‘ফ্যাশন শিল্প’ প্রসারে তরুণরাই অগ্রপথিক
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৩১
বাংলাদেশে বিভিন্ন উত্সবকে কেন্দ্র করে ফ্যাশন হাউজগুলো মেতে ওঠে প্রতিযোগিতায়। ঈদ-পূজাতো বটেই, বর্ষবরণ, বসন্ত উত্সব, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর, মা দিবস, বাবা দিবস, বন্ধু কিংবা ভালোবাসা দিবস প্রভৃতি উত্সবগুলো নগরীর মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে ফ্যাশন হাউজগুলো। পত্রিকার পাতা জুড়ে চলে নানা আয়োজনের বিজ্ঞাপন, পাঁচতারা হোটেলে ফ্যাশন প্রতিযোগিতা।
এই ফ্যাশন হাউজ উদ্যোক্তারা পোশাক আর জীবনযাপনের পণ্যকে উপজীব্য করে বহু মানুষের কর্মসংস্থান করেছে তাদের বুটিক হাউজে। ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে বিষয় অন্তর্ভুক্তিকরণসহ ফ্ল্যাগশিপ, দেশিদশ, স্বদেশি নানা নতুন কনসেপ্ট যুক্ত হয়েছে ফ্যাশন হাউজ শিল্পের সাথে। এই শিল্পের উদ্যোক্তা, কর্মী, ডিজাইনার, ক্রেতা— সবাই তরুণ। তরুণদের কাঁধে ভর করে বহু চড়াই-উত্রাই পাড়ি দিয়ে আজ এই শিল্প নিজেদের পণ্যকে অন্যদেশের পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত করেছে। উত্সব মানে যেখানে বিদেশি পোশাক ছিল সেখানে দেশি পেশাক ভিড় করছে বলে মন্তব্য করেন ফ্যাশন ডিজাইনার ও আর্ন্তজাতিক মডেল বিবি রাসেল।
৮০-এর দশক থেকে ‘আড়ং’ এবং ‘কমুদিনী’ বিদেশি বস্ত্রের সাথে প্রতিযোগিতা করে দেশীয় পরিধান পণ্য বাজারে আনে। এই পথ ধরে ’৯০-এর দশক থেকে কিছু তরুণ নিজেদের শ্রম নিষ্ঠা একাগ্রতা দিয়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয় ফ্যাশন ভাবনাকে, এমন মন্তব্য করেন ‘স্টুডিও এমদাদ’-এর স্বত্বাধিকারী এমদাদ হক। ‘কে ক্র্যাফ্ট’-এর অন্যতম কর্ণধার খালিদ মাহমুদ খান বলেন, তরুণদের ভাবনা-চিন্তা-কাজকে তরুণরাই প্রথম গ্রহণ করে। পরে এদেশের আবহাওয়া উপযোগী পোশাক ওঠতে শুরু করে গৃহিণী, শিশু ও প্রবীণদের গায়ে। ঈদ কিংবা উত্সবে বিদেশি পণ্যের, বিশেষ করে ভারতের একচেটিয়া আধিপত্য ক্ষীণ করে দেশীয় পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ-ফতুয়া, শাড়ির কদর বাড়তে থাকে বলে জানান এমদাদ হক। ২০ বছর আগে তিনি ‘আড়ং’-এর বস্ত্র নিয়ে কাজ করতেন। সেখান থেকেই ফ্যাশন ভাবনাভিত্তিক পেশার আত্মপ্রকাশ। দেশীয় এই শিল্প প্রসারের সাথে সাথে সংখ্যায় বাড়তে থাকে ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান।
তরুণীরাও স্বাধীন পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে ফ্যাশন হাউজকে। তেমনই একজন অভিজাত ফ্যাশন হাউজ ‘ড্রেসিড্রেলের’ কর্ণধার মায়া রহমান। মায়া বলেন, যখন দেশে ফ্যাশন হাইজ কনসেপ্ট প্রসার লাভ করছে তখন লক্ষ্য করলাম ভাল মান, অভিজাত আর জমকালো পোশাকের জন্য ক্রেতারা বিদেশি পণ্য কিনছেন। সেই শূন্যতা পূরণের জন্য আমি ঐতিহ্যবাহী ম্যাটেরিয়াল দিয়ে পার্টি আর জমকালো অনুষ্ঠান উপযোগী পণ্য নিয়ে আসি। পাঁচ জন কর্মী আর একটি ছোট্ট শো-রুমের ড্রেসিড্রেল আজ ৮ শতাধিক কর্মী এবং ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ৪টি শো-রুম নিয়ে পথ চলছে।
শুরুতে এসকল প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনারের পদ পূরণ করতো দেশের চারুকলা শিক্ষার্থীরা। কারণ তখন পর্যন্ত ফ্যাশনভিত্তিক পাঠ্যসূচি দেশে চালু হয়নি। তেমনই একজন সাদা-কালোর অন্যতম ডিজাইনার ও কর্ণধার তাহসীনা শাহীন। শাহীন এই প্রতিযোগিতায় নেমেছেন দুইটি রংয়ে ভর করে। শাহীন বলেন, শিল্পীরা সৃজনী ক্ষমতা রাখেন। আড়ংয়ের অনুপ্রেরণা আমাকে এই পেশায় আনে। তিনি আরো বলেন, মানুষের নান্দনিক চাহিদার ব্যাপ্তিকে প্রাধান্য দিয়ে দুইটি রঙে আমরা নানারকম কাজ করছি। এই দুই রঙের পোশাক নিয়ে শাহীনের ‘সাদা-কালো’ এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আমেরিকার নিউইয়র্কেও স্থান করে নিয়েছে।
অনেক হাউজ মানে অনেক প্রতিযোগিতা। অনেকে ঘরে বসেও কাজ করছেন। বাড়াচ্ছেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। শাহীন জানান, হিসাব মতে দেশে এখন ৫০ হাজারের বেশি নারী-পুরুষ ফ্যাশন হাইজ কেন্দ্রিক পেশার সাথে জড়িত এবং বাত্সরিক আয় প্রায় ৫০০০ কোটি টাকা। বড় এই ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় তরুণরাই মূল চালিকা শক্তি বলে তিনি মন্তব্য করেন। বড় এই প্রতিযোগিতায় অনেকে হাতে-কলমে শিখে পেশা গ্রহণ করছে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে দুই/একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ফ্যাশন ডিজাইনিং-এর উপর পাঠ্যসূচি চালু করেছে। যেখানে কাপড়ের বুনন, রঙ, ডিজাইনের উপর শিক্ষা নিয়ে দক্ষ ডিজাইনার আসছেন এই শিল্পে। এমনই একজন জাহিদ হাসান কাজ করেন জনপ্রিয় একটি প্রতিষ্ঠানে। তিনি মনে করেন হাতে-কলমে শিক্ষা আর কাজ করে শেখার মধ্যে পার্থক্য আছে। তাই ক্রমবর্ধমান এই সেক্টরকে যারা পেশা হিসেবে নিতে চান, তাদের শিক্ষা নিয়ে আসতে পরামর্শ দেন তিনি। শরিফুল ইসলাম পড়েন শান্তা-মারিয়াম প্রযুক্তি বিশ্ববািদ্যালয়ের ফ্যাশন ডিজাইনিং বিভাগে। শরিফ বলেন, দেশে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত বেকার হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও কর্মবর্ধমান ফ্যাশন হাউজ শিল্পে তাদের মতো শিক্ষিত ডিজাইনারদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে বলে তিনি এ বিষয় পড়ছেন। ২০০৩ সালে যাত্রা শুরু করা উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা উন্নয়ন পরিচালক এবং ফ্যাশন ডিজাইনিং বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক রফিক সিদ্দিক জানান, শুরুতে এ বিষয় একটি সেমিস্টারে ৩৫ শিক্ষার্থীর একটি গ্রুপ থাকলেও বর্তমানে ৩৫ শিক্ষার্থীর ১২টি গ্রুপ রয়েছে। এ যাবত্ এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪ হাজারেরও অধিক শিক্ষার্থী ফ্যাশন হাউজ, গার্মেন্টস শিল্পে পেশা গ্রহণ করেছেন।