গতকালের সুনসান কফি হাউজের এক ঐতিহাসিক সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০১৩, ২০:৫৬
ইন্ডিয়ান কফি হাউজ, কলেজ স্ট্রিট, কলকাতা থেকে
২৪ অক্টোবর ভোর ৩টা ৫০ নাগাদ বেঙ্গালুরুর হাসপাতালে নাইনটি ফোর নট আউট মান্না দে যখন বড় একলা ঘরের বাসিন্দা হয়ে গেলেন, তার আগে থেকেই বোধ করি কলকাতাসহ ভারতীয় মিডিয়াগুলো মান্না দে সংক্রান্ত স্মৃতিচারণ লিখছিল। খুব ভোরে মৃত্যুবরণ করায় তাই কেউ কেউ ৪/৫ পৃষ্ঠার টেলিগ্রামও ছাপিয়ে ফেলেছে। ঢাকা থেকে কলকাতাগামী বাসগুলো যখন বর্ডার পার হয় তখনই মান্না দে’র এই চিরপ্রস্থানের খবরে নানান কাতর মন্তব্যে ছেয়ে গেছে শহর। কলকাতা শহরে নেমে তাই প্রথমেই মনে পড়ল মান্না দে’র সেই বিখ্যাত গানের স্মরণস্থান কফি হাউজের কথা। পার্ক স্ট্রিট থেকে ট্যাক্সি নিয়েই ছুটলাম সেখানে। ট্যাক্সি ড্রাইভার নিজে থেকেই বললেন, ‘আজ আর কফি হাউজে গিয়ে কী হবে দাদা?’ প্রশ্নটা বড় বুকে লাগল। তবে কী মান্না দে’র সেই চিরচেনা স্থান সত্যিকার অর্থেই নিভে যাবে? নাকি তার স্মরণেই আরও দীপশিখা জ্বলবে নতুন নতুন আলো হয়ে? কলকাতা সদরের কয়েকটি মোড়ে শোনা গেল মান্না দে’র গান। বুঝা গেল এই কসমোপলিটন শহরেও কিংবদন্তি এই গায়কের প্রতি শ্রদ্ধার অনুভূতি—রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে সম্মান জানানোর ব্যাপক প্রস্তুতি। কিন্তু বাংলা তরুণ কবি-সাহিত্যিকরা যে জায়গায়টায় এসে নিজের শিল্পপ্রেম খুঁজে পায়, সেই কফি হাউজের আজ কী অবস্থা!
কলেজ স্ট্রিটের চিরচেনা দোতলায় উঠতেই চোখে পড়ল নানান টিভি চ্যানেলের রিপোর্টারের জটলা। আমাকেও মান্না দে প্রসঙ্গে বাইট দেওয়ার জন্য ডাকলে আমি বাংলাদেশ থেকে দৈনিক ইত্তেফাকের হয়ে এসেছি বলে জানালাম। ওপরে উঠেই ছোট্ট করে সাদা নোটিশ—তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমরা আজ কফি হাউজের কোলাহল দেখতে চাই না। মন খারাপের বাতাস বইতেই কফি হাউজের নিষেধাজ্ঞার ফাঁক গলে টের পাওয়া গেল ভেতরে কয়েকজন মানুষ আর চ্যানেলের ফোকাস লাইটের আলো জ্বলছে। অনেক অনুনয় করে কফি হাউজে ঢুকলাম। অথচ চিরচেনা সন্ধ্যায় আগে কতবার এসেছি মান্না দে’র গানের টানেই... শুনেছি কোলাহল... কিছু মানুষের পায়চারী। বাংলাদেশ থেকে মিডিয়াকর্মী হিসেবে এসেছি বলেই ভেতরে ঢুকতে দিল। কফি হাউজ ফাঁকা, সুনসান। কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ঠিক ক্যাশ কাউন্টারের পাশেই মান্না দে’র একটি ছবিতে মাল্যদান করে পাশে বসে আছেন কফি হাউজের বর্তমান পরিচালনা কমিটির কয়েকজন সদস্য। চ্যানেল এনই টিভি তাদের সাক্ষাত্কার নিচ্ছেন। আমি অনুরোধ করে ঢোকার পর অনেক দর্শনার্থীই কফি হাউজে ঢোকার জন্য চাপ দিচ্ছে। জানা গেল একের পর এক চ্যানেল ঢুকে তাদের প্রতিবেদনের কাজ শুরু করবে। নিচে কলকাতা টিভি, তারা নিউজ, চব্বিশ ঘণ্টা, এনডিটিভিসহ একাধিক চ্যানেলের ক্যামেরা ও রিপোর্টার। কোনো কোনো চ্যানেল নিজ উদ্যোগে আবার তরুণ কবিদেরও ডাকছেন। চব্বিশ ঘণ্টা’র এক রিপোর্টার তরুণ এক কবির উদ্দেশে ফোনে বলছেন, ‘দাদা আধ ঘণ্টার ভেতরেই আসুন। আপনাদের কমেন্টগুলো কফি হাউজের ভেতরে নেব। ঘণ্টা খানেকের ভেতরেই আমাকে এই প্যাকেজটি অন এয়ার করতে হবে।’ কফি হাউজের বেশ কিছু ছবি আর কথা সংগ্রহ করার চেষ্টা করলাম। কফি হাউজের বর্তমান পরিচালনা সদস্যদের একজন দীপংকর বললেন, ‘সকালে খবরটি পাওয়ার পরই আমরা সিদ্ধান্ত নিই কফি হাউজ বন্ধ রাখার। কারণ আজ আর কারও অর্ডারে কফি বা চপ দেওয়ার মানসিকতা নেই। আর দাদার গানটিই তো বিয়োগান্তক গান, সেই আড্ডাটা তিনি চলে যাওয়ার পর সত্যিকার অর্থেই থাকবে না। সেটিকেই আমরা শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে দেখছি। আমি চাই কফি হাউজের নাম এখন ‘ইন্ডিয়ান কফি হাউজ’ বদলে ‘মান্না দের কফি হাউজ’ রাখার দাবি জানাব।’
ফোন করলাম কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারকে। তিনি বললেন, ‘কফি হাউজকে ঘিরে আমারও ইচ্ছে বড় কিছু হোক। আর মান্না দে প্রসঙ্গে কী বলব... তিনি এই আধুনিক বাংলা গানের দেবতা।’
আরতি মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘মান্না দে নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান সকলের কলরবে ক্রমশ মুখরিত হবে। এটা ম্লান হবে না কখনো, যেমন হবে না কফি হাউজও।’
অজয় চক্রবর্তী বললেন, ‘মান্না দে ভারতের রত্ন।’
অপর্ণা সেন বললেন, ‘মান্না দের সঙ্গে খুব বেশি দেখা হয়নি, সেই দুঃখ সারাজীবন থেকে যাবে।’
গীতিকবি জয় গোস্বামী বলেন, ‘মান্না দের জন্য আমার ভালো কিছু লেখা জমে ছিল, তাকে দেখানো হলো না। এই আক্ষেপ আমার ব্যক্তিগত। আর সামগ্রিক আক্ষেপ নিয়ে তো বলার কিছু নেই! সকলকে তিনি সমৃদ্ধ করে গেছেন।’
এমন হাজারো মন্তব্যের কোলাহলে পূর্ণ হচ্ছে মান্না দে সংক্রান্ত স্মৃতিচারণ টিভি পর্দা, মান্না দের বাসভবন সংলগ্ন এলাকাসহ প্রায় পুরো কলকাতা। সেই স্মৃতির স্বাক্ষী হয়ে সন্ধ্যার এই সুনসান কফি হাউজ হয়তো আবারও কোলাহলে মুখরিত হবে। কিন্তু একজন কিংবদন্তির গানের আবহে একটি চিরচেনা প্রতিষ্ঠানের এই শোকে এই মিডিয়াবাজি সত্যিই বিরল। সেই বিরল দৃশ্যের দর্শক হয়ে তাই ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। কলকাতা আজ পুরোপুরি বাঙালির না, তবুও মান্না দে’র এই মহাপ্রয়াণে নতুন করে বাংলা গানের এই স্মরণ। এমন কিংবদন্তি, এমন প্রতিষ্ঠানের জন্য তো বারবার হয় না। তাই শূন্যতা থেকেই যায়; শূন্য, সুনসান কফি হাউজটার মতো।
সত্যিই কফি হাউজের সেই আড্ডাবাজটা আজ আর নেই! আজ আর নেই!