হাড় জোড়ার ইনজুরিতে করণীয়

হাড় ও জোড়া বিশেষজ্ঞ এবং আর্থ্রোস্কোপিক সার্জন সিটি হাসপাতাল, সাতমসজিদ রোড, লালমাটিয়া, ঢাকা শরীর ছোট বড় ১৪৭ টি জোড়ার সন্বয়ে তৈরী। বাস্তব সত্য যে, জীবনের কোন না কোন সময় যে কেউ জোড়ার ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়। তবে পেশাদার বা সৌখিন খেলোয়ারদের মাঝে এ সমস্যাটা বেশী দেখা যায। খেলাধুলা, বিভিন্ন ধরণের এক্সিডেন্ট, শারীরিক আঘাত ও পেশাগত কাজ থেকে ইনজুরি হতে পারে। ইনজুরির সময়কাল বিবেচনা করলে, কিছু ইনজুরি তত্ক্ষনাত এবং কিছু ইনজুরি দীর্ঘসময় ধরে হয়। ইনজুরি জোড়াকে বিভিন্ন স্তরে আক্রান্ত করে। ইনজুরির তীব্রতা অনুসারে জোড়ার আবরণ, লিগামেন্ট, হাড়, তরুনাস্থি বা মেনিসকাস এবং পেশী আক্রান্ত হয়। শরীরের যে কোন জোড়া আক্রান্ত হতে পারে । তবে গোড়ালি, হাঁটু, কটি, কাঁধ, কনুই, মেরুদন্ড ও আঙ্গুলের জয়েন্ট ইনজুরিতে বেশী ভুগে। ইনজুরির কারণ সমূহ ১. হঠাত্ মোচড়ানো (টুইসটিং) মুভমেন্ট। ২. জোড়ায় সরাসরি আঘাত। ৩. রিকশা থেকে পড়ে গেলে, গাড়ী বা মটর সাইকেল দুর্ঘটনায় জোড়া ইনজুরি হয়। ৪. ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেটবল, কাবাডি ও হা ডু ডু খেলোয়ারদের জোড়া ইনজুরির প্রবণতা বেশী । ৫. মই থেকে পড়লে, উপর থেকে লাফ দিয়ে পড়লে এবং গর্তে পড়ে গেলে জোড়া ইনজুরি হয়। ৬. সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় এক স্টেপ ভুল করলে। ৭. বয়স্কদের ব্যবহারজনিত ক্ষয়ের জন্য জোড়া ইনজুরি হয়। ৮. পেশাগত কারণে দীর্ঘসময় দাঁড়ালে, বসলে, জোড়া নড়াচড়া করলে এবং হাত উঁচু করে কাজ করলে জয়েন্ট ইনজুরি হয়। ৯. সামনে ঝুঁকে ভারী ওজন তুললে ইনজুরির প্রকারভেদ ১. জোড়ার চারপার্শ্বের চামড়া টিয়ার ও চামড়ায় রক্তক্ষরণ ২.পেশীর স্ট্রেইন, রক্তক্ষরণ ও টিয়ার বা ছিড়েঁ যাওয়া। ৩. লিগামেন্ট সেপ্রইন ও আংশিক বা সম্পূর্ণ ছিড়েঁ যাওয়া। ৪. জোড়ার আবরণ বা ল্যাবরাম ছিড়েঁ যাওয়া। ৫. আংশিক বা সম্পূর্ণ হাড় ভাঙ্গা। ৬. জয়েন্ট আংশিক বা সম্পূর্ণ স্থানচুত্যি হতে পারে। ৭. তরুনাস্থি বা মেনিসকাস আংশিক বা সম্পূর্ণ ছিড়ঁতে পারে। ইনজুরির উপসর্গ ১. প্রথমে তীব্র ব্যথা, পরে আস্তে আস্তে ব্যথা কমে আসে। ২. জোড়া নড়াচড়া করলে ব্যথা বেড়ে যায়। ৩. আঘাতের প্রথম দশ মিনিটের মধ্যে বা ২/৩ ঘন্টা পর জোড়া ফুলে যায়। ৪. ফুলা ও ব্যথার জন্য মুভমেন্ট করা যায় না। ৫. দাঁড়াতে বা হাঁটতে চেষ্টা করলে মনে হবে জোড়া ছুটে যাচ্ছে বা বেেঁক যাচ্ছে। ৬. আঘাতের সাথে সাথে ব্যক্তি “পপ” বা “ক্র্যাক” শব্দ শুনতে বা বুঝতে পারে। ৭. কিছু দিন পর বেশীক্ষণ বসলে, হাঁটু বা পা সোজা করতে কষ্ট হয় বা আটকিয়ে যায়। ৮. অনেক সময় আঘাতের অনেক দিন পর জোড়া ফুলে যায়, ভালো হয় এবং আবার ফুলে। এভাবে চলতে থাকে। ৯. দীর্ঘদিন যাবত্ ইনজুরি থাকলে পেশী শুকিয়ে যায় এবং জোড়ায় শক্তি কমে যায়। ১০.উঁচু নিচু জায়গায় হাঁটা যায় না, সিঁড়ি দিয়ে উঠা নামা করতে এবং বসলে উঠতে কষ্ট হয়। ১১. কাঁধ ও কনুই ইনজুরির জন্য কাঁত হয়ে ঘুমানো, পিঠ চুলকানো, জামার বোতাম লাগানো, চিরুনি দিয়ে মাথা আচঁড়ানো এবং হাত দিয়ে ওজন তোলা যায় না। ১২. জোড়ার অস্বাভাবিক আকৃতি বা অবস্থান। ১৩. খেলোয়ার কখনও ইনজুরির পর পর মাঠ ত্যাগ করে অর্থাত্ খেলা সম্ভব হয় না। কখনও কখনও অবশ্য খেলা চালিয়ে যাওয়া যায় এবং শেষের দিকে মাঠ ত্যাগ করতে হয়। জরুরী চিকিত্সা বা করণীয় ১. জোড়াকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে ২. বরফের টুকরা টাওয়ালে বা ফ্রিজের ঠান্ডা পানি প্লাস্টিকের ব্যাগে নিয়ে লাগালে ব্যথা ও ফুলা কমে আসবে। প্রতি ঘন্টায় ১০ মিনিট বা দুই ঘন্টা পর পর ২০ মিনিট অনবরত লাগাতে হবে। তবে এটা সহ্যের মধ্যে রাখতে হবে। এই পদ্ধতি আঘাতের ৪৮-৭২ ঘন্টা পর্যন্ত চলবে। ৩. জোড়ায় ইলাসটো কমপ্রেসণ বা স্প্লিন্ট ব্যবহারে ফুলা ও ব্যথা কমে আসে। ৪. জোড়ার নিচে বালিশ দিয়ে উঁচু করে রাখলে ফুলা কম হবে। ৫. কোমরে সাপোর্ট বা কোরসেট ব্যবহর করতে হবে। ৫. এনালজেসিক বা ব্যথানাশক ও দরকার হলে এন্টিবায়োটিক ওষুধ সেবন। ৬. হাড় ভাঙ্গলে বা জোড়া স্থানচ্যুতি হলে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। প্রয়োজনীয় চিকিত্সা প্রাথমিক চিকিত্সায় রোগীর ব্যথা ও ফুলা সেরে উঠার পর, জোড়ার বিভিন্ন শারিরীক পরীক্ষার মাধ্যমে কি কি লিগামেন্ট, পেশী বা মেনিসকাস ইনজুরি হয়েছে এবং এর তীব্রতা নির্ণয় করতে হবে। কখনও কখনও এক্স-রে ও এম.আর.আই. এর সাহায্য নিতে হয়। লিগামেন্ট, মেনিসকাস, জোড়ার আবরণ, পেশী ইনজুরি ও জোড়া বার বারছুটে যায় চিকিত্সা প্রদান করতে সক্ষম এমন আর্থ্রোস্কোপিক চিকিত্সকের কাছে বা সেন্টারে রোগীকে পাঠাতে হবে। প্রাথমিক বা শল্য চিকিত্সার পর নিয়মিত ও উপযুক্ত পরিচর্যা করে জোড়ার স্বাভাবিক অবস্থা দ্রুত ফিরিয়ে আনা সম্ভব।