বিজ্ঞাপন বিরতি নিয়ে দর্শকদের কিছুটা স্বস্তি!
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০১৩, ২০:৩৪
প্রতি ঈদেই চ্যানেলের সংখ্যা বাড়ে গড় হিসেবে। তবে ৬ দিনের এবারের ঈদ নিয়ে লিখতে হলে তা হয়তো শত চোখের একটি টিম দরকার। সেদিকে না গিয়ে বরং এটুকু বলা যায় সবচেয়ে ভালো প্রবণতা ছিল যে, প্রতিটি চ্যানেলই এবারে তার দর্শকদের ধরে রাখার জন্য বিজ্ঞাপন বিরতি কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। অর্থাত্ গত কয়েক ঈদে একাধিক বিজ্ঞ নাট্যজনদের যে প্রধানতম অভিযোগ ছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবারে তারা বিজ্ঞাপন বিরতি কমিয়ে এনে নতুন স্ট্র্যাটেজি হাতে নিয়েছেন। এমনকি বেশ কটি চ্যানেল তাদের ঈদ অনুষ্ঠান প্রচারণায় দর্শক টানার জন্য ‘বিজ্ঞাপন বিরতি কম’ এই কথা বলে আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। অনুষ্ঠানের বৈচিত্র্যে চ্যানেল নাইন, আরটিভির মিউজিক্যাল লাইভের সেটের বৈচিত্র্যের কথা বলাই যায়। বৈশাখী টিভি রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিনের একক সংগীতানুষ্ঠান উপহার দিয়েছেন। এটা ঈদের বিশেষ পাওয়া বলা যায়। চ্যানেল আই তাদের বরাবরের কিছু গত্বাধা নাটকের বাইরে ‘ছোটকাকু’র নানা ক্যাম্পেইন ছিল প্রশংসনীয়, বলা যায় চ্যানেলটিও গুটিকতক অনুষ্ঠানের প্রতিই বেশি গুরুত্ব দেয়। ঈদ স্পেশাল অনুষ্ঠান হিসেবে শাঈখ সিরাজের সঞ্চালনা ও পরিচালনায় ঝালকাঠিতে ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ অনুষ্ঠানটি সত্যিকার অর্থেই ছিল প্রশংসিত। বিশেষ করে ঝালকাঠির ভাসমান বাজারের সাথে বিশ্বের অন্যান্য ভাসমান যেমন ইতালির বাজারের যে ভিজ্যুয়াল সামঞ্জস্যতা তুলে ধরেছেন, তাতে সত্যিই নান্দনিকতা পেয়েছে। সবমিলিয়ে কৃষকদের নানান বর্ণিল খেলা আর বাংলার বাঘ বা অন্যান্য প্রতিবেদন মিলয়ে বিষয় বৈচিত্র্যে সত্যিকার অর্থেই ছিল নান্দনিকতার ছোঁয়া।
এটিএন নিউজে মুন্নি সাহার উপস্থাপনায় নাট্যকার মোহন খান ও চ্যানেলটির কর্নধার ড. মাহফুজুর রহমানের গান নিয়ে আলাপচারিতা অন্য এক রঙ্গরসের মুগ্ধতায় ডুবিয়েছে তা বলাই বাহুল্য। দর্শকদের অস্থির রিমোট এই অনুষ্ঠানে চোখ পড়লে আটকাতে যেন বাধ্য হয়েছে... অতিথি, বিষয় ও প্রশ্নের বৈচিত্র্য। চ্যানেল টিআরপি উর্ধ্বগতিতে রাখার জন্য এর চেয়ে বড় কৌশলই বা আর কী থাকতে পারে। নিঃসন্দেহে বলা যায় দর্শকেরা উপভোগ করেছে। এটা যেই দৃষ্টিকোণ দিয়েই হোক। নিউজ চ্যানেলগুলোর ভেতরে বরাবরের মতো ঈদের সময়টাতে খানিক বিভ্রান্তিতে পড়তে হয় খবরের রশদহীন এই সময়ে তারা কী প্রচার করবে। সেই সূত্রে বেশ কিছু টকশো পাওয়া গেছে। একাত্তর টিভিতে চাষী নজরুল ইসলাম, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও ড. ইনামুল হকের আলাপচারিতা ছিল দেখার মতো। এ ছাড়া বেশ কিছু নান্দনিক টক শো তারা প্রচার করেছে। চ্যানেল টুয়েন্টিফোর এবারে ভিন্ন একটি থিম নিয়ে কাজ করেছে। ছোট ছোট স্ক্রলে লিজেন্ড ও জনপ্রিয় তারকাদের ওপরে তারা ডকুফিকশন ও টকশো প্রচার করেছে যা ভিন্নতা পেয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের লিজেন্ডদের নিয়ে তৈরি ডকুমেন্টারিগুলো সত্যিকার অর্থেই অনবদ্য। তবে অন্য সব চ্যানেলের মতো এই চ্যানেলটিও উপস্থাপনার ক্ষেত্রে গায়িকাদের বা নায়িকাদের বসালেই যে আকর্ষণ পায় না, তা বোধ করি অনুষ্ঠান প্রধানদের বুঝতে আরও কয়েকটি ঈদ পেরুতে হবে। নান্দনিক নাটক ও বিষয় বৈচিত্র্য বা ফ্যান্টাসিতে পূর্ণ নাটক বলতেই এবারেও দর্শকদের আস্থার প্রতি সুবিচার করেছে এনটিভি ও বাংলাভিশন। দেশটিভি বরাবরের চমকে বিদেশি শিল্পীদের ওপরই ভর করেছেন। তাতে রাঘব, সোমলতার মতো শিল্পীদের অসাধারণ কিছু গান পাওয়া গেলেও দেশের সবচেয়ে বড় উত্সব আয়োজনে বিদেশি শিল্পীদের ওপর এই নির্ভরতা চ্যানেলটির নাম কেউ মজা করে ‘বিদেশ টিভি’ বলতেই পারে। তবে শিল্পী নির্বাচনে কলকাতার এই গুণী শিল্পীদের রাতভর অনুষ্ঠানে সত্যিই দর্শকচোখ আটকে রাখা হয়। একইভাবে এশিয়ান টিভি এবারেও কলকাতায় সেট ফেলে কিছু অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। তাতে বৈচিত্র্য পাওয়া মুশকিল ছিল বৈকি। বিশেষ করে শিল্পীদের লিপসিং গানগুলোও যখন তারা লাইভ গানের আদলে প্রচার করে তখন এই শুভংকরের ফাঁকি সহজেই ধরা যায় বৈকি। একুশে টিভি তাদের বরাবরের নিয়মে নান্দনিক কিছু অনুষ্ঠান ও নাটক দিয়ে সাজিয়েছে। সেদিক দিয়ে গত কয়েক ঈদের চেয়ে অনুষ্ঠান বৈচিত্র্যে অনেক খানি এগিয়ে ছিল তারা। বিশেষ করে পথ শিশুদের নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠান ‘ছিন্ন মুকুল’ সব মহলেই ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। এ ছাড়াও শিশুদের জন্য ‘ঈদ আনন্দ’ এবং ‘গোপালভাঁড়’ ও ‘মোল্লা নাসিরউদ্দিন’-এর উপর ভিত্তি করে বিশেষ অনুষ্ঠান দুটি ঈদে খুদে দর্শকদের বিনোদনের খোরাক যুগিয়েছে। এটিএন বাংলায় তাদের নিয়মিত ঈদ এক্সক্লুসিভ হিসেবে এবারেও হানিফ সংকেতের ‘পরিণামে পরিণয়’ নাটকটি ছিল তাত্পর্যপূর্ণ। এ ছাড়াও মোহন খান ও সাদেক সিদ্দিকীর নাটক তাদের নিজস্ব ঘরানার বাইরে আরও খানিকটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করার চেষ্টা করেছেন। আরটিভিতে তাদের নান্দনিক সেটে প্রখ্যাত শিল্পীদের লাইভ শো গুলো বেশ প্রশংসিত বলা যায়। তবে গায়িকাদের নিয়ে অযথা নাচের অনুষ্ঠানের এই ব্যর্থ চেষ্টা ভাড়ামি ছাড়া কিছু মনে হয়নি। যে যা না... তাকে দিয়ে তা করানোর চেষ্টা সবসময়ই ‘এক্সক্লুসিভ’ হিসেবে ধরা নাও দিতে পারে। মাছরাঙা টিভির জামিল, সজল আর রনির টিভি লাইভ নিয়ে স্যাটায়ার অনুষ্ঠানটি ছিল দারুণ উপভোগ্য। গাজী টিভি তাদের নিজস্ব ঢঙে বেশি দিন না বাড়িয়ে গোছানো অনুষ্ঠান উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। আর ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি ও সময় টিভি নিউজের বাইরে কিছু টক শো ও ঈদ রুটিনেই সীমাবদ্ধ ছিল নিজস্ব স্টাইলে। ঈদের আগে আমরা বলেছিলাম এবারে স্পন্সর বান্ধব অনুষ্ঠান হচ্ছে। সেই হিসেবেই দর্শকেরা হয়তো মন্দের ভালো হিসেবে সত্যিকার অর্থেই কিছুটা হলেও বিজ্ঞাপন বিরতি এবারে সহনীয় পর্যায়ে ছিল। আর বিরতি দীর্ঘ থাকলেও সেটি আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে কতক্ষণ পরে আবার তারা ফিরবে। এবারের ঈদের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক বলতে এই উদ্যোগের কথা বলতেই হয়।