জলবায়ু ঘাতসহিষ্ণু হয়ে উঠছে
পিরোজপুরের ৪৫০০ পরিবার
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪২
জলবায়ুগত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উপকূলের হতদরিদ্র মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে খাপ খাওয়াতে রি-কল নামে একটি প্রকল্প দক্ষিণাঞ্চলের তিনটি জেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় পিরোজপুরের ৪৫০০ পরিবার নিজেদের জলবায়ু ঘাতসহিষ্ণু করে তুলছে। যার সাফল্য ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হচ্ছে।
পিরোজপুর জেলার দু’টি উপজেলা জিয়ানগর ও নাজিরপুর বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী বলে দীর্ঘদিন যাবত্ সাইক্লোন, অতিজোয়ার, লবণাক্ততা, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি দুর্যোগে আক্রান্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ সিডর-আইলার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ে অতিরিক্ত লবণ পানি ঢুকে চিংড়ির ঘের ও ফসলের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে এলাকার মানুষ মূল পেশাচ্যুত হয়ে বাস্তুহারা হয়ে পড়ছে এবং শিকার হচ্ছে অর্থনৈতিক স্থবিরতার। এ অবস্থায় পুরুষরা বিকল্প আয়ের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে রিকশা-ভ্যান, নির্মাণ শ্রমিকের কাজে সামান্য আয় করতে পারলেও নারী প্রধান পরিবারগুলোর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ২০১০ সালের জুলাই মাসে জিয়ানগর উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামে ১৩ মাস মেয়াদী পরীক্ষামূলক রি-কল প্রকল্প গ্রহণ করে অক্সফ্যাম সমর্থিত ডাক দিয়ে যাই নামে একটি বেসরকারি সংগঠন। যে প্রকল্পের অধীনে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে জিয়ানগর ও নাজিরপুর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ৪৫০০ পরিবারকে পাঁচ বছর মেয়াদী একটি কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়, যা বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন।
সম্প্রতি রি-কল প্রকল্পভুক্ত এ উপজেলা দু’টি সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে লক্ষ্য অনুযায়ী বিশেষ গুরুত্বপ্রাপ্ত তিনটি বিষয়ের কাজের সফলতার চিত্র। জলবায়ু অভিযোজন, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও নারীর নেতৃত্বের বিকাশ— এই তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জলবায়ু হুমকি মোকাবিলার জন্য রি-কল প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১৪ সালের মধ্যে উপকূলের অর্থনৈতিকভাবে হতদরিদ্র ১০ হাজার ৫শ’টি পরিবারকে অতিদারিদ্র্যের আঘাত ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। তার মধ্যে পিরোজপুরের ৪ হাজার ৫শ’টি পরিবারকে নিয়ে কাজ করছে অক্সফ্যাম ও ডাক দিয়ে যাই। এ কাজে বাংলাদেশ সরকারের এলজিআরডি মন্ত্রণালয় ডিএফআইডি’র অর্থ সাহায্যে মূল পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে। রি-কল প্রকল্পের ৪টি উদ্দেশ্য। এগুলো হলো— পিরোজপুরে ১৪১টিসহ উপকূলের তিন জেলায় (ক) ৪০০টি সিবিও বা সমাজভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলা ও কার্যকর রাখা, (খ) অর্থনৈতিকভাবে নিচু স্তরের ১০% পরিবারকে আয়বৃদ্ধিমূলক কর্মকাণ্ড, বিকল্প জীবিকার সাথে সম্পৃক্ত করা, (গ) দুর্যোগ প্রস্তুতি, দুর্যোগে সাড়া প্রদান ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সাথে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠিকে সক্ষম করে তোলা, (ঘ) কর্মসূচির মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতাসমূহকে একত্রিত করে জাতীয় নীতি-নির্ধারণী সংলাপে তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারি ও সেবা প্রদানকারী সংস্থার সেবায় হতদরিদ্রদের প্রবেশের সক্ষমতা তৈরি করা। ইতিমধ্যে সেখানে রি-কল প্রকল্পের ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জিয়ানগর উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের চর বলেশ্বর, চন্ডীপুর, কলারন, খোলপটুয়া, বালিপাড়া, ঢেপসাবুনিয়া, সাউদখালী প্রভৃতি গ্রাম দক্ষিণের ঘূর্ণিঝড় প্রবণ এলাকা। এছাড়া জিয়ানগরের পত্তাশী ও পাড়েরহাট ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। পাশাপাশি নাজিরপুর উপজেলার শাঁখারীকাঠি, শ্রীরামকাঠি, শেখমাটিয়া ও নাজিরপুর ইউনিয়নের গ্রামসমূহ অতি জোয়ার, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ছাড়াও প্রায়ই বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। এ দু’টি উপজেলার ৭১টি গ্রামে রি-কল প্রকল্পের আওতায় গড়ে তোলা হয়েছে ১৪১টি সিবিও। ২৫০ থেকে ৩০০ খানার সমন্বয় গঠিত একটি সিবিওতে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট কার্যনির্বাহী কমিটি রয়েছে। যারা ইতিমধ্যে সমাজ উন্নয়ন ও কল্যাণে বিভিন্ন ভূমিকা রাখতে শুরু করছে। দরিদ্র ও সম্ভাবনাময়ী নারীকে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচনে সহায়তা, এলাকার সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বার্ষিক কমিউনিটি উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির কাজটিও করা হচ্ছে। যেখানে উত্পাদক দলের পরিকল্পনা, পণ্যের ন্যায্যমূল্য বাজার সম্প্রসারণ পরিকল্পনা, দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আপদকালীন পরিকল্পনা তৈরি করে তা বাস্তবায়নের জন্য নিজস্ব উদ্যোগে নিয়মিত সভায় মিলিত হয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার কাজটিও সিবিও করছে। এছাড়াও প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত সম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে উপকার ভোগীরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে কি না তা মনিটরিং ও পরামর্শ প্রদানের ক্ষেত্রে এ সামাজিক সংগঠনটি বিশেষভাবে সক্রিয়। গত ১৬ মে সংঘটিত সাইক্লোন মহাসেনের সময় সিবিও সদস্যরা মাঠে নেমে দুর্যোগ প্রস্তুতিমূলক কাজ করেছে বলে জানা যায়।
রি-কলের একটি উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম হচ্ছে ক্যাশ ফর ওয়ার্ক। প্রকল্পভুক্ত বিভিন্ন গ্রামে ইতিমধ্যে ১৪০টি রাস্তা সংস্কার, ১৩টি স্কুলমাঠ উঁচুকরণ, ৩২টি বসতবাড়ি উঁচুকরণ এবং আটটি পুকুর পুনঃখনন করা হয়। এ কার্যক্রমে ৩৭৯৬ জন উপকার ভোগী ১৬ দিন কাজের বিনিময় মাথাপিছু ২৮০০ টাকা করে মজুরি পেয়েছেন।
প্রকল্পের প্রধানতম কার্যক্রম হচ্ছে উপকার ভোগীদের মধ্যে আয় বৃদ্ধিমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য সম্পদ হস্তান্তর। ৪৫০০ অতিদরিদ্র পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী করার জন্য পরিবার পিছু ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে গরু, ছাগল ও হাঁস পালন, জাল তৈরি, সেলাই মেশিন, সবজি চাষ, ভ্যান-রিকশা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, মুড়ি ভাজা ইত্যাদি খাতে বিনিয়োগ করার জন্য। পাশাপাশি প্রকল্পে বয়স্কভাতা, স্যানিটারী ল্যাট্রিন স্থাপন, দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম, গাছের চারা বিতরণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, পুষ্টি কার্যক্রম ইত্যাদি কর্মসূচিও বাস্তবায়িত হচ্ছে।