সিরিয়া সংকট

প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর আরব বিশ্বের বহু দেশ থেকেই চরমপন্থী তরুণরা সিরিয়ায় ছুটে আসছে। তাদের কাছে এটা জিহাদ বা পবিত্র যুদ্ধ। এই সব তরণ বেশিরভাগই জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়েদার দলে যোগ দিয়েছে। আল-কায়েদাকে প্রথমদিকে বিদ্রোহীরা স্বাগত জানিয়েছিল। আর আল-কায়েদাও প্রথমদিকে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিলেও এখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে তাদেরই প্রাধান্য। বিদ্রোহীরাই ধীরে ধীরে কোণঠাঁসা হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সিরিয়ায় বর্তমানে বিদ্রোহীদের অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে আল-কায়েদা এখন বিদ্রোহীদের জন্য গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে উঠছে। সিরিয়ায় ক্রমেই আল-কায়েদা শক্তিশালী হচ্ছে। দেশটির বিরোধীদের মধ্যে বিরোধ এবং সংঘাত বাড়ছে। এর ফলে আসাদ সরকার শক্তিশালী হচ্ছে। আল-কায়েদা দেশটিতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করছে। শিশুদের জিহাদের প্রতি আকৃষ্ট করছে। তাদের যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। সিরিয়াকে তার জিহাদি রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাইছে। সম্ভব হলে আরো বেশি কিছু। আর এজন্য উদারপন্থী আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরানোই তাদের মূল উদ্দেশ্য। বলছিলেন, জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের পরিচালক ব্রুস হফম্যান। তবে এটা ঠিক, তারা হয়তো সম্পূর্ণ দেশটির ক্ষমতা করায়ত্ত করবে না। আর যদি সেটা করতে পারে তাহলে তারা খুশি হবে বৈকি! বলেন হফম্যান। আসাদবিরোধী লড়াইয়ে প্রথমদিকে বিরোধী দল আল-কায়েদাকে সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে আল-কায়েদার আন্তর্জাতিক এজেন্ডার বিষয়টি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা বিরোধীদের সহায়তা করার পরিবর্তে নিজেরাই দেশটির অংশীদার হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। সরকারবিরোধীরা বলছেন, তারা আল-কায়েদা কর্তৃক প্রচারিত সমাজের বিভিন্ন নিয়ম-কানুনকে ঘৃণা করেন। বিরোধীদের একটি অংশ বলছে, আমাদের উদ্দেশ্য আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরানো, এর বেশি কিছু নয়। সমাজের আইন-কানুন নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা নেই। আল-কায়েদা এখন সিরিয়ার অস্থিতিশীলতাকে বৃদ্ধি করছে। তারা এখন বিরোধীদের ঘাঁটিতে হামলা করছে। গত মাসে আল-আজাজ শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য বিদ্রোহীদের ওপর হামলা চালায় আল-কায়েদা। তুরস্ক সীমান্তে অবস্থিত এই শহরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশ থেকে পণ্য বা রসদ আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে শহরটি গুরুত্বপূর্ণ। গত সপ্তাহে এই জঙ্গি গোষ্ঠীটি ইদলিব প্রদেশের একটি গ্রামে আক্রমণ করে এবং কয়েকজন বিদ্রোহীকে অপহরণের চেষ্টা চালায়। এতে উভয়পক্ষের ২০ জনের মতো সদস্য নিহত হয়। স্যুকোর আল-শাম নামের একটি ইসলামপন্থী দলের নেতা জানান, আমরা সিরিয়াকে সাম্য ও স্বাধীনতার দেশ হিসাবে গড়ে তুলতে চাই। এই নেতা তার নাম আবু বাশির বলে জানান। কিন্তু আল-কায়েদা দেশটিকে কেবল একটি ইসলামী ও জিহাদি রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলতে চায় এবং ইরাকের সঙ্গে একত্র করতে চায়। তবে আল-কায়েদার এক মুখপাত্র ওই নেতার বক্তব্যকে অস্বীকার করে জানান, আসাদবিরোধী লড়াইয়ে তাদের চেষ্টাকে অসম্মান করা হচ্ছে। তিনি বিরোধীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বরং বিরোধীদের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, আমরা ক্ষমতার ভাগিদার হওয়ার চেষ্টা করছি এমন কথা যারা বিশ্বাস করেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। আবু মোহাম্মদ আল আদানি আল-শামি নামের এই মুখপাত্র বলেন, বিরোধীরা দেশটির ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টায় মত্ত। তারা পার্থিব ক্ষমতা চায় যা আমাদের কাছে মূল্যহীন! বিশ্লেষকরা বলছেন, জঙ্গি গোষ্ঠীটি ইরাকে তাদের বিস্তার ঘটিয়েছে। দেশটিতে ২০০৬ এবং ২০০৭ সালে সামপ্রদায়িক সংঘাতের জন্য এই গোষ্ঠীটি দায়ী। তবে তারা উপজাতি যোদ্ধা এবং আমেরিকান সৈন্যদের কাছে অনেকবার পরাজিত হয়েছে। সিরিয়ায় উত্তর এবং পূর্ব সীমান্তের বিশাল একটা অঞ্চল বিদ্রোহীদের দখলে এবং সেখানে কার্যত সরকারি প্রশাসনের কোনো প্রভাব নেই। আর এই সুযোগে সেখানে আল-কায়েদা প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। বিদ্রোহীরা অধিকৃত এলাকায় নতুন করে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করলেও সেখানকার সম্পত্তির দখল নিয়ে বিদ্রোহীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে তাত্ক্ষণিকভাবে শত্রুহীন এক জগতে নিজেদের জানান দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে আল-কায়েদা। তারা স্বাধীনভাবে সীমান্ত দিয়ে সৈন্য এবং রসদ আনতে পারছে। গবেষণা সেন্টার কমব্যাটিং টেরোরিজমের সাবেক পরিচালক এবং বর্তমানে নিউ আমেরিকা ফাউন্ডেশনের ফেলো ব্রায়ান ফিসম্যান বলেন, এই সব কারণে আল-কায়েদা অনেকটা বাধাহীনভাবে সিরিয়ায় প্রভাব বিস্তার করছে। এর কারণ জঙ্গি গোষ্ঠীটি ইরাকে যে সুবিধাগুলো পায়নি সেই সুবিধাগুলো বরং সিরিয়ায় পাচ্ছে। তিনি বলেন, কিছু সময় সিরিয়া অনেক জায়গার চেয়ে আল-কায়েদার জন্য সুবিধাজনকই হবে। ইদলিব প্রদেশের থাহের সায়েব নামের এক বিদ্রোহী বলেন, আল-কায়েদা হয়তো আসাদ সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছে। আল-কায়েদার যোদ্ধারা আমাদের সঙ্গে দাঁড়ায়। আমরা লড়াইয়ের জন্য সামনে যাই। তাদের কয়েকজন পেছনে থেকে যায়। কিছুক্ষণ পর তারা আমাদের ওপরই হামলা করে। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে বিদেশি জিহাদিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তারা এই এলাকায় ধূমপান নিষিদ্ধ করেছে। তারা কুর্দি অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে আক্রমণ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিদ্রোহী বলেন, রাক্কা নামের প্রাদেশিক রাজধানী যেটিই একমাত্র শহর যার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহীদের হাতে। এই সুযোগে আল-কায়েদা সরকারি ভবনে ঘাঁটি গাড়ছে। আসাদের বংশ আলওয়াতি এবং তাদের বিরোধিতা করে এমন অনেককে এই ভবনে এনে ফাঁসি দিচ্ছে। তারা অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখায় এবং অনেককে অপহরণ করে। মুখোশ পরে ঘোরাফেরা করে। তবে তারা অনেক সময় লড়াইয়ে সহযোগিতাও করে বলে তিনি জানান। তবে আসাদবিরোধী প্রথম জঙ্গি গোষ্ঠী নুসরা ফ্রন্ট আল-কায়েদা থেকে পৃথক। চলতি বছরে একীভূত হওয়ার প্রস্তাব দিলেও তারা প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে বিদেশি সৈন্যরা আল-কায়েদার দলে ভিড়ছে। আসাদবিরোধী আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে নুসরা ফ্রন্ট। সিরিয়ায় আমেরিকান কর্মকর্তারা বলছেন, শুরুতে আল-কায়েদার সদস্য সংখ্যা নুসরা ফ্রন্টের চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু এখন উল্টো দিকেই যাচ্ছে্। আল-কায়েদার সদস্য সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে বিদ্রোহীদের একাংশের সঙ্গে তাদের বিরোধ ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কারণ এর ফলে তাদের বিরুদ্ধে জনগণও ক্ষেপে যেতে পারে। সমপ্রতি নুসরা ফ্রন্টের সঙ্গে ইসলামপন্থী দশটি ব্রিগেড এক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। তারা সিরিয়াকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় এবং প্রবাসী বিরোধী দ্য সিরিয়ান ন্যাশনাল কোয়ালিশনকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমনকি ওই সমঝোতা স্মারকে এটাও উল্লেখ করা হয়, তারা আল-কায়েদার নীতির সঙ্গে একমত পোষণ করে না। তবে আল-কায়েদা সমপ্রতি প্রকাশিত তাদের ভিডিওতে দাবি করেছেন, আমরা গরীবদের সাহায্য করছি। আমরা বিদ্রোহীদের লড়াইয়ের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। জাতিসংঘের হিসাবমতে, ২০১১ সালের মার্চ থেকে আসাদবিরোধী আন্দোলনের পর থেকে এ পর্যন্ত ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ১৫ লাখ লোক সিরিয়া থেকে পালিয়েছে। চল্লিশ লাখের বেশি লোক অভ্যন্তরীণভাবে স্থানান্তরিত হয়েছে।