মেহেরপুরের ঐতিহাসিক আমঝুপি নীলকুঠি আজ ধ্বংসের পথে

ব্রিটিশ আমলে নির্মিত মেহেরপুর জেলার পর্যটক কেন্দ্র ঐতিহাসিক আমঝুপি নীলকুঠি ও আম্রকাননের সৌন্দর্য দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। জেলা শহর থেকে ৪ মাইল পূর্বে অবস্থিত আমঝুপি নীলকুঠি ৭৭ একর ২৮ শতক জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। সংরক্ষণের অভাবে নীলকুঠির ঐতিহ্য আজ বিলীনের পথে। কুঠিবাড়ির চতুর্দিকে দেয়াল না থাকায় গরু-ছাগলের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। কুঠিবাড়ির বিভিন্ন প্রজাতির গাছের ডালপালা চুরি হয়ে যাচ্ছে। জানা যায়, ব্রিটিশ বেনিয়াদের অন্যতম ব্যবসা কেন্দ্র ছিল এই কুঠিবাড়ি । ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীল ব্যবসায়ীদের দোর্দন্ড প্রতাপে মেহেরপুরসহ পশ্চিমবঙ্গের অগণিত কৃষক ছিল দিশেহারা। আজ ব্রিটিশ সম্রাজ্য ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জমিদার বাড়ির কাছারি না থাকলেও শোষণ বঞ্চনা, নির্যাতন, অত্যাচার আর ষড়যন্ত্রের স্মৃতি নিয়ে নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেহেরপুরের আমঝুপি এ নীলকুঠি বাড়ি। কুঠিবাড়ির চৌহদ্দির ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় মূল ভবন। দক্ষিণমুখী মূল ভবনের সামনে রয়েছে বিশাল বারান্দা। বারান্দার সামনে সদর দরজার দুই পাশে ফুল বাগান। বাগানে ব্রিটিশ আমলের ফুলের সমারোহ নেই তবে অতীতের স্মৃতি নিয়ে দুটি নীলগাছ এখনো দাঁড়িয়ে আছে। এই দুটি গাছ পরবর্তীকালে লাগানো বলেই মনে হয়। মূল ভবনের অভ্যন্তরে রয়েছে মোট ১৫টি কক্ষ। কাঠের পাটাতন করা হলরুমে ডানদিকে ফায়ারপ্রেস। পিছনে ডাইনিং রুম। হলরুমটি কনফারেন্স হল এবং নাচঘর হিসাবে ব্যবহূত হতো বলে জানা যায়। মূল ভবনে রয়েছে মোট ৪টি সাজঘর এবং একটি সার্ভেন্ট কোয়ার্টার। অপেক্ষাকৃত সুশোভিত ঘরটি ব্যবহূত হচ্ছে ভিআইপি রুম হিসাবে। এ রুমটিতে রয়েছে মসৃণ মেঝে। সংলগ্ন বাথরুমে সাদা টাইলস যা প্রায় ২৬৬ বছরের পুরাতন। কাঠের আসবাবপত্রগুলোও সে আমলের ঐতিহ্য বহন করছে। কিন্তু অধিকাংশ দামি আসবাবপত্র ইতিমধ্যে খোয়া গেছে। মূল ভবনের ডান দিকে রয়েছে কবুতর রাখার একটি সুন্দর বাসা। জনশ্রুতি রয়েছে ব্রিটিশ বেনিয়ারা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কবুতর ব্যবহার করতো। কুঠিবাড়ি স্থাপত্য নকশা অনুযায়ী মূল ভবনের একটি সাজঘরের মেঝে থেকে পার্শ্ববর্তী নদী পর্যন্ত একটি সুড়ঙ্গ পথ ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। নীলচাষিদের ওপর নির্যাতন, অত্যাচার চালানোর পর সুড়ঙ্গ পথেই তাদের গুম করে দেয়া হত। এও জনশ্রুতি আছে এই নীলকুঠিতে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে উত্খাত করার জন্য রবার্ট ক্লাইভ ও মীর জাফর ষড়যন্ত্র করেছিল। আবার ২১৮ বছর পর বাঙ্গালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়েছিল এই আমঝুপি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে। ১৯৭৮ সালের ১৩ মে তত্কালীন খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আমঝুপি কুঠিবাড়িকে একটি পর্যটক কেন্দ্র হিসাবে হাতে নেয়া হয়। ১৯৭৯ সালের ২৬ মার্চ কুষ্টিয়ার তত্কালীন জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান ভূইয়া এ প্রকল্পের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করেন।