প্রস্তাব নাকচ করল আওয়ামী লীগ
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৫৬
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে সংসদ সদস্যদের নিয়ে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেয়ার তিন দিন পর গতকাল সোমবার সাংবাদিক সম্মেলনে খালেদা জিয়া ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ১০ জন অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন এই সরকারের পাল্টা প্রস্তাবনা দেন। এরপর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য, প্রবীণ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রশ্নে বিরোধী দলীয় নেতার দেয়া পাল্টা প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়। বরং এ প্রস্তাব দেয়ার মাধ্যমে তিনি স্ববিরোধিতা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ১৯৯৬ সালে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু নির্বাচনের পর খালেদা জিয়া বলেছিলেন যে, বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিরপেক্ষ ছিল না এবং তাদের (বিএনপি) নির্বাচনে জোর করে হারানো হয়েছে। এরপর ২০০১ সালে নির্বাচনের আগে তত্কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথে তারা আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে পরাজিত করার এজেন্ডা নিয়ে নামে। ওই সরকার ১৩ জন সচিবকে একযোগে বদলিসহ ক্ষমতা বহির্ভূত অনেক কিছুই করেছিল। আর তাই উভয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়েই বিতর্ক আছে। তিনি বলেন, পৃথিবীর গণতান্ত্রিক কোন দেশে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কোন নজির নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়ে সেই নজির সৃষ্টি করেছেন। তার এ প্রস্তাব বাস্তবসম্মত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তোফায়েল আহমেদ।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিরোধী দলীয় নেত্রীর নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের যে পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছেন তার কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। গতকাল রাতে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। বিদ্যমান আইনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়েই নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। আর এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন এবং এ প্রস্তাব মেনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করার জন্য বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান। কিন্তু বিরোধী দলীয় নেতা সাংবাদিক সম্মেলনের বক্তৃতায় বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে নির্বাচনকালীন সরকারের যে পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছেন তা সংবিধান বহির্ভূত। অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে এ ধরনের সরকার গঠন করা হলে নির্বাচন নিয়ে আবারো অতীতের মতো চক্রান্ত হবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে?
এদিকে খালেদা জিয়ার প্রস্তাবকে বিস্ময়কর হিসেবে আখ্যায়িত করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেছেন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়ে আবার কোন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য এই প্রস্তাবনা কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে। গতকাল রাতে হানিফ আরো বলেন, অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। ২০০১ সালে নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনেক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। তারা দায়িত্ব গ্রহণের পর এখতিয়ার বহির্ভূত অনেক কিছুই করেছিল। তখন দেশব্যাপী পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি ইঞ্জিনিয়ারিং বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরে দুই জনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয় এবং বিএনপি ক্ষমতায় এসে এই দুই জনকে পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে পুলিশের আইজি হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে পুরস্কৃত করে। আওয়ামী লীগকে পরাজিত করার উদ্দেশে এমন কোন কূটকৌশল নেই যা করা হয়নি। আর সেসব দেশবাসীর স্মৃতিতে এখনো অম্লান।
বিরোধী দলীয় নেতা তার ভাষণে দেশে জঙ্গীবাদ সৃষ্টির জন্য আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করার বিষয়টি নির্জলা মিথ্যাচার হিসেবে উল্লেখ করে মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, দেশবাসী জানে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে জঙ্গীবাদের উত্থান হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তত্কালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এছাড়া সাবেক অর্থমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা শাহ এএমএস কিবরিয়া, নওগাঁর সাবেক এমপি মমতাজ উদ্দিন, খুলনার মঞ্জুরুল ইমামসহ অনেক নেতাকে বোমা হামলা চালিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ২০০৫ সালে একই দিনে অল্প সময়ের ব্যবধানে সারাদেশে একযোগে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল। হানিফ শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে এর রূপরেখা ও কাঠামো নিয়েই আলোচনার মাধ্যমে আগামী নির্বাচনে সকল বাধা দূর করতে এগিয়ে আসার জন্য বিএনপিসহ সকল দলের প্রতি আহ্বান জানান।
আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ গতকাল সন্ধ্যায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, খালেদা জিয়ার নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাবে কোন নতুনত্ব নেই। এতোদিন সংবিধান বহির্ভূত অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে সরকার গঠনের যে বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন গতকাল সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। হাছান মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতির উদ্দেশে সাম্প্রতিক ভাষণ ছিল জাতির কাছে প্রত্যাশিত। উন্নয়ন সহযোগীরা বিশেষ করে সর্বদলীয় সরকার গঠনে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে স্বাগত জানায়। আমরা আশা করেছিলাম বিরোধী দলীয় নেত্রী উদার মন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে সাড়া দেবে। কিন্তু বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্য জাতিকে হতাশ করেছে। সাংবাদিক সম্মেলনে তার দেয়া বক্তব্য ষড়যন্ত্রমূলক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে ব্যাহত করার লক্ষ্যেই এ বক্তব্য দেয়া হয়েছে। হাছান মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দেয়ার পর থেকে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর নাম উচ্চারণে ব্যক্তিগত আক্রোশমূলক অশোভন আচরণ করে চলেছেন এবং নির্বাচন প্রতিহত করার হুমকি দিচ্ছেন। তার এসব আচরণ ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে নিজের জন্মদিনের কেক কাটা ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো ঘটনার সঙ্গে একই সূত্রে গাঁথা।
আজ খালেদা জিয়ার বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক
জবাব দেবে আওয়ামী লীগ
খালেদা জিয়া গতকাল সাংবাদিক সম্মেলনে যে বক্তব্য দিয়েছেন আজ মঙ্গলবার তার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবে আওয়ামী লীগ। দলের পক্ষ থেকে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।