রাবিতে সাড়ে তিন বছরে এক ডজন ছাত্রলীগ নেতার রগ কেটেছে শিবির
আনিসুজ্জামান/শাকির আহমাদ, রাজশাহী অফিস ও রাবি সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৩২
‘ওদের বর্বরতার সাক্ষী আমার পঙ্গুত্ব। ফারুক মরে যন্ত্রণা থেকে বেঁচেছে। আমরা বেঁচে গিয়ে যন্ত্রণা ভোগ করছি।’ কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী সাইফুর রহমান বাদশা।
তিনি বলেন, ২০১০ সালে শিবির ক্যাডাররা চাপাতি দিয়ে আমার হাত পায়ের রগ কাটার পর মাথায় চাপাতির কোপ দিয়ে মারা গেছি ভেবে হবিবুর রহমান হলের পিছনে ফেলে রেখে চলে যায়। বাঁচবো ভাবিনি, বেঁচে আছি আল্লাহর অশেষ রহমতে। শুধু বাদশা নন, রাবিতে গত সাড়ে তিন বছরে শিবিরের বর্বরতার শিকার হয়েছেন রাবি শাখা ছাত্রলীগের প্রায় এক ডজন নেতাকর্মী। তারা সকলে এখন বয়ে বেড়াচ্ছেন পঙ্গুত্বের অভিশাপ। স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকেও বঞ্চিত তারা। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মতিহার থানায় মামলা হলেও পুলিশ আসামিদের গ্রেফতার করতে পারেনি। এসব মামলার পুলিশি তদন্তও চলছে ঢিমেতালে। ফলে একের পর এক রগ কাটার ঘটনা বেড়েই চলেছে।
এ ব্যাপারে নগরীর মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম আবদুস সোবহান বলেন, আমি নতুন এসেছি। গত এক বছরে শুধু এই থানার ছয়জন ওসি বদলি হয়েছেন। মামলাগুলো তদন্তের কী অবস্থা কাগজপত্র না দেখে কিছু বলতে পারবো না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আশির দশকে রাবিতে রগ কাটার রাজনীতি শুরু করে শিবির। মাঝে তাদের রগকাটা বন্ধ ছিল। ২০১০ সালের রাবিতে আবারো শুরু হয়েছে শিবিরের রগ কাটার রাজনীতি। শিবিরের এমন হামলায় দীর্ঘ হচ্ছে পঙ্গুত্বের তালিকা।
শিবিরের সর্বশেষ হামলায় পঙ্গুত্ব বরণের পথে রয়েছেন রাবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুল ইসলাম সাদ্দাম। হামলায় তার বাম পা, মাথা ও পিঠে মারাত্মক জখম হয়েছে। এর আগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাবি শাখা ছাত্রলীগের কর্মী ইমাম মেহেদী হাসানের রগ কেটে দেয়া হয়। এ দিনের হামলায় ছাত্রলীগ কর্মী প্রসেনজিত্, নাহিদ ও সাদ্দাম গুরুতর আহত হন।
এর আগে গত ২৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম তৌহিদ আল হোসেন ওরফে তুহিনের পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির। ঐদিন রাত ১০টার দিকে হামলাকারীদের ছোঁড়া গুলিতে আহত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সমাজসেবা সম্পাদক শাওন সরকার।
শিবির নৃশংসতম হামলা চালায় ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি ভোর পর্যন্ত। তারা তত্কালীন শাহ্ মখদুম হল শাখা ছাত্রলীগের নেতা ফারুক হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করে। আর রগ কেটে দিয়ে যায় বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মীর। শিবিরের সেই বর্বরতার শিকার হন সেই সময়ের ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমান বাদশা, ফিরোজ মাহমুদ, আরিফুজ্জামান ও শহিদুল ইসলাম। বর্বরতার শিকার হয়ে এখনো তারা স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে আসতে পারেনি।
বাদশা বলেন, শিবিরের নৃশংসতা কেড়ে নিয়েছে আমার সব স্বপ্ন। বৃদ্ধ বাবার পেনশনের টাকায় এখনো নিজের চিকিত্সা করতে হচ্ছে। পড়াশোনা শেষ করে একটা চাকরিও জোগাড় করতে পারিনি।
গত বছরের ২১ নভেম্বর চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তত্কালীন সহ-সভাপতি (বর্তমানে কেন্দ্রীয় সদস্য) আখেরুজ্জামান তাকিম। রামদা দিয়ে কোপানো পরে তার বাম পায়ের ও একটি হাতের রগ কেটে দেয় তারা। এই হামলার জন্য ছাত্রশিবিরকে দায়ী করে ছাত্রলীগ। তাকিম জানান, হাতের একটি আগুলে কোনো অনুভূতি নেই। বেশিক্ষণ হাঁটতে গেলে ব্যথা করে বাম পা।
এ বছরের ১৭ মার্চ রাতে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে হামলা চালায় শিবির। ৩০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলামের বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার হাত-পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির কর্মীরা। ঐ ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের সদস্য মাইনুল হোসেন ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে কুপিয়ে জখম করে শিবির। জামায়াত-শিবিরের প্রতি ঘৃণা আর ধিক্কার জানিয়ে শহিদুল বলেন, এমন নির্মমতার শিকার যেন আর কেউ না হয়।
চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী মেহেরচণ্ডী এলাকায় চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হন জেলা ছাত্রলীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান। হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার বাম পায়ের ও ডান হাতের রগ কেটে দেয়। পরবর্তী সময়ে হাবিবুরের ডান পায়ের হাঁটু পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়েছে। এখন স্ক্র্যাচ ছাড়া চলতে পারেন না তিনি। এ ঘটনার জন্য শিবিরকেই দায়ী করেছেন তিনি ও তার সংগঠন ছাত্রলীগ। অভিমান নিয়ে তিনি বলেন, প্রথমে দল থেকে কৃত্রিম পা সংযোজনের জন্য আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কিছুই হয়নি।
এছাড়াও গত বছরের ১১ অক্টোবর ছাত্রলীগ কর্মী ইমরান হোসেন এবং ২৪ অক্টোবর ছাত্রলীগ নেতা মাহবুব আলমকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছিল। এসব ঘটনার জন্য ছাত্রলীগ নেতারা শিবিরকেই দায়ী করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু হুসাইন বলেন, শিবির আসলে কোনো ছাত্রসংগঠন নয়, এটি একটি জঙ্গি সংগঠন। একমাত্র শিবির ক্যাডাররা রাতের অন্ধকারে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হত্যা ও পঙ্গু করে দেয়। যারা সামনে এসে মোকাবিলা করতে ভয় পায়, তাদের ছাত্র রাজনীতি করার অধিকার নেই।
এ ব্যাপারে মতামতের জন্য ছাত্রশিবিরের কোনো দায়িত্বশীল নেতাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিটি ঘটনার পরপর ছাত্রশিবির নেতৃবৃন্দ এসব ঘটনায় তাদের সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন।