ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রি :জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০১৩, ২২:২৬
ওষুধের দোকানগুলোতে চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অবাধে ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। ওষুধ দোকানিদের কাছ থেকে ক্রেতারা সর্দি, জ্বর, ব্যথা ইত্যাদি নানা রোগের কথা বলে ওষুধ কিনছে। ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই কেনা যায় ঘুমের ও নেশাজাতীয় ওষুধ। উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ কিনতেও বেগ পেতে হয় না। চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রি সেবনকারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন বাড়াচ্ছে তেমন হত্যা, আত্মহত্যা, অপহরণ ও মাদক গ্রহণের মতো ঘটনাও নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদ পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী দেশের ফার্মেসিগুলোতে ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই বিক্রি হয় প্রায় ৮৭ ভাগ ওষুধ। চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ফার্মেসিগুলো তা মানছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। অ্যাজমা ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন গুরুতর রোগের রোগীদের ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ফার্মেসি থেকে যক্ষ্মা, ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপের মতো জটিল রোগের ওষুধও কেনা যায় সহজে।
রাজধানীতে এক পুলিশ দম্পতি খুন হয়েছেন তাঁদের একমাত্র মেয়ে ঐশীর হাতে। বাবা-মাকে খুনের আগে সে তাঁদের জন্য কফি বানায় এবং তাতে উচ্চমাত্রার ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয়। এ ঘুমের ওষুধ কেনা হয়েছিল চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়াই। অভিজ্ঞজনদের মতে, ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রির জন্য কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় ঐশীর পক্ষে উচ্চমাত্রার ঘুমের ওষুধ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। সারা দেশে ঘুমের ওষুধ বা চেতনানাশক ওষুধ ব্যবহার করে চুরি, ডাকাতি, অপহরণ এমনকি হত্যার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। আত্মহত্যার ঘটনাও কম নয়। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রির ঘটনা জনস্বাস্থ্যের জন্য যেমন হুমকি সৃষ্টি করছে তেমনি আইনশৃঙ্খলার জন্য ডেকে আনছে বিড়ম্বনা।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবর মারফত জানা গেছে, ওষুধ-নীতি ২০১৩-এর খসড়ায় নতুন বিধান রাখা হয়েছে। নিঃসন্দেহে ইতিবাচক খবর এটি। এখন আইনটির যথাযথ বাস্তবায়ন হওয়া নিয়েই যত শঙ্কা। কারণ দেশে এ পর্যন্ত যে কয়টি ওষুধ-নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে, তার কোনোটিরই যথাযথ বাস্তবায়ন হওয়ার খবর পাওয়া যায় না। কিছু ক্ষেত্রে এখনো চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ বিক্রির রীতি চালু রয়েছে আমাদের দেশে। যদিও চিকিত্সক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মোটেও সঠিক নয়। অন্যান্য দেশ, এমনকি প্রতিবেশী ভারতেও ব্যবস্থাপত্রবিহীন অধিকাংশ ওষুধ বিক্রি নিষিদ্ধ। আমাদের দেশে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, টাকা দিলে সহজেই যে কোনো ওষুধ মেলে ফার্মেসিতে। সন্দেহ নেই, এতে আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ওষুধ বিক্রির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সামাজিক, মানসিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা তো রয়েছেই, পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির শিকার হয় খাতটি। কেউ কেউ আত্মহত্যা করেন ঘুমের ওষুধ সেবন করে। আবার কখনো কখনো ওষুধ বিক্রি হয় মূলত নেশার দ্রব্য হিসেবে। অবৈধ ওষুধ ব্যবসাও ফুলে-ফেঁপে উঠেছে দেশের সর্বত্র। একইসঙ্গে বাড়ছে অপচিকিত্সার হার।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে জরুরি ও অজরুরি সব ওষুধ যদি ব্যবস্থাপত্র দেখিয়ে নিতে হয়, তাহলে কি সমস্যা সৃষ্টি হবে না? খসড়ায় অবশ্য উল্লেখ করা হয়েছে, জরুরি প্রয়োজনে কিছু ওষুধ ব্যবস্থাপত্র ছাড়াও পাওয়া যাবে। তবে তারও একটি তালিকা থাকবে। সেটি ঠিক আছে, কিন্তু তালিকাভুক্ত এ ওষুধগুলো কি সর্বত্রই পাওয়া যাবে? নাকি নির্দিষ্ট কিছু জায়গায়? বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। আবার এ তালিকার আড়ালে অসাধু ব্যবসায়ীরা অন্য ওষুধ বিক্রি করবেন কিনা, সেটাও লক্ষ রাখা চাই। যদিও খসড়ায় বলা হয়েছে, এ ধরনের ওষুধ সহজে শনাক্তকরণের লক্ষ্যে মোড়কে সুনির্দিষ্ট ডিজাইন ও রঙ থাকবে। এর বাইরে অন্য কোনো ওষুধ ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বিক্রি করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে চিকিত্সাসেবা অপ্রতুল ও ব্যয়বহুল হওয়ায় ব্যবস্থাপত্রবিহীন ওষুধ কেনার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। কেবল দরিদ্র জনগোষ্ঠীই নয়, অনেক সময় শিক্ষিত ও সচ্ছল জনগোষ্ঠীর মধ্যেও কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ কেনার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। প্রত্যাশা থাকবে, দ্রুতই যেন নতুন ওষুধ-নীতি বাস্তবায়ন করা হয়। দেশের আর দশটি আইনের মতো এটিও যেন নিষ্প্রভ হয়ে না পড়ে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছা যেমন জরুরি, তেমনি জনসচেতনতা বৃদ্ধিও প্রয়োজন ।
ঢাকা