‘চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি’
সোহেল হাবিব, কুমারখালী সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০১৩, ২৩:০০
বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের গানে মুখরিত হয়ে উঠেছে ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়ি। সাধুসঙ্গে মেতে উঠেছেন শিষ্য ও নতুন খেলাফত প্রাপ্ত সাধুরা। সাঁইজির ভক্ত ফকির-সাধুদের সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সাধুসঙ্গ। সাধুগুরুরা একত্রিত হয়ে সাঁইজির নির্দেশনাগুলো পালন করেন অত্যন্ত ভক্তির সঙ্গে। সাধুসঙ্গে হয় সাঁইজির রেখে যাওয়া দেহতত্ত্ব ও সাধুসঙ্গ সংশ্লিষ্ট গান। একই সঙ্গে চলে গুরু-শিষ্যের মধ্যে সেবা গ্রহণ-প্রদান, গুরুকর্মসহ অন্যান্য বিষয়াদি।
সাধুসঙ্গ সম্পর্কে লালন গবেষক লালিম হক বলেন, বাউল সাধু সমপ্রদায় মূলত পাঁচ ঘরানায় বিভক্ত। লালন সাঁই প্রথম, দ্বিতীয় পাঞ্জু শাহ, তৃতীয় সতী মা, চতুর্থ দিলবার শাহ ও পঞ্চম চৌধুরী ঘরানা। প্রত্যেকটি ঘরানার কিছু সংখ্যক ভক্ত এবং দীক্ষাপ্রাপ্ত সাধুদের নিয়ে মহা উত্সব বা সাধুসঙ্গ হয়ে থাকে। লালন সাঁই ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়িতে সাধুসঙ্গ করতেন। তিনি বলেন, শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে রাধিকার সঙ্গে আনন্দ উত্সবে মেতে উঠতেন। সেই ধারাবাহিকতায় নিমাই সন্যাসী হলি উত্সব করতেন। নিমাইয়ের পথ ধরে লালন সাধুসঙ্গ করতেন।
ফকির লালন সাঁইয়ের ১২৩ তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে স্মরণোত্সবের চতুর্থ দিনে গতকাল শনিবার সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় । আগত সাধুগুরু-ভক্ত ও শিষ্যরা খন্ড খন্ডভাবে হাতে একতারা, দোতরা, খঞ্জনি, তবলা আর হারমোনিয়াম নিয়ে গলা ছেড়ে গাইছেন- চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি, ভেদ পরিচয় দেয় না আমায়/ সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/, জাত গেল জাত গেল বলে, একি আজব কারখানা/, দিন দুনিয়ার অচিন মানুষ আছে একজনা/, তিন পাগলের হলো মেলা নদেয় এসে, তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের দেশে/, অনায়াসে দেখতে পাবি কোন ঘরে সাঁইর বালাম খানা/ “মায়েরে ভজিলে হয় তার বাপের ঠিকানা/, এই মানুষে সেই মানুষ আছে/, আছে যার মনের মানুষ মনে তোলা/, সেই কালা চাঁদ নদে এসে/, আমার ঘরের চাবি পরের হাতে/ ইত্যাদি মরমী গান। আখড়াবাড়িতে লালন একাডেমির আয়োজনে স্মরণোত্সবের ৩য় দিন শুক্রবার রাতে মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য বেগম সুলতানা তরুণ।
উল্লেখ্য, লালন সাঁইয়ের পালক পিতা মওলানা মলম শাহ আখড়া তৈরির জন্য ষোল বিঘা জমি দান করেন। দানকৃত ঐ জমিতে ১৮২৩ সালে লালন আখড়া গড়ে ওঠে। প্রথমে সেখানে লালন সাঁইয়ের বসবাস ও সাধনার জন্য বড় খড়ের ঘর তৈরি করা হয়। সেই ঘরেই তাঁর সাধন-ভজন বসতো। তিরোধানের পর সাঁইজির সমাধি হয় তাঁর বসত ঘরের মাঝখানে।
১৯৬২ সালে কুষ্টিয়ার তত্কালীন জেলা প্রশাসক কিউ,জি, আহাদ, দেবী প্রসাদ চক্রবর্তী (কানু বাবু) ও মোজাম্মেল হক (কেরু মিয়া)’র উদ্যোগে লালনের মাজার উন্নয়ন কাজ শুরু ও মূল গেট নির্মাণ হয়।
প্রথমে লালন আখড়াবাড়ি, ১৯৬২ সালে “লালন লোক সাহিত্য কেন্দ্র”, ১৯৭৬ সাল থেকে “লালন একাডেমি” নামকরণের মধ্যদিয়ে এখানে প্রশাসনিক কাজ কর্ম পরিচালিত হয়।
লালন একাডেমিক ভবনের নিচ তলায় রয়েছে লালন মিউজিয়াম, দ্বিতীয় তলায় লাইব্রেরী, তৃতীয় তলায় অফিস এবং চতুর্থ তলায় লালন সঙ্গীত একাডেমি। মিউজিয়ামে রয়েছে লালন সাঁইয়ের শিষ্যবৃন্দের ব্যবহূত তামার বিশাল ডেগচি, পিতলের তৈরি হুক্কা, পিতলের করঙ্গ, হীরু শাহের একতারা, লালন সাঁইয়ের ঘরের দরজা। মাজারে মোট ৩২টি সমাধি আছে। এর মধ্যে ১৪ জন সরাসরি সাঁইজির মুরিদ, ১ জন প্রশিষ্য আর বাকি সব অনুসারী। আজ রবিবার পাঁচদিনব্যাপী এই লালন স্মরণোত্সবের সমাপ্তি হবে।
ফকির হাসেম সাঁই বলেন, এবার একুশ জন শিষ্যসহ সাঁইজির ধামে এসেছি। কেনো আসেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মক্কায় মানুষ যেমন হজ্ব করতে যায়, আমরাও সাঁইজির ধামে প্রতিবছর তেমনটিই সাধুসঙ্গ করতে আসি। আখড়াবাড়িতে তার শিষ্যদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় সাধুসঙ্গ। সাধুসঙ্গ সম্পর্কে ফকির হাসেম সাঁই বলেন, এটা এক ধরনের সাধু সমাবেশ বা সাধুদের মিলনক্ষেত্র। এতে সাধারণত সাধুগুরুদের লেখা গানের চর্চা ও দৈনন্দিন জীবনাচার তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, সাধুসঙ্গে শিষ্যভক্তদের মধ্যে প্রেম ও ভক্তি ভাব আদান প্রদান হয়। শিষ্যদের পাশাপাশি গুরুরাও বিভিন্ন পর্বের গান পরিবেশন করেন। একই সাথে আধ্যাত্মিক গানের অন্তর্নিহিত অর্থের ব্যাখ্যা প্রদান করেন গুরুসাধুরা।
ফকির হাসেম সাঁইয়ের শিষ্য রশিদ বাউল বলেন, লালন সাঁইজির দেখানো পথে যখনকার গান ঠিক তখনই গাইতে হবে। তিনি বলেন, সাধুসঙ্গের নিয়মানুযায়ী গোষ্ঠলীলার গান সকালে আর রাসলীলার গান রাতে গাইতে হয়। প্রবাদ আছে ‘রাতে গোষ্ঠ দিনে রাস যে গাই তার সর্বনাশ।’
ফকির আবদুর রশিদ বাউল বলেন, সাধুসঙ্গে তিনটি পর্ব সম্পন্ন হয়। রাতে হয় ‘অধিবাস’। এই পর্বে সাধুসঙ্গের পর খিচুড়ি খেতে দেয়া হয়। পরদিন সকালে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাল্যসেবা’। এই পর্বে পায়েস-মুড়ি খেতে দেয়া হয়। দুপুরে হয় ‘পূর্ণসেবা’। এতে সাদা ভাত, ইলিশ মাছ, ডাল, দই, সবজি খেতে দেয়া হয়। তিনি বলেন, সাধুসঙ্গে পরিবেশিত হয় ‘সাঁইজির কালাম’ অর্থাত্ সাঁইজির দিকনির্দেশনা পথ। সে পথেই আমরা চলি।
ফরিদপুর থেকে আসা সাধুগুরু ফকির নিজাম শাহ বলেন, সাঁইজির দয়ায় এবার পঁচিশজন শিষ্যসহ এসেছি। শিষ্যত্ববরণ সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রথম ধাপে শিষ্যদের চাল পানি দেয়া হয়। শিষ্যরা প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ৫টি চাল আর আড়াই ঢোক জল গুরুর নামে পান করে। দ্বিতীয় ধাপে হাওয়ার সাধনা। এভাবে ধ্যানের একযুগ অতিবাহিত হলে শিষ্যদের পরীক্ষা নেয়া হয়। পাস করলে খেলাফত দেয়া হয়। খেলাফত ছাড়া পূর্ণতা আসবে না।