মিঠাপুকুর ও পীরগঞ্জের নিহত শ্রমিকদের
স্বজনদের ঈদ কেটেছে কেঁদে
মিঠাপুকুর (রংপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৩৯
‘হামার আবার কিসের ঈদ, বাবা? সোনার ছইলট্যাক আনি দ্যান।’ এভাবে কান্নাকাটি করে ঈদের দিন কাটিয়েছেন গাজীপুরের শ্রীপুরে পলমল গ্রুপের আসওয়াদ গার্মেন্টস-এ নিহত শ্রমিক মিঠাপুকুর উপজেলার রুবেল মিয়ার বাবা-মা। শুধু রুবেল মিয়া নয়- মিঠাপুকুর ও পীরগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী দুই গ্রাম ধলারপাড়া এবং বেলবাড়ি গ্রামের ৪ পরিবার এভাবে ঈদের দিন কাটিয়েছেন। গার্মেন্টস ও সরকারিভাবে নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেক পরিবারের মাঝে ৭৫ হাজার করে টাকা প্রদান করা হয়েছে। স্বজন হারানো শোকে ঈদের কেনাকাটা করতে পারেনি নিহতদের পরিবার।
ধলারপাড়া ও বেলবাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক হূদয় বিদারক দৃশ্য। আসওয়াদ গার্মেন্টসে ফিডারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন মিঠাপুকুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ধলারপাড়া গ্রামের নাইমুর রহমান নাইম (২৪)। ২০০৮ সালে পলমলের আসওয়াদ গার্মেন্টসে চাকরি পান তিনি। অগ্নিকাণ্ডের আগের দিন তিনি মোবাইলে তার স্ত্রী শাপলা বেগমকে ঈদের জন্য কেনাকাটার কথা বলেছিলেন। কিন্তু লাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে। এবারের ঈদে কোন কেনাকাটা করা হয়নি। শুধু কান্নাকাটি করেই ঈদের দিন কেটেছে তার পরিবারের। নাইমের মা শেফালী বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মোর বাবাক আনি দ্যান। বাবা আ. মতিন মিয়া ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখছেন। ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী শাপলা বেগম বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। কথা বলছেন না। এ বছরের জানুয়ারী মাসে শাপলাকে বিয়ে করেন নাইম। তিনি জানান, নাইম ঈদে বাড়ি এসে আমার জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই আশা পূরণ হল না।’
গাজীপুর জেলা প্রশাসক ২০ হাজার, রংপুর জেলা প্রশাসক ৫ হাজার এবং আসওয়াদ গার্মেন্টস মালিকপক্ষ ৫০ হাজারসহ মোট ৭৫ হাজার টাকা করে প্রত্যেক নিহতের স্বজনদের দেয়া হয়েছে। ধলারপাড়া গ্রামের পোশাক শ্রমিক রুবেল (২৫) ৭/৮ বছর ধরে ঐ গার্মেন্টসে কাজ করতেন। তিনিও আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। তার স্ত্রী আফরোজা, বাবা দিনমজুর ছালেক মিয়া, মা রেবা বেগম ঈদের দিন শুধু বিলাপ করেছেন। তার মা জানান, দাফন-কাফন ও দেনা পরিশোধ করতে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তার কাছে এখন ১৫ হাজার টাকা রয়েছে। বাবা সালেক মিয়া বলেন, ‘সউগ ঈদোত আসি হামার ছইল সবার জন্যে কাপড় কেনে। এবার মোর সোনা নাই।’
পীরগঞ্জ উপজেলার বড় দরগাহ্ ইউনিয়নের বেলবাড়ির আলহাজ্ব নজরুল ইসলামের ছেলে রাশেদুজ্জামান মণ্ডল (৪০) গার্মেন্টসের এজিএম ছিলেন। তিনিও আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। ২ মেয়ে রয়েছে তার। বড় মেয়ে রিফা তাসফিয়ার বয়স আড়াই বছর। ছোট মেয়ে রাফা তাসমিনের বয়স ১ বছর। এবারের ঈদে কোরবানি করা হয়েছে বটে কিন্তু কোন আনন্দ হয়নি পরিবারটিতে। সারাদিন শুধু কেঁদেকেটে সময় পার হয়েছে। তার স্ত্রী তাসমিয়া জান্নাত বলেন, প্রত্যেক ঈদে রাশেদ বাড়ি এসে সবার জন্য কেনাকাটা করতো। তার শূন্যতায় এবার ঈদটাই মাটি হয়ে গেছে। গার্মেন্টস্ ও সরকারি সহায়তার টাকা খরচ হয়নি বলে জানান তিনি।
একই গ্রামের শফিয়ার রহমানের ছেলে খলিলুর রহমান (২৪) ঐ গার্মেন্টসের সহকারী ফিডারম্যান। ৭ বছর আগে এখানে চাকরি পান। তিনিও মারা গেছেন। তার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল বাবা শফিয়ার রহমান ও মা খোদেজা বেগম কাঁদতে পারছেন না। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে।