বরিশালে নিখোঁজের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৩, ২২:২৪
বরিশালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। এই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম। ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত জেলার এক ডজনের বেশি রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নিখোঁজ হয়েছেন। অধিকাংশকেই আইন-শৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়ার পর হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে আইন-শৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে অপহরণ কিংবা হত্যা করে লাশ গুমের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করা হচ্ছে। অপহরণের পর যাদের লাশ উদ্ধার হয়েছে সেই লাশ নিয়েও রয়েছে নানা বিভ্রান্তি। অনেক ক্ষেত্রে লাশের ডিএনএ টেস্ট করা হলেও নিখোঁজ ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। বছরের পর বছর ধরে তাই রহস্যাবৃত এসব নিখোঁজ ও অপহরণের ঘটনা থেকে যাচ্ছে লোকচক্ষুর অন্তরালে।
জানা গেছে, এই নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা শুরু হয় ২০০৭ সালে। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর নগরীর কাউনিয়ার বাসা থেকে অপহরণ করা হয় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক শফিকুল্লাহ মোনায়েমকে। উজিরপুর উপজেলার হারতা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবীর খানকে ২০১০ সালের ২৩ নভেম্বর আইন-শৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে ঢাকার রামপুরা এলাকা থেকে অপহরণ করা হয়। তাকে অপহরণ কিংবা আটকের খবর স্বীকার করেনি কোন সরকারি সংস্থা। হুমায়ুনের নিখোঁজের সংবাদ সর্বত্র ছড়িয়ে পরলে একটানা পাঁচদিন উজিরপুর উপজেলার হাজার-হাজার নারী-পুরুষ এলাকার সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। আন্দোলন-সংগ্রাম ও পরিবারের চোখের পানি নিখোঁজ হুমায়ুনের কোন সন্ধান দিতে পারেনি। এ ঘটনায় হুমায়ুনের স্ত্রী রত্না বেগম রামপুরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। তিনি জানান, নিখোঁজ স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আশায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেও কোন সুফল মেলেনি।
নগরীর করিম কুটির এলাকার আব্দুর রশিদের পুত্র ২১ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবুল হায়দার ২০১০ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাজধানীর একটি আবাসিক হোটেল থেকে নিখোঁজ হন। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা আইন-শৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে হায়দারকে তুলে নিয়ে যায়। পরিবারের পক্ষে র্যাবের প্রধান কার্যালয়ে অভিযোগ দিয়েও কোন লাভ হয়নি বলে জানালেন নিখোঁজ হায়দারের স্ত্রী রোমানা।
এদিকে নিখোঁজের পাশাপাশি অপহরণের পর লাশ হয়ে ফেরার ঘটনাও একেবারে কম নয়। ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে উজিরপুর থেকে নিখোঁজ হন সাবেক সর্বহারা নেতা বাদল ওরফে কানা বাদল। কয়েকদিন পর মাদারীপুর থেকে তার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। একইভাবে ২০০৮ সালে ঢাকার দৈনিক বাংলার মোড় এলাকা থেকে সাদা পোশাকে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা মাইক্রোবাসে তুলে নেয় বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপি নেতা গোলাম মোস্তফা নান্নাকে। তিনদিন পর তার গ্রামের বাড়ির কাছে নান্নার লাশ পাওয়া যায়।
বিএম কলেজের ভিপি মশিউল আলম সেন্টু ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে ঢাকার কাটাবন এলাকা থেকে নিখোঁজ হন। র্যাব তাকে গ্রেফতার করেছে বলে পুরো নগরীতে গুঞ্জন চলে। র্যাব কর্মকর্তারা এই গ্রেফতার সম্পর্কে কোন তথ্য দিতে পারেনি। দু’দিন পর নান্নার মতই সেন্টুর লাশ পাওয়া যায় নগরীর কাশিপুর এলাকায়। এসব অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন সংশ্লিষ্টদের পরিবার। কিন্তু কোন সুফল পাননি।
এছাড়া ২০১০ সালের ১৯ মার্চ পাথরঘাটার চরদোয়ানি বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তালুকেরচর গ্রামের মত্স্য ব্যবসায়ী আবুল কালাম। ২০১২ সালের মে মাসে পাথরঘাটা উপজেলার কাঠালতলী এলাকা থেকে নিখোঁজ হন সাগরের মত্স্য শিকারী শাহে আলম। একই বছরের জুন মাস থেকে নিখোঁজ রয়েছেন একই উপজেলার পদ্মাস্লুইচ গ্রামের জেলে কবির হোসেন।
অন্যদিকে ঝালকাঠির রাজাপুরের সাতুরিয়া এলাকার ফোরকান, মিজান ও তার ভাই মোর্শেদ ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে অপহূত হন। কিছুদিন পর তুরাগ নদী সংলগ্ন বালুর মাঠ থেকে মিজান ও ফোরকানের লাশ উদ্ধার হয়। তবে কিছুদিন পর মোর্শেদ এলাকায় ফিরে আসেন। মিজান ও ফোরকানের লাশ কবর থেকে তুলে পুলিশ ডিএনএ পরীক্ষার পর নিশ্চিত হয় লাশ দু’টি তাদের নয়। মিজান ও ফোরকানের কবরে কাদের লাশ মাটি দেয়া হয়েছে তা আজো জানা যায়নি।
গত বছর আগস্ট মাসে গৌরনদীর টরকী এলাকা থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়া হয় কালকিনি উপজেলার সর্বহারা নেতা হুমায়ুন কবির টিপুকে। আজও তার হদিস মেলেনি। ২০১১ সালের ২৪ মার্চ সরকারি বরিশাল কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহবায়ক রাফসান আহমেদ জিতু খুনের ঘটনার মূলহোতা মহানগরীর ২০নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি ফিরোজ খান কালু ও তার ভাই মিরাজকে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা অপহরণের পর গুপ্ত হত্যা করেছে বলে সমপ্রতি এক সাংবাদিক সম্মেলনে তাদের মা ফিরোজা বেগম অভিযোগ করেছেন। একই বছর ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার টঙ্গি বিশ্ব এজতেমায় গিয়ে নিখোঁজ হন নগরীর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মিরাজ আহমেদ। কয়েক মাস পর তার লাশ পশ্চিমবঙ্গের একটি হাসপাতালের হিমাগারে পাওয়া যায়। কি ভাবে সে ভারতে গিয়ে লাশ হল তা আজো রহস্যাবৃত।
সর্বশেষ গত মাসে শ্রমিক লীগ নেতা ফাঁসি কামাল, কাউন্সিলর আকতার উল আলম সামু ও উজিরপুরের শাহাদাত্ নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে অপহরণের পর তাদের হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। শাহাদাত্ অপহরণের অভিযোগ বরিশাল কোতয়ালী মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে গত ২৭ সেপ্টেম্বর। ফাঁসি কামাল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জিডি করা হয়েছে ঢাকার মিরপুর থানায়। কিন্ত পুলিশ জিডি তদন্ত করে কোন কুল কিনারা করতে পারছে না।