স্মরণীয় যাঁরা বরণীয় যাঁরা

মোতাহের হোসেন চৌধুরী সাহিত্যকর্ম ও সংস্কৃতি চেতনা

১৯০৩ সালে জন্ম। নোয়াখালির কাঞ্চনপুর গ্রাম। বড় পীর হযরত আবদুল কাদির জিলানীর পৌত্র মোতাহার হোসেন চৌধুরীর পিতা সৈয়দ আবদুল মজিদ। মাতা ফতেমা খাতুন। মাতামহ ছিলেন কুমিল্লার বিখ্যাত দারোগা বাড়ির মৌলভী আশরাফ উদ্দীন। পিতা ছিলেন সাব-রেজিস্ট্রার। কর্মসূত্রে তিনি বাইরে থাকতেন। স্ত্রী ফতেমা খাতুন সন্তানসহ থাকতেন পিতার কাছে। অল্পবয়সে মোতাহের হোসেন চৌধুরী পিতৃহারা হন। তাই নানার বাড়িতেই বেড়ে ওঠেন। কুমিল্লা ইউসুফ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আই.এ ও বি.এ পাশ করেন। ১৯৪২ -এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ পাশ করেন। তাঁর সহপাঠী ছিলেন মুহম্মদ আবদুল হাই ও আহমদ হোসেন। শিক্ষক ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মোহিতলাল মজুমদার, আশুতোষ ভট্টাচার্য, জসীমউদ্দীন প্রমুখ যশস্বী পণ্ডিতবর্গ। ইউসুফ হাইস্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। আমৃত্যু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। কিশোর বয়সেই সাহিত্যসৃষ্টিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কখনও ছদ্মনামে, কখনও স্বনামে লিখতে শুরু করেন। ‘কবিতা‘ দিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে চলা শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে গদ্য লেখায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন । ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’- এর সাথে ছিল তাঁর আত্মিক সংযোগ। কেবল সংযোগ নয় , এর সাথে সংশ্লিষ্ট মনীষীবর্গের আদর্শের সাথে তাঁর আদর্শগত সমতাই তাঁকে এই সংগঠনের সাথে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করে। ‘আমাদের দৈন্য‘,‘আদেশপন্থী ও অনুপ্রেরণাপন্থী’,‘ মুসলমান সাহিত্যিকদের চিন্তাধারা’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও বৈরাগ্যবিলাস’ প্রভৃতি লিখে সাহিত্যমহলের দৃষ্টি আকর্ষন করেন । বিচিত্রা, মোহাম্মাদী, সওগাত, ছায়াবীথি, বুলবুল প্রভৃতি সাহিত্য পত্রিকাতেও তিনি লিখতে থাকেন।অসাধারণ জীবনবোধ ও মার্জিত রুচি তাঁর প্রত্যেকটি রচনায় সহজেই লক্ষ্যগোচর।” অজিত কুমার গুহ বলেছেন “সংস্কৃতিবান লোক ... আপন ধ্যান-কল্পনায় যে সৌন্দর্যলোক, যে রূপজগত সৃষ্টি করেন - তিনি সেই জগতেরই অধিবাসী।” এই জন্যে মোতাহের হোসেন বলতেন — “রুচিবান লোক দশের একজন নয়, দশ পেরিয়ে একাদশ।” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন এমনকি তিরিশের কবিদের কারো কারো ভাব ও শৈলি খুঁজে পাওয়া যাবে তাঁর রচনায়। কলেজে সে দিন সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠান শেষে বেশ রাত করে বাড়ি ফিরে আসেন। রাতে বসলো গানের আসর। নিজে অসুস্থ বোধ করায় শ্যালিকা জাহানারা-কে ( রবীন্দ্র-সঙ্গীত শিল্পী জাহানারা ইসলাম ) অনুরোধ করলেন তাঁর প্রিয় কয়েকটি রবীন্দ্র-সঙ্গীত গাইতে। আসরের শেষ গানটি ছিল “তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যতদূরে’’ আমি ধাই” সত্যিই সীমার প্রাঙ্গন ছেড়ে অসীমের অঙ্গনে তিনি চলে গেলেন সে রাতেই। সে দিনটি ছিল ১৯৫৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর।