কবি শামসুর রাহমানের আজ ৮৪তম জন্মবার্ষিকী

‘আমার কবিতা আজ একরাশ পাতার মতন উড়ে যায়, দূরে যায়, বস্তুত এ-সন্ধেবেলা যায়, কোথায় যে যায়। (আমার কবিতা আজ)’ নিজের কবিতা নিয়েই সন্দিহান ছিলেন কবি। তার মৃত্যুর পর সাতটি বছর চলে গেছে। কিন্তু তিনি কি হারিয়ে গেছেন বাংলার মানুষের হূদয় থেকে? আজ দেশের সাম্প্রতিককালের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ৮৪তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর বুধবার পুরানো ঢাকার মাহুতটুলীর ৪৬ নম্বর বাড়িতে কবি জন্মগ্রহণ করেন। ‘বহুদিন থেকে/ আমাদের পৃথিবীতে শান্তি পলাতক/ সময়ের বিমর্ষ কিনারে এসে তবু/ সোনালী দিনের আশা রাখি।/ সেই আশা চিরঞ্জীব হয়ে রয় নবজাত সূর্যের ললাটে।’ (নতুন কবিতা, শামসুর রাহমান)। কবি শামসুর রাহমান এভাবেই তার সারাজীবনের রচনায় মানুষকে আশার কথা বলেছেন। আজীবন কবিতায় সমর্পিত এ কবি ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট আমাদের ছেড়ে চলে যান। কিন্তু বাঙালির সত্তায় তিনি অমরত্ব লাভ করেছেন। বাংলা কবিতায় নতুন ধারা সৃষ্টি করে কবি শামসুর রাহমান উভয় বাংলায় সমকালীন সময়ে অন্যতম কবির মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। বাঙালির প্রিয় এ কবি তার সারাজীবনের কাব্য রচনার মধ্য দিয়ে মানুষের হূদয়ে অমর হয়ে আছেন। ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা আর কতকাল ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়/আর কতকাল দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন’ — মুক্তিযুদ্ধে কবির উদ্দীপ্ত উচ্চারণে স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে সাহস সঞ্চারিত হয়েছিল। তার কবিতার পংক্তিমালায় মানুষ দেখেছিল নতুন দিনের স্বপ্ন। সে কারণে তার কবিতা হয়ে উঠেছিল গণমানুষের কবিতা, সাধারণ মানুষের কবিতা। কালের কণ্ঠস্বর, কবিতার বরপুত্র এ কবি ছিলেন মৃদুভাষী। কিন্তু যে কোন আন্দোলনে, অধিকার আদায়ের দাবিতে সোচ্চার এ কবি ছিলেন মানুষের পাশাপাশি। তার লেখনী এসব আন্দোলনে ছিল প্রেরণার উত্স। তিনি সশরীরেও এসব আন্দোলনে যোগ দিতেন। এখনো যে কোন অধিকার আদায়ের সংগ্রামে, মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে তার কবিতা মানুষের মুখে মুখে মন্ত্রের মত উচ্চারিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে, মৌলবাদ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার কবিতা মানুষকে উজ্জীবিত করেছে, যুগিয়েছে প্রেরণা। সকল বিপর্যয়ে, দুঃশাসনে, মানবতার লাঞ্ছনায় বাঙালিকে বার বার ফিরে যেতে হবে কবি শামসুর রাহমানের কাছে। বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে সামপ্রতিককালের বহুল পঠিত কবি হলেন শামসুর রাহমান। বাংলা কবিতায় এককভাবে সবচেয়ে বেশি কবিতা লিখেছেন তিনি। শামসুর রাহমানের কাব্যগ্রন্থ ৬৬টি। কবি শামসুর রাহমান ১৯ বছর বয়সে কবিতা লিখতে শুরু করেন। সেটা ছিল ১৯৪৮ সাল। ১ম কবিতা ‘উনিশশো ঊনপঞ্চাশ’ প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সোনার বাংলায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ৬৬টি। উপন্যাস ৪টি, প্রবন্ধগ্রন্থ ১টি, ছড়ার বই ৮টি, অনুবাদ ৬টি। তিনি অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। কবিকে তার পঞ্চাশ বর্ষপূর্তিতে জাতির পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয় ১৯৭৯-এ এবং ষাট বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জাতীয় সংবর্ধনা দেয়া হয় ১৯৮৯ সালে। কবি শামসুর রাহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা একাডেমী এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে একাডেমীর কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে স্বরচিত কবিতাপাঠ ও আবৃত্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে ভারত থেকে আগত কবি অমৃত মাইতি, সুস্নাত জানা এবং বাংলাদেশের কবি সানাউল হক খান, সুহিতা সুলতানাসহ দেশের তরুণ কবিরা শামসুর রাহমানকে নিবেদিত কবিতা পাঠ করেন। কবির কবিতা থেকে আবৃত্তি করেন কাজী আরিফ ও শাহাদাত্ হোসেন নিপু। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক কবি অসীম সাহা। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। দিনের কর্মসূচি কবির জন্মবার্ষিকী স্মরণে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বনানী কবরস্থানে কবির সমাধিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, আলোচনা সভা, গান ও কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান। এছাড়া আজ সকালে কবির সমাধিতে বাংলা একাডেমী, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পুষ্পমাল্য অর্পণ করবে। জাতীয় কবিতা পরিষদ আজ বুধবার বিকাল সাড়ে ৫টায় শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে টিএসসি’র উন্মুক্ত চত্বরে আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি ও গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এতে সভাপতিত্ব করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। কবির সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আলোচনা করবেন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, লেখক ও সমালোচক মফিদুল হক, কবি রফিক আজাদ প্রমুখ।