কংগ্রেসের কৌশলে বেকায়দায় বিজেপি
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১৩
‘ব্যাকফুটে’ বিজেপির সংসদীয় দল। খাদ্য নিরাপত্তা বিল, জমি অধিগ্রহণ বিল এবং পেনশন বিলে সমর্থন দিয়ে লাভ হল না-কি লোকসান, তার হিসাব করতে তারা ব্যস্ত। সংসদে দলের অবস্থা হয়েছিল শাঁখের করাতের মত। বিরোধিতা করলে বিপদ; ‘আমজনতার দুশমন’ অপবাদ জুটে যাওয়ার আশঙ্কা, সমর্থন করেও কোনও লাভ নেই। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা বিল ও জমি অধিগ্রহণ বিল পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টেলিভিশন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন মারফত সাফল্যের বয়ান দিতে শুরু করেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। লাভের গুড় ঘরে তুলতে ব্যস্ত কংগ্রেস আর এই বিলগুলো যে বিজেপির সাহায্য নিয়ে পাস করাতে সক্ষম হল ক্ষমতাসীন সংখ্যালঘু সরকার, সেই বিজেপি অসহায় দর্শক। পরবর্তী কৌশল কী হওয়া উচিত তা ঠিক করতে গিয়েই মোদি, আদভানিদের ঘুম যেন হারাম!
সংসদের বাদল অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটে কদিন আগে। অধিবেশন শেষ করে ওইদিনই তাদের তথাকথিত সাফল্যের খতিয়ান দিতে বসেছিলেন দুই বিরোধী দলনেতা। লোকসভার সুষমা স্বরাজ এবং রাজ্যসভার অরুন জেটলি। সুষমার দাবি, ‘আমরা আত্মসন্তুষ্ট। আমরা যা চেয়েছিলাম তাই হয়েছে।’ কিন্তু যখন প্রশ্ন উঠেছে যে, এতে বিজেপির কী লাভ হয়েছে, বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে। উত্তর এড়িয়ে গেছেন দুই নেতাই। একমাত্র কয়লাখনি বন্টন কেলেঙ্কারি এবং সংশ্লিষ্ট আইল লোপাট হয়ে যাওয়া বিষয়ে সরকারকে একটু চাপে ফেলা ছাড়া কংগ্রেসের একটার পর একটা চালে শয্যা নেয় বিজেপি। সাংবাদিকদের প্রশ্নবানের সামনে টিকতে না পেরে সুষমা স্বরাজ স্বীকার করে নেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তা বিলে বাধা দিলে বলা হত আমরা গরিবের বিরুদ্ধে আর জমি অধিগ্রহণ বিলে সমর্থন না করলে অভিযোগ উঠত আমরা কৃষক বিরোধী।’
খাদ্য নিরাপত্তা ও জমি অধিগ্রহণের মতো দুটি ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে বিজেপিকে এতোটাই কোণঠাসা করেছে কংগ্রেস যে, বিজেপি এখন শুধুমাত্র কয়লা খনি বন্টন কেলেঙ্কারির মাঝে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এ দুটি বিল পাস করাতে সরকারকে সাহায্য করলেও কোনো ইতিবাচক প্রচারে যাওয়ার সুযোগ নেই প্রধান বিরোধী দলের। বলতে গেলে, সাফল্যের পুরো ক্ষীরটাই কংগ্রেসের থালায়। সুষমা এবং অরুন জেটলি যতই নিজেদের পিঠ চাপড়ানোর চেষ্টা করুন, দল হিসেবে বিজেপি এখন রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য বিষয় হাতড়ে বেড়াচ্ছে। শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি ও আর্থিক দুরবস্থার ‘জিকির’ তোলা ছাড়া বিজেপির কাছে কোনো বিকল্প নেই।
খাদ্য নিরাপত্তা বিল পাস হওয়ায় ভারতের ১২০ কোটি লোকের ৭০ শতাংশের কাছে শতকরা ৯০ ভাগ ভর্তুকিতে খাদ্যশস্য পৌঁছে যাওয়ার স্বীকৃতি মিলেছে। তার মানে প্রতিমাসে মাথাপিছু তিন রুপি কেজি দরে পাঁচ কেজি চাল, দুই রুপি কেজি দরে গম এবং এক রুপি কেজি দরে ভুট্টা পাওয়ার হকদার বনে যাচ্ছে গরিব জনগণ। এখন সরকারকে বছরে ৭০ লাখ টন খাদ্যশস্য অধিগ্রহণ করতে হয়। খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের জন্য বছরে ৬ কোটি ২০ লাখ খাদ্যশস্যের প্রয়োজন পড়বে। একেবারে গরিব তালিকাভুক্ত আড়াই কোটি পরিবার অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনার আওতায় মাসে ৩৫ কেজি করেই খাদ্যশস্য পাবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হতে আরো কয়েক মাস লেগে যাবে। কারণ, কারা এই প্রকল্পের আওতায় পড়বেন সেই তালিকাটা চূড়ান্ত করবে রাজ্য সরকারগুলো, আর এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তবে গরিব লোকজন আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগেই যে প্রকল্পের সুবিধা পেতে শুরু করবে, এটি নিশ্চিত।
উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও বহু প্রতীক্ষিত খাদ্য নিরাপত্তা বিল পাস করাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত খুব একটা বেগ পেতে হয়নি কংগ্রেসকে। ৫০ শতাংশ শহুরে বাসিন্দা এবং ৭৫ শতাংশ গ্রামীণ জনগণ সুফল পাবে বলে ক্ষমতাসীন কোয়ালিশন সরকারের মনে করাটাই স্বাভাবিক যে, এটি তাদের জন্য বিরাট এক সফলতা। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন ভিন্ন কথা—খাদ্য নিরাপত্তা বিল পাস হওয়ায় খাদ্যশস্য বাবদ সরকারের ভর্তুকি অনেক বেড়ে যাবে। এ মুহূর্তে ভারত সরকারের ভর্তুকি বাবদ মোট ব্যয়ের ৪০ শতাংশেরও বেশি হয় খাদ্য বাবদ। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ এখন পর্যন্ত এতো বড় খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি হাতে নেয়নি। প্রায় সোয়া এক লক্ষ কোটি রুপির খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের কারণে সরকারের খাদ্য ভর্তুকি অন্তত ৪০ শতাংশ বেড়ে যাবে।
অনেকে বলছেন, এই সোয়া এক লক্ষ কোটি রুপিই যদি রাস্তাঘাট, বিদ্যুত্, বিদ্যালয় ও আইন-শৃঙ্খলার পেছনে ব্যয় করা হয় তাহলে বেশি সুফল আসবে। এতে করে উদ্যোক্তারা নতুন ব্যবসা খোলার জন্য উত্সাহিত হবে। ফলশ্রুতিতে বাড়বে দীর্ঘস্থায়ী চাকরি; বাড়বে সরকারের কর রাজস্ব। তাদের কথা মতে, খাদ্য নিরাপত্তার নামে কাজের কাজ কিছুই হবে না; বাড়বে কালোবাজারি ও দুর্নীতি। ভারতে রেশনের দোকানগুলো থেকে প্রায় অর্ধেক সামগ্রী সরিয়ে নেয়া হয়। তারপর বিক্রি হয় খোলাবাজারে। কেউ কেউ বলছেন, খাদ্যশস্যের বদলে নগদ অর্থ দিয়ে সাহায্য করলেই বেশি ফল পাওয়া যাবে। আসলে ভোটের যুদ্ধে জিততেই খাদ্য নিরাপত্তা বিলটি পাস করাতে কংগ্রেস উঠেপড়ে লেগেছিল। তবে বিলের একটি দিক খুবই ভাল—শিশু, গর্ভবতী ও স্তন্যপান করানো মায়েদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার বিধার রাখা হয়েছে।
নানা চিন্তা-ভাবনা থেকেই খাদ্য নিরাপত্তা বিল পাস করানোর উদ্যোগ নেয় ইউপিএ সরকার। অপুষ্টি ভারতীয়দের কাছে নতুন কোনও বিষয় নয়। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রদত্ত বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ৭৯টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ৬৫। তাদের তথ্যানুযায়ী, ভারতের ৬০ মিলিয়ন শিশু কম ওজন ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত আর মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ অপুষ্টির শিকার। ২০০৫ থেকে ২০১০ এ সময়ে কম ওজনের শিশুর প্রশ্নে ১২৯টি দেশের মধ্যে ভারত নিচের দিক দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। তাদের উপরে ছিল ইথিওপিয়া, নাইজার, নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দেশ।
একটি জরিপে দেখা গেছে, ভারতে সন্তান জন্মদানের বয়সসীমার ৩৬ শতাংশ নারীই কম ওজনবিশিষ্ট। তেইশটি সাব-সাহারান দেশের বেলায় এর গড় ছিল ১৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুসারে, ব্যাহত শারীরিক প্রবৃদ্ধি, আয়োডিন ও আয়রনের ঘাটতিতে ভারতে উত্পাদনশীলতার ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ৩ শতাংশের সমান। ঔপনিবেশিক আমলের দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টির কথা না হয় মানা যায়। কিন্তু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বর্তমান ভারতে অপুষ্টির বিষয়টি কিছুতেই মানা যায় না। সেজন্যই আইনপ্রণেতা ও অর্থনীতিবিদদের কাছে উদ্বেগের বিষয় এ অপুষ্টি। তা দূর করতেই কংগ্রেস পাস করিয়ে নিল খাদ্য নিরাপত্তা বিল, যাকে অনেকেই বলছেন, নির্বাচনী কূটচাল।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, সমস্ত জনমত সমীক্ষায় এখনো পর্যন্ত কংগ্রেসের থেকে শত যোজন এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় কংগ্রেসের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী (কারণ একপ্রকার নিশ্চিত হলেও এখন পর্যন্ত অফিসিয়ালি ঘোষণা করা হয়নি) রাহুল গান্ধিকে পেছনে ফেলেছেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু এক সময় যেমন একশ’ দিনের কাজ ও নারেগা প্রকল্প পাশা উল্টে দিয়েছিল, কংগ্রেসের পক্ষে সে রকমভাবে খাদ্য নিরাপত্তা এবং জমি অধিগ্রহণ বিল দুটি আগামী সংসদ নির্বাচনে কোনো যাদু দেখাতে পারে কি-না তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় বিজেপি।
সে কারণে দলের মধ্যে দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছিল নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হোক। যাতে সংসদের বাদল অধিবেশনে কংগ্রেসের যে সাফল্য তা মোদির ভারে ও ধারে চাপা পড়ে যায়। সম্ভবত সে জন্যই বিজেপির তত্পর শীর্ষনেতারা আরএসএস নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনঘন বৈঠক ও চূড়ান্ত আলোচনা সেরে তাদের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছেন তথাকথিত ‘হিন্দু হূদয় সম্রাট’ কে।