হগলিড গোশত খাইবে মোরা কি খামু?
আহাদুল ইসলাম শিমুল, জিয়ানগর (পিরোজপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৪৪
আজ রাত পোহালেই কাল কোরবানির ঈদ। কিন্তু কারো কারো কাছে কোরবানির পশুর মাংস খাওয়া যেন স্বপ্নের মতো ব্যাপার! অন্তত পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার সাউদখালী চরবাসীর জন্য। ঈদের আনন্দ যাদের জীবনকে কখনো ছোঁয় না। তাই বুঝি এখানকার বাসিন্দা বেগম বিবি (৬৫) আক্ষেপ করে বললেন, ‘হগলডি (সবাই) গোস্ত খাইবে, মোরা কি খামু না?’
এটা শুধু ব্যক্তি বেগমের প্রশ্ন নয়, দেশের বিত্তবানদের প্রতি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সাউদখালী চরের সকল বাসিন্দাই যেন এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন! গত ৭ বছর ধরে এই চরের মানুষ কোরবানির আনন্দ থেকে বঞ্চিত। তাদের জন্য কেউ আসে না এক টুকরো মাংস নিয়ে। তারা প্রতিনিয়ত জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন, তবুও হার মানেননি।
১৯৭৮ সালে জেলার কঁচা ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় জেগে ওঠা এই চরে নৌ-বাহিনীর মাধ্যমে ২০০৬ সালে ২৮৫টি পরিবার পুনর্বাসিত হয়। বর্তমানে এখানে বসবাস করছেন প্রায় দুই সহস্রাধিক মানুষ। উপজেলার সবচেয়ে রিক্ত, নিঃস্ব ও ভূমিহীন অসহায় লোকদের বসবাস এখানে। নেই বিশেষ কোন খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিত্সা, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। নৌকাই একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। নদীতে মাছ ধরে ও দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন এখানকার অধিকাংশ অসহায় মানুষ।
চরের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ২৯ নং চর সাঈদখালী সাইক্লোন সেল্টার কাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আ. বারী বললেন, ‘এই বিদ্যালয়ের দেড় শতাধিক শিশু শিক্ষার্থী বরাবরের মতো এবারও ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে। এখানকার শিশুরা কোরবানি ঈদের কথা কেউ শুনেছে মা বাবার কাছ থেকে, আবার কেউ জেনেছে পাঠ্য বই থেকে।’ তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র রাকিবের প্রশ্ন, ‘কোরবানি আবার কি?’ সে আদৌ জানেই না এটা মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উত্সব। আবার পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী পপি বলে, ‘এই চরে কেউরে কোন দিন কোরবানি দেতে দেহি নাই।’
বর্তমানে নদীতে মাছ ধরতে না পারায় আরো সমস্যায় পড়েছে চরের জেলে পরিবারগুলো। জেলে সোহরাব মাতুব্বর (৪২) বলেন, ‘গাঙ্গে (নদীতে) এহন (এখন) অবরোধ (কিছু দিনের জন্য মাছ ধরায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা) চলে। কয়ডা (কিছু) মাছ ব্যাইচ্চা (বিক্রি করে) কোরবানির দিন এট্টা (একটা) মুরহা (মুরগী) কিন্না (কিনে) পোলা মাইয়া লইয়া (নিয়ে) খামু -হে কায়দাও নাই।’
ষাটোর্ধ্ব আব্দুল হক হাওলাদার জানেন না, তিনি তার স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ে রহিমার ছেলে হাসানের মুখে এক টুকরো কোরবানির গোস্ত তুলে দিতে পারবেন কি না। তিনি বলেন, ‘এহনো জানি না অবুঝ নাতিরে কোরবানির গোস্ত খাওয়াইতে পারমু কি না।’
সাউদখালী চরের কারো প্রতি রাজনৈতিক নেতারা সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে দিলেও তাদের ঈদ শুভেচ্ছার পোষ্টার ঠিকই পৌঁছে গেছে চরাঞ্চলে। তাই জেলে আল আমিন (৩২) আক্ষেপ করে বলেন, ‘যে সময় ভোট আয়, হে সময় কত নেতাগো দেহি। ভোট গ্যালে আর মোগো জিগায় না কেউ।’