‘দর্শক’ নয়, স্পন্সরবান্ধব ঈদ অনুষ্ঠান!
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০১৩, ১৬:৫০
ঈদ অনুষ্ঠানের সারমর্ম বা ছোট্ট করে গল্প বললেও সেই একই কথার খসড়া হয়ে যাবে। সেই একই শিডিউল বা ধারাবাহিকতা বলতে হয়। তবে দিনকে দিন কর্পোরেট আর স্পন্সর কোম্পানিগুলোই গ্রাস করছে নাটক, টেলিফিল্ম বা গানের অনুষ্ঠান। এটা একটা ভয়ংকর প্রক্রিয়ায় দাঁড়িয়ে গেছে। আর এভাবে চলতে থাকলে হয়তো চ্যানেলের অনুষ্ঠান প্রধান বা গবেষণা সেল বলতে আর কিছুদিন বাদে কোনো কিছুর অস্তিত্বের প্রয়োজন পড়বে না। উদাহরণ দিয়ে এটুকু বলা যায়, এখনই বিভিন্ন চ্যানেলের মিউজিক্যাল লাইভ অনুষ্ঠানের শিল্পী নির্বাচন করেন স্পন্সর কোম্পানিগুলো। সেখানে চ্যানেলের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ঈদেও সেই একই অবস্থা। বিষয়টা এমন যেন, টাকা দিচ্ছি যেহেতু আমরা, আমাদের পছন্দের শিল্পীরাই আমরা নিয়ে আসব। কার কী বলার আছে? দর্শক দেখলে দেখুন না দেখলে কোনো কিছু যায় আসে না। আর এই সূত্রমতেই চলছে এখনকার অনুষ্ঠান প্ল্যানিং। তবে এটাকেই মন্দের ভালো হিসেবেই হয়তো দেখছে কেউ কেউ। ঈদে চ্যানেল নাইন তাদের পুরো ঈদ অনুষ্ঠানমালা একটি স্পন্সর কোম্পানির ব্র্যান্ডিংয়ে দিয়েছেন, এনটিভিও কম নয়। এতে হয়তো কিছু সুবিধা পেলেও পেতে পারেন দর্শকেরা। তা হলো বিজ্ঞপনের বাড়াবাড়ি থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া। কিন্তু আদপে দর্শকবান্ধব কী কিছু হচ্ছে আদৌ? গত ঈদে বলেছিলাম কোনো চ্যানেল কি কোনোদিন কোনো দর্শকের দরজায় টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করেছে, ‘প্রিয় দর্শক আপনারা কী দেখতে চান? সেই জরিপ আজও অবধি হয়নি। কারণ চ্যানেল এখন স্পন্সর আর কর্পোরেট মোড়কে বন্দি। তারা দর্শকের ঘরে নয় বরং স্পন্সর কোম্পানির টেবিলে টোকা দিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কী দেখাতে চান বলুন, কী দেখালে আপনারা বেশি টাকা দেবেন। আমরা না হয় নীতি থেকে কিছুটা সরে এসেও আপনাদের খুশি রাখার জন্য তা-ই প্রচার করব। শ্রদ্ধেয় ‘স্পন্সর বা এজেন্সি’ আপনি শুধু হুকুম দিন আমরা ব্যবস্থা করছি।’ এই করুণ বাস্তবতার মোড়কে দিনকে দিন বন্দি হচ্ছে চ্যানেলের অনুষ্ঠানরাশি। তাই ভবিষ্যতে চ্যানেলের কোনো নাটক বা অনুষ্ঠানের সমালোচনা ছাপতে গেলে তার দায় চ্যানেল নিতে চাইবে না। দায় বদলে এখন চলে গেছে এজেন্সির ঘাড়ে। এই ব্যর্থতা, এই অবক্ষয়ের শেষ কোথায় আমরা কেউ জানি না?
এরই ভেতরে অধিকাংশ চ্যানেলের নাটক চ্যানেলের অনুষ্ঠান প্রধানের অনুমতি নিয়ে নয়, বরং স্পন্সর কোম্পানিই ঠিক করছেন কাকে দিয়ে নাটক করাবেন। কে থাকবে অভিনয়ে? এতগুলো যুক্তি বা ঘটনার সাথে কোনো দর্শকের চাহিদা জড়িয়ে নেই। অথচ প্রতিদিন প্রতিটা উপস্থাপক বলছেন আপনাদের জন্যই এই অনুষ্ঠান! কী বিচিত্র বোকা বাক্সের মিথ্যাচার!
ঈদের এই আনন্দে পরিমিত অনুষ্ঠানের কথা বলে আসছেন একাধিক গুণী মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা। কিন্তু আদৌ কী হচ্ছে? বিজ্ঞ ব্যক্তিত্বরা শুধু বলেই যাচ্ছেন। যা হওয়ার তাই হচ্ছে। ঈদ যেন প্রতি বছরই বড় হয়ে ৭ থেকে ৮ দিনের ব্যাপ্তিতে চলে যাচ্ছে। কখনও কখনও তারও বেশি। চ্যানেলের হট্টগোলে এই প্রভাবের বাইরে এখন অনেক তরুণ নির্মাতা নিজেদের মুন্সিয়ানা দেখাচ্ছেন যা ইতিবাচক। বিশেষ করে ঈদে চ্যানেলওয়ালাদের খানিকটা বাজেট বেশি থাকায় নাটক ও অন্যান্য প্রোডাকশনগুলোর মানের কিছুটা উন্নয়ন ঘটে বৈকি! কিন্তু সেও যদি এজেন্সির সুবিধাভোগী কোনো নির্মাতা হয়ে থাকেন। নয়তো মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেট ভারী হয়, নির্মাতা কম টাকায় যতটুকু ভালো পারা যায়, তাই করার চেষ্টা করেন। এবারেও একইভাবে সেই উন্নয়ন দেখবে। এ ছাড়া ঈদে এখন নিজেদের নাটক নিয়ে প্রচার ও প্রপাগান্ডাও হচ্ছে বেশ। এর ভেতরে প্রচারের দৌড়ে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে যেন চ্যানেল আইয়ের ‘ছোটকাকু’ সিরিজ। এই নাটকের পর এর গ্রন্থ প্রকাশনা হচ্ছে। ঈদের ভেতরে তাই কনসেপ্ট নিয়ে আলাদা বিশেষত্ব বের করতে চাইলে তেমন কিছুই মিলবে না। তবে এর ভেতরেও নিশ্চয়ই প্রতি ঈদের মতো কিছু অনুষ্ঠান আর নাটক দাগ কেটে যাবে। যার কৃতিত্ব নেওয়ার ক্ষমতা চ্যানেল বা এজেন্সির থাকবে না, তার পুরো কৃতিত্ব হবে ওই নির্মাতার। কারণ সব অংক ভুলে যে নির্মাতা নিজের কাজের প্রতি প্রেম দিয়ে প্রোডাকশনটি তৈরি করেছেন। কারণ বাকি সবই বৈরি হাওয়ায় আজ টালমাটাল!
পাশাপাশি ঈদের অনুষ্ঠানমালায় বিটিভির ‘আনন্দমেলা’সহ অন্যান্য অনুষ্ঠানও নিজেদের জৌলুস হারিয়েছে অনেক আগেই। তাই এ নিয়ে একই কথার চর্বিতচর্বণ হবে। তবে ঈদে চলচ্চিত্র তারকাদের ভেতরে অদ্ভুত এক সমীকরণ দেখা যায়। তা হলো অনুষ্ঠানের ধরন বিবেচনা করে নয়। বরং নিজের চলচ্চিত্রের প্রচারের সুবিধার্থে কোনো কোনো ঈদের অনুষ্ঠানে কোনো কোনো তারকার অতি উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। যেমন এবারের ঈদে জয়া আহসান। ছোট পর্দার গুণী এই অভিনেত্রী কদাচিত্ টকশোতে যান এটা অনেকেরই জানা। কিন্তু এবারের ঈদে যেহেতু তার চলচ্চিত্র রিলিজ হবে তাই একাধিক অনুষ্ঠানে গিয়েছেন অনুষ্ঠানের মানে মুগ্ধ হয়ে নয়, বরং নিজের ছবির প্রচারের স্বার্থেই। এটা অনুষ্ঠানের ধরনগুণে নয় বরং চলচ্চিত্রের প্রচারগুণে জয়াকে বিভিন্ন টকশোতে দেখতে পাচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশেই হয়তো এই প্রচার অব্যাহত। আমাদের দেশেও এত একই টাইপের অনুষ্ঠানের ভিড়ে পিআর কমিউনিকেশনের সূত্রে কিছুটা ভিন্নমাত্রা এলে মন্দ কী? এর বাইরে চলচ্চিত্র বা ঈদের ছবির প্রচারণার ক্ষেত্রে এখন অধিকাংশ চ্যানেলই ইতিবাচক। দর্শকেরাও চ্যানেলগুলোর এই ইতিবাচক প্রচারের ফলে হলমুখী হতে শুরু করেছেন। ঈদের ছবির বিশেষত্বও এনে দিচ্ছেন এখনকার স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো।
তবে তারকাদের নিজস্ব খরচে মিউজিক ভিডিও তৈরি প্রক্রিয়ায় চ্যানেলগুলো আর নিজ উদ্যোগে গানের অনুষ্ঠান নির্মাণ করেন না। এই বাধ্য অলসতায় তারা এখন শুধু টিভি লাইভ আর মিউজিক ভিডিওর ওপরেই ভরসা রাখছেন। ঈদে এখন ৭ দিন ধরে প্রতিদিনের ধারাবাহিক নিয়মিত ঘটনা। এনটিভি গতবছর বিজ্ঞাপন কমিয়ে ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়িয়ে কিছু অনুষ্ঠান প্রচার করেছিল, তাতে দর্শক সাড়াও পেয়েছিল প্রচুর। এবারেও তেমন কিছু নতুন স্ট্র্যাটেজি রাখছে বিভিন্ন চ্যানেল। বাংলাভিশন নাটক, আরটিভি গান ও অন্যান্য অনুষ্ঠানমালায় নিজেদের সমৃদ্ধ রেখেছে। এটিএন বাংলা তাদের নিজস্ব ছকেই রেখেছে অনুষ্ঠানরাশি। চ্যানেল আইতেও ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ বা ‘ছোটকাকু’ এমন কিছু অনুষ্ঠানেই তাদের প্রমো ও অন্যান্য প্রচারের গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। এবারের ঈদেও তাই। এশিয়ান টিভি এবারেও নিজেদের ‘ধুমধারাক্কা’ মুডেই দর্শক ধরে রাখার প্রক্রিয়া সাজিয়েছেন, ইন্ডিপেন্ডেন্ট, চ্যানেল টুয়েন্টিফোর, সময় টিভি, এটিএন নিউজ, একাত্তর টিভি ঈদ এলে যেন খানিকটা বিপাকে পড়েই দর্শক ধরে রাখার অন্য উপায় খোঁজেন। কারণ এই সময়টাতে রাজনৈতিক উত্তাপ কম বলে নিউজ চ্যানেলের দর্শকের আগ্রহ উত্তাপেও কিছুট ভাটা পড়ে। সেই ভাটার উজানে ঢেউ তুলতেই তারা সেলেব শো আর গানের অনুষ্ঠানে ভর করেন। এবারেও এর ব্যতিক্রম নেই। একুশে টিভি তার নিজস্ব ঢঙে অনুষ্ঠান সাজিয়েছে। অন্যদিকে মাই টিভি, মোহনা টিভি, চ্যানেল সিক্সটিন, বিজয় টিভিসহ এই ক্যাটাগরির চ্যানেলগুলো নিজেদের ছোট স্টুডিওতে নিজেদের বাজেট অনুযায়ীই বিশেষ অনুষ্ঠানের পসরা সাজান। এ ক্ষেত্রে প্রতি ঈদেই যেন নিজেদের অবস্থান থেকে কিছুটা উত্তরণের চেষ্টা করেন তারা। বৈশাখী টিভি বাজেট আর আড়ম্বর নিয়ে এবারেও চেষ্টা করছেন নিজেদের ছোট পর্দার ফ্রেমে দর্শককে ফেরানোর। এসএ টিভি গত ঈদেও বিগ বাজেটের নাটক ও অনুষ্ঠান তৈরির রেকর্ড গড়েছিলেন এবারে খানিকটা স্থিতিতে এসে নিজেদের মুন্সিয়ানা দেখানের চেষ্টা করছেন। দেশ টিভি বরাবরের মতো এবারেও বিদেশি শিল্পীকে দিয়ে গাওয়ানোর প্রক্রিয়ায় দর্শক ধরে রাখার চেষ্টা করছে। মাছরাঙা টেলিভিশন নিজস্ব ছকে অনুষ্ঠান সাজিয়েছে। তাতে আড়ম্বরের বাড়াবাড়ি নেই। গাজী টিভির অনুষ্ঠানমালায় তারা গত ঈদের মতো আড়ম্বড় না থাকলেও নিজেদের নিয়মিত অনুষ্ঠানমালা থেকে কিছুটা বিশেষত্ব রাখার চেষ্টায় ছিল।
তবে হরেক চ্যানেলের এত এত অনুষ্ঠানের বাইরে ঘরের রিমোটে ভারতীয় চ্যানেলের দাপট আর প্রতিযোগিতা তো রয়েছেই। এত কিছু পেরিয়ে এই ব্যস্ত সময়ে একজন দর্শকেরা রিমোট কোন দৃশ্যে আটকে থাকবে তার হয়তো সঠিক নির্ণয় আসলেই খুবই দুরূহ কাজ।