিডিন, ওমিপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল জাতীয় ওষুধ খেতে পারেন। যাদের আইবিএস আছে, তারা দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করুন। দাওয়াতে গেলে পরিমিত আহার করুন। অতিভোজন পরিহার করার চেষ্টা করবেন। হয়তো অনেক খাওয়া-দাওয়া টেবিলে সাজানোই থাকবে, কিন্তু খেতে বসলেই যে সব খেতে হবে তা নয়। রাতের খাবার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়বেন না। খাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা পর বিছানায় যাবেন। খাবারের ফাঁকে ফাঁকে পানি খাবেন না, এতে হজম রসগুলো পাতলা হয়ে যায়। ফলে হজমে অসুবিধা হয়। তাই খাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা পর পানি পান করুন। খাবারের মাঝে বোরহানি খেতে পারেন।
যে কোনো পশুর চর্বি খাওয়া এমনিতেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কোরবানির সময় এ বিষয়টি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা উচিত। অনেক সময় দেখা যায়, আমরা রান্না সুস্বাদু হবে এমন ভুল ধারণা পোষণ করে মাংসে বেশ কিছু চর্বি আলাদাভাবে যোগ করে থাকি। এটা ঠিক নয়। যতটুকু সম্ভব মাংসের চর্বি ছাড়িয়ে খাওয়া ভালো। মাংসের সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণে সবজি খাওয়া যেতে পারে। টাটকা সবজি পাকস্থলীকে সাবলীল রাখে। পরিমিতি বোধ যেখানে রসনা সংবরণ করতে পারে, সেখানে ভয়ের কিছু নেই। মাংসে তেল বা ঘিয়ের পরিমাণ কমিয়ে দিলে, ভুনা গোসতের বদলে শুকনো কাবাব করে খেলে, কোমল পানীয় ও মিষ্টি একেবারে কমিয়ে খেলে কোরবানির ঈদের সময়ও ভালোই থাকা যায়। সেই সঙ্গে হালকা ব্যায়াম বা বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে শরীর থেকে অতিরিক্ত ক্যালরি কমিয়ে নিতে পারলে আরও ভালো।
মধ্যবয়সী এবং বয়স্কদের খাবার সম্পর্কে সচেতন থাকা আরও জরুরি। এমনকি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি ইত্যাদি না থাকা সত্ত্বেও এই বয়সের মানুষের ঈদের খাবারের ব্যাপারে বাড়তি সতর্ক থাকা দরকার। অতিভোজনে তাদের পেট ভরা ভাব বা অস্বস্তিকর অনুভূতি হতে পারে। বেশি মাংস খেলে তা পরিপূর্ণভাবে হজম করতে অনেক সময় লাগতে পারে। এতে পেটে অস্বস্তিকর অনুভূতি, ভরা ভরা ভাব, বার বার ঢেকুর ওঠা এমনকি বুকে ব্যথা পর্যন্ত হতে পারে। ডায়াবেটিক রোগীকে অবশ্যই মিষ্টি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। তারা বরং টক খাবারের মাধ্যমে রসনা পূরণ করতে পারেন। নেহায়েত মিষ্টি খেতে চাইলে চিনির বিকল্প দিয়ে তৈরি করে নেবেন। পোলাও, বিরিয়ানি কম খাবেন, ভাত খাওয়াই ভালো। গরু বা খাসির মাংস খাওয়া যাবে, পরিমাণটা অতিরিক্ত যাতে না হয় এবং তেল বা চর্বি যেন কম থাকে।
হূদরোগে আক্রান্ত বিশেষ করে প্রবীণরা অবশ্যই তৈলাক্ত মাংস কমিয়ে খাবেন। সারা বছর তারা যে ধরনের নিয়মকানুন পালন করেন খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে, কোরবানির সময়ও সেভাবে চলাই ভাল। কোরবানির মাংস একটু-আধটু খেলে শরীরের যে খুব ক্ষতি হয়ে যাবে তা নয়, তবে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। যাদের ওজন বেশি তাদের অবশ্যই ঈদের সময় খাওয়ার ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।
যারা কিডনির সমস্যায় ভোগেন, তাদেরকে প্রোটিন জাতীয় খাদ্য কম খেতে বলা হয়। তাই মাংস খাবার ব্যাপারে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনক্রমেই অতিরিক্ত মাংস খাওয়া ঠিক হবে না। ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী সারা বছরের মত ঈদের সময়ও একই খাবার খাওয়াই ভাল।
লেখক: ডিন, মেডিসিন অনুষদ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়