শাহীন হাফিজ
মধুমাসের পরই বর্ষাকাল। বর্ষা থেকে হেমন্তের শুরু পর্যন্ত বিলঝিল, হাওড়, ডোবা-নালা, পুকুর, জলাশয় ও নিচু ভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয় লাল শাপলা। এই জলজ উদ্ভিদের পাতা ও বোটা লালচে সবুজ। রাতে ফোটে। ফুলগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জলাশয়ে দেখতে পাওয়া যায়। আর এটাই আমাদের জাতীয় ফুল। এছাড়া বাংলাদেশের পয়সা, টাকা, দলিলপত্রে জাতীয় ফুল শাপলার জলছাপ থাকে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের সৌন্দর্যের অপরূপ দর্শনের আরেকটি উপজেলার নাম বরিশালের উজিরপুর। সবুজের বুকে লাল। এ যেন সৃষ্টিকর্তার অপরূপ রূপে সাজানো। বর্ষা মৌসুমে হরহামেশা চোখে পড়ে নয়ন জুড়ানো সৌন্দর্যের প্রতীক লাল শাপলা ফুল। এ উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর মানুষ ছেলেবেলা থেকেই শাপলা ফুলের সাথে বেশ পরিচিত। শৈশব থেকেই নৌকা নিয়ে ভেসে কিংবা সাঁতার কেটে বিল ঝিলে শাপলা তোলার স্মৃতি গ্রামে বেড়ে ওঠা যেন ভুলতেই পারে না। দিগন্ত জোড়া জলাশয়ে বিস্তীর্ণভাবে শাপলা ফুলের সৌন্দর্য বর্ষা ঋতুকে করে তোলে অপূর্ব রূপবতী। কাটা ধানক্ষেতে জমে থাকা অল্প পানিতে এই ফুল ফুটে থাকতে দেখা যায়। শাপলা শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এর কাণ্ড, ডাটা বা পুষ্পদণ্ড সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। পূর্ণ বিকশিত শাপলা ফুলের গর্ভাশয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বীজ থাকে। আঁঠালো এই বীজ বিভিন্ন গ্রামের মানুষদের খেতে দেখা যায়। এই বীজ ভেজে এক ধরনের খাবার খই তৈরি হয়। যার নাম ‘ঢ্যাপের খই’। এ সকল কারণে উপজেলায় ঋতুর রানি বর্ষার প্রধান অলঙ্কার যেন ফুল শাপলা।
তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর ছেলেমেয়েরা ব্যতীত অন্যরা বই-পুস্তকের মাধ্যমে শাপলা ফুলকে চিনলেও বাস্তবে শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ ও বিল ঝিল থেকে নিজহাতে শাপলা তোলার যে আনন্দ তা থেকে পুরোপুরিই বঞ্চিত। বর্তমান সময়ে উপজেলার বিলাঞ্চল পূর্ব সাতলা, হারতা কালবিলা, কুড়লিয়া, জল্লা, কারফা, ওটরাসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে লাল শাপলার অভয়ারণ্য। এ সকল এলাকার হাট-বাজারগুলোতে ছোট ছোট শিশু থেকে বড়দেরও জীবিকানির্বাহের জন্য সকাল হলেই সবজি হিসেবে শাপলাকে বিক্রি করতে দেখা যায়। শুধু শাপলাই নয়, শাপলার মূলের অংশ অর্থাত্ শালুক গ্রামাঞ্চলে সিদ্ধ করে খাওয়া হয়।
উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের উত্তর সাতলা গ্রাম। গ্রামের নামেই বিলের নাম, সাতলা বিল। তবে শাপলার রাজত্বের কারণে সেটি এখন শাপলা বিল নামেই বেশি পরিচিত। এরইমধ্যে বরিশালের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিলের কথা ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য স্থানে। বিশেষ করে শহরে ইট-পাথরে বন্দিজীবন কাটানো মানুষ প্রশান্তির আশায় ছুটে আসে এ বিলে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পর্যটকদের ভিড় থাকে এ শাপলার বিলে। পর্যটকদের প্রশান্তি বিলানো ছাড়াও এই বিল ও তার শাপলা স্থানীয়দের অন্নেরও জোগান দেয়। বিলের ওপরে দখল করে আছে শাপলা আর পানিতে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ। পানি শুকিয়ে এলে সেখানে চলে মাছ ধরা। এখানকার বাসিন্দাদের পেশা কৃষি ও মাছ ধরা।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চযোগে পয়সারহাট বা বৈঠাকাটাগামী যুবরাজ বা তরীকা-২ লঞ্চে হারতা নেমে খুব সহজে সাতলায় যেতে পারেন। এছাড়াও ঢাকা-বরিশাল লঞ্চে বরিশাল শহরে এসে সাতলা যেতে পারেন। নথুল্লাবাদ বাস স্টেশন থেকে ৩০ মিনিট পরপর সরাসরি সাতলার উদ্দেশ্যে বাস ছাড়ে, জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৯০ টাকা।