কোটালীপাড়ার নৌকাবাইচ ২শ বছরের ঐতিহ্য

আজ সোমবার শেষ হচ্ছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী তিন দিনব্যাপী নৌকা বাইচ। গত শনিবার উত্সবমুখোর পরিবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহত্ এই নৌকা বাইচ। বিল বাঘিয়ার নৌকা বাইচ হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছরের মতো এ বছরও এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে লাখ মানুষের মিলন মেলা বসেছে কালিগঞ্জে। দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ নৌকা বাইচ এলাকাবাসীর গর্ব। গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, পিরোজপুর, নড়াইল, বরিশাল জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের দুই শতাধিক সরেঙ্গা, ছিপ, কোষা, চিলাকাটা, জয়নগর বাচারী নৌকা এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। উপজেলার বাবুর খালে কালিগঞ্জ বাজার থেকে খেজুরবাড়ি পর্যন্ত ২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নৌকা বাইচ ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বাড়তি আকর্ষণ নৌকায় নৌকায় মেলা। দুপুর থেকে নানা বর্ণে ও বিচিত্র সাজে সজ্জিত দৃষ্টি নন্দন এসব নৌকা তুমুল বাইচ শুরু করে। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে নৌকা বাইচের একের পর এক ছোপ। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খলিলুর রহমান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিকাইল, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম হুমায়ুন কবীর, আওয়ামী লীগ নেতা লিয়াকত আলী মোল্লা, মুজিবুর রহমান হাওলাদার, লাল মোহন বিশ্বাস, কৃষ্ণ প্রসাদ মজুমদার, সর্বানন্দ বৈদ্য, ইউপি চেয়ারম্যান মাইকেল ওঝা উপস্থিত থেকে নৌকা বাইচ উপভোগ করেন। ঠিকারি ও কাঁসির বাদ্যের তালে জারি সারি গান নেচে গেয়ে হেঁইও হেঁইও রবে বৈঠার ছলাত্ ছলাত্ শব্দে এক অনবদ্য আবহ সৃষ্টি হয়। দুই কূলে দাঁড়িয়ে থাকা লাখ-লাখ মানুষের হূদয়ে জাগে দোলা। মাল্লাদের সাথে সমবেত হন অগণিত সমর্থক ও দর্শক। তারা উত্সাহ দেন বাইচের নৌকার মাল্লাদের। দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের করতালি ও হর্ষধ্বনিতে এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। কলাবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাইকেল ওঝা বলেন- জলাভূমি বেষ্টিত কোটালীপাড়ার জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল নৌকা। প্রায় দুইশ বছর আগে লক্ষ্মী পূজার সময় নৌকা নিয়ে এলাকার মানুষ জমিদার শিবরাম চৌধুরীর বাড়িতে যেতেন। পূজা দেখে ফেরার সময় নৌকায় নৌকায় পাল্লা হতো। নৌকার মাধ্যমে চিত্তবিনোদনের চিন্তা থেকে নৌকা বাইচের প্রচলন শুরু হয়। সে থেকেই লক্ষ্মী পূজার পরের দিন থেকে এ অঞ্চলের নৌকা বাইচ হয়ে আসছে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে। কালিগঞ্জ নিবাসী সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কৃষ্ণ প্রসাদ মজুমদার বলেন- জন্মের পর থেকে এ নৌকা বাইচ দেখে আসছি। এ খানে কখনোই কাউকে বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে বাইচের আয়োজন করতে হয় না। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এ বাইচ হয়ে আসছে। বাইচ নৌকার মালিক চন্দ্র শেখর চাঁদ বলেন- নৌকা তৈরি, সাজ-সজ্জা, মাঝি-মাল্লাদের খাবার, পোশাকসহ প্রচুর ব্যয় করা হয়। এখান থেকে আমাদের কোন আয় হয় না। শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমরা এটা করে থাকি। আর এ কারণেই আমাদের এ অঞ্চলে এখনো নৌকা বাইচ টিকে আছে। বাইচ নৌকার মাল্ল¬া মনিন্দ্র নাথ ওঝা বলেন, মানুষকে আনন্দ দিতে আমরা নৌকা করি। আমরাও আনন্দ পাই। পারিশ্রমিকের আশায় বাইচে আসি না। ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এ কাজ করি। নৌকা বাইচ প্রথম দেখতে আসা ঢাকার ইলিয়াছ হায়দার বলেন, জীবনে অনেক স্থানের নৌকা বইচ দেখেছি; কিন্তু এখানকার মতো এত বড়, কালার ফুল ও রাজকীয় ঢং-এর নৌকা বাইচ আমি দেখিনি। আমার দেখা নৌকা বাইচগুলোর মধ্যে এটা সেরা ও সবচেয়ে বড়। গৃহবধূ স্মৃতি রানী মজুমদার, চম্পা হালদার, ঝুমা রানী বালা, পান্না রায় বলেন, বাইচের দিনটি আমাদের কাছে পরম পাওয়ার। এ দিন জামাই-মেয়ে, অতিথি, আত্মীয়-স্বজন বাড়িতে বেড়াতে আসে। তাদের আদর-আত্তি করে আনন্দের মধ্য দিয়ে আমাদের সময় কেটে যায়। গৃহকর্ম সেরে বিকালে আমরা নৌকা বাইচ দেখি। মেলা থেকে কেনাকাটা সেরে নেই। আওয়ামী লীগ নেতা লিয়াকত আলী মোল্ল¬া বলেন, সারাদেশে নৌকা বাইচ যখন বিলুপ্তির পথে তখন কালীগঞ্জের লোকজন নৌকা বাইচ টিকিয়ে রেখেছে। নদী মাতৃক এ অঞ্চলের নৌকা বাইচ টিকিয়ে রাখতে বাবুর খাল খনন করা প্রয়োজন।