পাপড় বেচে হাজার কোটি রুপি আয়!

ভারতকে আজ বিশ্বের অন্যতম সুপার পাওয়ারের মর্যাদা দেয়া হচ্ছে। এর প্রধান কারণ দেশটির বর্তমান সমৃদ্ধ অর্থনীতি। আর ভারতের বড় বড় শিল্পপতি বা ধনকুবেরদের প্রসঙ্গ আসতেই আমাদের মানসপটে তাত্ক্ষণিকভাবে ভেসে ওঠে হাতেগোনা কয়েকটি নাম-টাটা, বিড়লা, মিত্তাল, গোদরেজ...। কিছুক্ষণ মাথা চুলকালে বা ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করলে হয়তো আরো কয়েক ডজন ধনকুবেরের নাম বেরিয়ে আসবে। কিন্তু এত বড় বড় নামের আড়ালে ভারতে আরো যে কত শত সফল মানুষের নাম লুকিয়ে রয়েছে তার খোঁজ আমরা কতটুকু রাখি। যাদের মেধা, প্রজ্ঞা, পরিশ্রম ও দূরদৃষ্টির কারণে আজ ভারতের অর্থনীতি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেসব মহান উদ্যোক্তাদের অধিকাংশই কিন্তু এসেছেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মধ্য থেকে। আমাদের আজকের লেখায় এমনই কয়েকজন সফল নারী উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠিত সমিতির কথা তুলে ধরবো; যেটি মাত্র ১০০ রুপির একটি ব্যবসাকে প্রায় হাজার কোটি রুপির ব্যবসায় পরিণত করেছে। ব্যবসাটা কি শুনবেন? আর কিছু নয়, পাপড় ভাজা! সাত বান্ধবীর সমিতি: ১৯৫৮ সাল। ভারতের মুম্বাইয়ের গিরগাঁও এলাকায় একটি পুরনো আবাসিক ভবনের খুপড়ি ঘরগুলোতে গাদাগাদি করে থাকতো বেশ কিছু পরিবার। নূন আনতে পান্তা ফুরায়— এমনই হতদরিদ্র অবস্থা তাদের। সংসারের টানাপোড়েনে হিমসিম খেতে খেতে প্রতিবেশী সাত গৃহবধূ সিদ্ধান্ত নিলেন কিছু একটা করার। একজন বললেন, একটা ব্যবসা শুরু করলে কেমন হয়? কিন্তু ব্যবসা করবে, পুঁজি কোথায়? সামান্য লেখাপড়াই তো কেবল সম্বল। তখন ধার-কর্জ করে যে যা পারলেন তাই এনে জমা করলেন, সর্বসাকুল্যে পুঁজি দাঁড়ালো ৮০ রুপি। এ সামান্য অর্থে কী ব্যবসা করা যায়। একজন ভাল পাপড় বানাতে পারতেন, যা খেয়ে সকলেই প্রশংসা করতো। সাত বান্ধবী সিদ্ধান্ত নিলেন পাপড়ের ব্যবসা করার। শুরু হলো পাপড় ভাজা। ময়দা, ডাল ও নানা মশলা দিয়ে তৈরি সুস্বাদু মচমচে এই পাপড়ের খ্যাতি অল্পদিনেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। এলাকার লোকজন তো বটেই, দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসতে শুরু করলো তাদের তৈরি পাপড় কিনতে। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য সাত বান্ধবী এক পর্যায়ে একটা সমিতি গড়ে তুললেন। নাম দিলেন ‘শ্রী মহিলা গৃহ উদ্যোগ লিজ্জাত পাপড়’। মহাত্মা গান্ধীর ‘সর্বোদয়’ বা ‘সকলের জন্য উন্নয়ন’ নীতির ভিত্তিতেই সমিতির কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে। দিন দিন বাড়তে থাকে এর পরিধি। এক পর্যায়ে ভারতের পাপড়ের বাজারের সিংহভাগই দখল করে নেয় লিজ্জাত ব্র্যান্ডের পাপড়। আজ অর্ধ শতাব্দী পরও সেই শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে লিজ্জাত। বছরে দেশেই তাদের বিক্রি হয় ১০ কোটি ডলার বা সাড়ে ৬শ কোটি রুপির পাপড়। রফতানি হয় আরো প্রায় ৩০০ কোটি রুপির পণ্য। সারা ভারতে সমিতির ৮১টি শাখা রয়েছে। স্বপ্ন হলো সত্যি: সমিতির শুরুটা যাদের হাত দিয়ে হয়েছিল, সেই সাত বান্ধবীর কেউই আজ বেঁচে নেই। কিন্তু তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। দরিদ্র নারীদের স্বাবলম্বী করার যে মহতী উদ্যোগ তারা নিয়েছিলেন, তা আজ সফল হয়েছে। সাত সদস্যের জায়গায় এখন সদস্য সংখ্যা ৪৩ হাজার পেরিয়ে গেছে। সমিতির সদস্য হওয়াও খুব সহজ। পাপড় বানাতে ইচ্ছুক যে কোন নারী সমিতির কোন একটি শাখায় গিয়ে সদস্যপদে নাম লেখাতে পারে-জানালেন সমিতির বর্তমান প্রেসিডেন্ট স্বাতী পরধকর। তিনি জানান, কোন নারী সমিতির সদস্য হওয়ার পর তাকে এক কেজি ময়দা, ডাল ও মশলা দিয়ে পাপড় বানানোর কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়। প্রতিকেজি ময়দার পাপড় বানানোর পারিশ্রমিক হিসেবে তাকে দেয়া হয় ৩০ রুপি। স্বাতী জানান, কোন সদস্যের জন্য পাপড় বানানোর কোন সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত নেই, যে যত খুশি পাপড় বানাতে পারবে, সেই অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাবে। ভাল উপার্জন হয় বলে অনেক সময় সমিতির সদস্যের পরিবারের অন্যরাও পাপড় বানানোর কাজে হাত লাগায়। শপথনামায় স্বাক্ষর: সমিতিতে যোগদানকারী প্রত্যেক সদস্যকে একটি শপথনামায় স্বাক্ষর করতে হয়। এরপরই সে সমিতির একজন ‘ভগিনি-সদস্য’ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। যে কিনা সপ্তাহে ছয়দিনই সেখানে পাপড় বানাতে পারবে এবং প্রতিদিন হিসেব অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাবে। সমিতির নতুন সদস্য নেয়ার ক্ষেত্রে ‘কাউকে না নয়’—এমন নীতি চিরাচরিত ব্যবসায়িক ধ্যান-ধারণার বিপরীত বলে মনে হতে পারে অনেকের কাছে, কিন্তু মজার ব্যাপার হলো নতুন সদস্য গ্রহণ এবং তাকে কাজ দেয়ার ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত কোন ঝামেলায় পড়তে হয়নি লিজ্জাতকে। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি: লিজ্জাত পাপড় সমিতির প্রতিটি ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে চলা হয়। প্রতিটি শাখা সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীকরণ নীতির ভিত্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে পরিচালিত হয়। শাখা পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন একজন সঞ্চালিকা বা শাখা প্রধান, যাকে সকলের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়। পাপড় উত্পাদনের সাথে সাথে তা নির্দিষ্ট এলাকায় বাজারজাতকরণের দায়িত্বও সমিতির ঐ শাখার উপরই বর্তায়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাপড়ের গুণগতমানের ব্যাপারে কোন আপস করেনি লিজ্জাত। কেন্দ্রীয় অফিস থেকে শাখাগুলোতে সরবরাহ করা হয় উন্নতমানের মুগ ডাল, ময়দা এবং মশলা। আর অবিক্রীত উদ্বৃত্ত পাপড় কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে তা বাজারজাতের উদ্যোগ নেয়া হয়। শাখার সঙ্গে কেন্দ্রের সম্পর্ক বলতে গেলে ওইটুকুই। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড: লিজ্জাতের সাফল্যের অন্যতম কারণ সদস্যদের প্রতি এর পক্ষপাতমুক্ত আচরণ। শুরু থেকেই সমিতির সর্বোচ্চ পদগুলোর জন্য লোক নির্বাচন করা হচ্ছে সর্বনিম্ন স্তর থেকে। এ প্রসঙ্গে বছর বিশেক আগে সমিতিতে একজন পাপড় তৈরির কারিগর হিসেবে যোগদানকারী সারদা ডি কুবাল বলেন, লিজ্জাতের সকল সদস্য সম-মর্যাদার অধিকারী। এখানে কেউ ছোট-বড় নয়, ধনী-গরীব বলে কারো মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। উল্লেখ্য, সারদা বর্তমানে লিজ্জাত পাপড় সমিতির ম্যানেজিং কমিটির সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করছেন। ১০ বছর বয়স থেকে তিনি সেখানে পাপড় তৈরি করে আসছেন। আজ তার বয়স ৫০-এর কাছাকাছি। তিনি বললেন, “আমি এসেছিলাম খুবই গরীব এক পরিবার থেকে। এই সমিতির কারণেই আমি আমার দুই ছেলেকে লেখাপড়া করাতে পেরেছি। ওরা দুজনই এখন যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি করছে।” পাপড় বিক্রি করে লিজ্জাতের সারা বছরে যা লাভ হয়, তার দুই শতাংশ রাখা হয় সমিতির খরচাপাতি মেটানোর জন্য। বাদবাকি লাভ সদস্যদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া হয়। লিজ্জাত কোন অনুদান গ্রহণ করে না। স্বাতী এ প্রসঙ্গে বলেন, একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা সংগঠন আমাদের, অনুদান কেন নেব? সাফল্যের রহস্য: তবে দেশীয় ও বহুজাতিক বড় বড় সব কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এতো বছরেও লিজ্জাত কী করে তার এই লাভজনক অবস্থান ধরে রেখেছে সেটি এক বড় প্রশ্ন। এ সম্পর্কে লিজ্জাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট সত্তুরোর্ধ প্রতিভা সায়ন্ত বলেন, “লোকজন প্রায়ই জিজ্ঞাসা করে যে, পেশাদার ম্যানেজার ছাড়া আমরা কী করে এই বিশাল ব্যবসা এতো ভালোভাবে ম্যানেজ করছি। আসলে আমরা মূলত দুটো বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এক, পণ্যের গুণগত মান রক্ষা এবং দুই, সকলের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা। আমরা প্রতিদিন সব শাখা থেকে পাপড়ের নমুনা নিয়ে আসি। কোন শাখায় তৈরি খাবার মানসম্পন্ন না হলে, যেমন-কোন পাপড়ে লবণ কম-বেশি হলে আমরা সাথে সাথে সেই শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্ত পাপড় ধ্বংস করে ফেলার নির্দেশ দেই। তার দাম যদি ১০ লাখ রুপিও হয়, তাতে কিছু আসে যায় না।” একইভাবে কাঁচামালের মানের ক্ষেত্রেও আপস করা হয় না। পাপড় তৈরিতে ব্যবহার করা হয় সেরা জিনিসটিই। যেমন, উন্নতমানের ডাল আসে মিয়ানমার থেকে, ইরান থেকে আনা হয় আশাফোতিদা এবং গোল মরিচ আনা হয় দক্ষিণ ভারতের কেরালা থেকে। বেশ কয়েক বছর যাবত্ পাপড় ছাড়াও আরো কিছু পণ্য তৈরি করছে লিজ্জাত। যেমন-বিভিন্ন ধরনের মশলা, গুঁড়ো সাবান এবং নানা ধরনের স্ন্যাকস। লিজ্জাতের গুডউইলের কারণে এগুলো বিক্রিও হচ্ছে যথেষ্ট। ৫০ বছর আগে কয়েকজন অল্পশিক্ষিত গৃহবধূর মহত্ উদ্যোগের কারণে আজ নিজ পায়ে দাঁড়িয়েছে অর্ধ লক্ষ বধূ এবং এ সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে। লিজ্জাতের পাপড় এখন আশপাশের দেশে এমনকি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশে বিক্রি হচ্ছে। এখন পর্যন্ত লিজ্জাতের সবচেয়ে বড় সাফল্য কী?— এ প্রশ্নের উত্তরে প্রতিভা যা বললেন তা যেন সমিতির ৫০ বছর যাবত্ অনুসৃত নীতিরই প্রতিধ্বনি— “আর্থিক লাভের চেয়েও বড় সাফল্য হলো লিজ্জাত তার সব সদস্যের মধ্যে আত্মপ্রত্যয় ও বিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।”