দুই নেত্রীর প্রস্তাব নিয়ে দেশি-বিদেশিরা তত্পর

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার দেয়া দুই ধরনের প্রস্তাব নিয়ে সর্বত্র চলছে নানামুখী আলোচনা। স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উভয় প্রস্তাবের চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। এনিয়ে কূটনীতিকরাও নতুন করে তত্পর হয়ে উঠেছেন। প্রস্তাব দুটির পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি-পাল্টা যুক্তির এক ধরনের বাহাস শুরু হলেও প্রায় সকলেই মনে করছেন, দশম সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে দুই নেত্রী নিজ নিজ অবস্থান থেকে রূপরেখা উপস্থাপন করায় নাটকীয় গতি পেয়েছে রাজনীতির চাকা, সংলাপের রুদ্ধ দ্বার খোলার উপায় বের হলো। গত শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় মন্ত্রিসভার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যের জন্য বিরোধী দলের কাছেও নাম চান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের তিনদিন পর সোমবার তা নাকচ করে পাল্টা প্রস্তাব দেন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া। ঐকমত্যের ভিত্তিতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও সম্মানিত একজন নাগরিককে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান করার প্রস্তাব দেন বিএনপি চেয়ারপারসন। এছাড়া ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে ১০ জনকে (৫জনের নাম প্রস্তাব করবে সরকারি দল, আর ৫ জনের নাম প্রস্তাব করবে বিরোধী দল) নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেছিলেন ‘আশা করি বিরোধী দলীয় নেত্রী আমার প্রস্তাবের মূল্য দেবেন’। ভিন্ন রূপরেখা দিয়ে খালেদা জিয়াও বলেছেন ‘শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত এ প্রস্তাব নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনার কার্যকর উদ্যোগ নেবেন।’ খালেদা জিয়া নির্দলীয় সরকারের পাল্টা প্রস্তাব দেয়ার পরদিনই, অর্থাত্ গতকাল মঙ্গলবার বিএনপির পক্ষ থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছে। চিঠি গ্রহণ করে সঙ্গে সঙ্গেই সৈয়দ আশরাফ টেলিফোন করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কথা বলেছেন। চিঠিতে সংকট নিরসনে দ্রুত আলোচনার উদ্যোগ নিতে সরকারি দলকে আহ্বান জানিয়েছে বিরোধী দল। ফখরুলকে আশরাফ জানিয়েছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চিঠির বিষয় নিয়ে আলাপ করবেন। দুই নেত্রীর প্রস্তাব নিয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখালেও তারা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রস্তাবের মধ্যে ব্যবধান অনেক বেশি হলেও তা সংলাপের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম করবে। দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনায় বসলে সমস্যা সমাধানের পথ বেরিয়ে আসতে পারে। দেশের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মতে, দু’জনের প্রস্তাবই ইতিবাচক। তবে এগুলো বাস্তবায়ন করতে দুই নেত্রীর মধ্যে সংলাপ প্রয়োজন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খানও বলেছেন, দু’জনের প্রস্তাব যাই হোক না কেন, সরকার ও বিরোধী দল আন্তরিক হলে সমঝোতা সম্ভব। এছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়া অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, সংকট নিরসনে আলোচনা অপরিহার্য। এদিকে, শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে পৃথক রূপরেখা দেয়ার পর প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত-হাই কমিশনারও নতুন করে তত্পরতা শুরু করেছেন। খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের পরপরই সোমবার সন্ধ্যায় তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা, যিনি বরাবরই সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট নিরসনের তাগিদ দিয়ে আসছেন। বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিয়ে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছেন। বিরোধী দলীয় নেতাও বক্তব্য রেখেছেন। আমরা আশাবাদী দুই নেত্রীর বক্তব্যে আলোচনার দ্বার উন্মোচিত হবে।’ ড্যান মজীনা গতকাল বৈঠক করেছেন ভারতের হাই কমিশনার পঙ্কজ শরণের সঙ্গে। পঙ্কজ শরণের বাসায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকেও দুই নেত্রীর প্রস্তাবসহ বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির প্রসঙ্গই গুরুত্ব পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। এই অচলাবস্থা কাটিয়ে সমাধানসূত্রে পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীনসহ দাতা দেশগুলো বেশ কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশের প্রধান দুই দলের সংলাপ অনুষ্ঠানের ওপর জোর দিয়ে আসছে। ভারতের রাষ্ট্রদূতও বারবার জানিয়ে আসছেন, ভারত বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন চায়। এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনের রাষ্ট্রদূতও সম্প্রতি সঙ্কট নিরসনে দুই দলের মহাসচিবকে আলোচনায় বসার আহবান জানিয়েছেন।