নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নির্বাচন কমিশনাররা
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৪২
বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই উদ্বিগ্ন খোদ নির্বাচন কমিশনাররা। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন আয়োজন যত ঘনিয়ে আসছে ততই নির্বাচন কমিশনারদের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠা।
সর্বশেষ গতকাল বুধবার ভোরে দেশজুড়ে ছাত্রদলের বিক্ষোভ কর্মসূচির মধ্যে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজের বাসার সামনে ককটেল বোমা ফাটানো হয়েছে। তবে কমিশনারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় অন্য একটি পক্ষও জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় মো. শাহনেওয়াজের বাসার সামনে এ ককটেল বোমা ফাটানোর পরিপ্রেক্ষিতে তার ও অপর নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারকের বাসায় পর্যাপ্ত পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দিতে যাচ্ছে। গতকাল এ বিষয়ে প্রস্তুতি চলছিল। আর সিইসিসহ ৫ নির্বাচন কমিশনারের বাসায় ক্লোজ সার্কিট টিভি বা গোয়েন্দা ক্যামেরা বসাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে সোয়া কোটি টাকা চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ককটেল বিস্ফোরণের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ ‘ইত্তেফাক’কে জানান, গতকাল ভোর ৬ টা থেকে সোয়া ৬ টার মধ্যে আজিমপুর অগ্রণী স্কুল এন্ড কলেজের পাশে ৮৮ নং সরকারি কোয়ার্টারে তাদের বাসার নিচে গেটের সিঁড়ির পাশেই দুটি ককটেল বোমা ফাটানো হয়। এ ঘটনা ঘটিয়ে দু’জনকে দৌড়ে পালাতে দেখেন তার স্ত্রী। বিস্ফোরণের ১০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত হয়। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে তার সাথে কথা বলেননি এবং তিনি নিজেও পুলিশকে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করেননি। লালবাগ থানার ওসি ‘ইত্তেফাক’কে জানান, ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তবে নির্বাচন কমিশনারের পক্ষ থেকে কারোর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করা হয়নি। এখনো পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি। ইসি সূত্র বলছে, ককটেল বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে কেউ স্পষ্ট কিছুই বলতে পারেননি। হঠাত্ কেন, কি কারণে এই ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে তাও অস্পষ্ট। ধারণা করা হচ্ছে, সম্প্রতি জিয়ার আদর্শের অনুসারী দাবিদার বহুল আলোচিত নতুন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ)-এর নিবন্ধন দেয়ার বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ ইস্যুতে নানামুখী চাপের মধ্যে ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ। এ বিষয়ে একমত নন এই নির্বাচন কমিশনার। নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনাররা পুলিশ কর্তৃপক্ষের উপর ক্ষুব্ধ। বাসা থেকে অফিসে যাওয়া আসার পথে পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা চেয়েও তারা পাননি। এমনকি তাদের সাথে একজন করে যে এসবি’র গানম্যান থাকে তাদের জন্য ওয়াকিটকিও সরবরাহ করতে পুলিশ কর্তৃপক্ষ রাজি হয়নি। পুলিশ কর্তৃপক্ষ গত ১৩ জুন এসব চাহিদার বদলে নির্বাচন কমিশনারদের বাসাতে ক্লোজ সার্কিট টিভি বসানোর পরামর্শ দেয়। এর আগে ২০১০ সালের ৩১ আগস্ট বর্তমান পুলিশ মহাপরিচালক হাসান মাহমুদ খন্দকার দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকেই ড. এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশনের দুই কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন ও মুহাম্মদ ছহুল হোসাইনের বাসায় পুলিশ পাহারা কমিয়ে দেয়া হয়। তাঁর আগে ২০০৬ সাল থেকেই সব নির্বাচন কমিশনারের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা ছিল। ২০১০ সালের ৩১ আগস্টের পর থেকে শুধুমাত্র প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) পর্যাপ্ত পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা পেয়ে থাকেন।
বর্তমানে চার নির্বাচন কমিশনারের নিরাপত্তায় পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন করে গানম্যান রয়েছে। তাদের মধ্যে দুই নির্বাচন কমিশনারের একজনের বাসায় রয়েছে সার্বক্ষণিক একজন করে পুলিশের পাহারা। অন্যজনের বাসার সামনে রয়েছে নিয়মিত পুলিশি টহল। নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মোবারক ও মো. শাহনেওয়াজের বাসায় পুলিশ পাহারা দেয়া হয়নি। সিইসি’র সাথে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের দুইজন গানম্যান, পুলিশের একজন হাবিলদার, একজন নায়েক ও দুইজন কনস্টেবল রয়েছেন। তার বাসাতে রয়েছে ৬ জন পুলিশের একটি দল।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ১৩ জুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) কার্যালয়ের এবং নির্বাচন কমিশনারদের বাসার নিরাপত্তা জোরদার করার পরামর্শ দিয়ে কমিশন সচিবালয়কে একটি চিঠি পাঠায় পুলিশ প্রশাসন। পুলিশের সদর দপ্তরের ওই চিঠিতে ইসি সচিবালয়কে বলা হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)-সহ সব নির্বাচন কমিশনারের বাসায় ক্লোজ সার্কিট টিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা করতে। এছাড়া পুলিশের একটি দল সরেজমিনে কমিশন কার্যালয় পরিদর্শন করে এ প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাগত ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদনও দাখিল করে।
ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা গতকাল জানান, পুলিশ যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে তা বেশ ব্যয়বহুল। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বাসাতেই ৬টি ক্যামেরা লাগবে। সব মিলিয়ে পাঁচ নির্বাচন কমিশনারের বাসাতে এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা প্রয়োজন। গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে এ হিসাব দেয়া হয়েছে। কমিশন সচিবালয় এ টাকার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিতে যাচ্ছে।
৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০০৬ সালে বিচারপতি এমএ আজিজের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের সব কমিশনারের বাসাতেই গুলিবর্ষণ ও বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। ওই বছরের ১৩ জুন ভোরে ১৪ দল আহূত ৩৬ ঘন্টা হরতালে প্রথমদিনে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি মাহফুজুর রহমানের মোহাম্মদপুর হুমায়ূন রোডের বাসাতে গুলিবর্ষণ করে। পরদিন ১৪ জুন বিচারপতি এমএ আজিজের মগবাজারের পূর্ব নয়াটোলার বাসায় ককটেল বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর ওই বছরের ১২ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনার সম জাকারিয়ার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাজীপাড়াস্থ বাসাতে হামলা চালানো হয়। পরের মাসের ১৫ তারিখে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে নির্বাচন কমিশনার মাহমুদ হাসান মনসুরের মোহাম্মদপুরের স্যার সৈয়দ রোডের বাসায়। ওই সময় সব নির্বাচন কমিশনারের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করা হয়।