বাণিজ্য উন্নয়নে প্রয়োজন দাতাদের শর্তহীন সহায়তা

বাণিজ্যের উন্নয়নে দাতাদের সহায়তা শর্তহীন করতে হবে। শর্তযুক্ত সহায়তার বিরূপ প্রভাবে এর সুষ্ঠু ফল পাওয়া যাচ্ছে না। সহায়তার নামে দাতাদের চাপিয়ে দেয়া শর্ত পালনেই অধিকাংশ অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। তাছাড়া এ খাতে দাতাদের সহায়তাগুলোর তেমন কোন প্রভাব বাংলাদেশে নেই। তাই এ খাতে দেয়া অর্থগুলো সহজ শর্তে এবং শর্তহীন হতে হবে। গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ‘বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রজন্মে বাণিজ্যের জন্য সহায়তা’ শীর্ষক এক সংলাপের আয়োজন করে। সংলাপে অংশ নেয়া বক্তারা এ কথাগুলো বলেন। সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। প্রধান অতিথি ছিলেন ট্যারিফ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইন্সটিটিউটের সিইও (বিএফটিআই) ড. মুজিবুর রহমান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ড. তৌফিক আলী, বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় বিষয়ক অর্থনীতিবিদ ড. সঞ্জয় কাঠুরিয়া, সিপিডি’র সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রমুখ। ড. মুজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য দাতাদের সহায়তা কোন কাজে লাগেনি। সহায়তার নামে তারা তাদের মনোনীত পরামর্শক চাপিয়ে দেয়। এই সহায়তার প্রকল্পের অনেকেই প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার নামে বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত থাকেন। আমাদের পাট শিল্পের ধ্বংসই তার উদাহরণ। দাতাদের সমালোচনায় তিনি বলেন, উন্নয়নের নামে দাতা দেশগুলো তাদের দেশের অযোগ্য ব্যক্তিদের উন্নয়নীল দেশেগুলোতে পাঠায়। এ সব অযোগ্য লোক নিয়োগ দিয়ে কারিগরি সহায়তার টাকা ফিরিয়ে নিচ্ছে। তবে সবমময় যেমন দাতাদের পরামর্শ আমাদের দেশের উপযোগী নয় ঠিক তেমনি আমাদের নিজস্ব কিছু নীতি সহায়তা রয়েছে যেগুলো বাণিজ্যের উন্নয়নে সহায়ক নয় মন্তব্য করেন তিনি। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাণিজ্যের জন্য সহায়তা যতটুকু আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পেরেছে ততটুকু সামাজিক সক্ষমতা বাড়াতে পারেনি। দাতারা কারিগরি সাহায্যে নানা ধরনের শর্ত জুড়ে দেয়। দাতাদেশ থেকে পরামর্শক নিয়োগ বা ওই দেশের পণ্য বাধ্যতামূলক করে দেয়। এতে স্থানীয়ভাবে বৈদেশিক সহায়তা যথার্থ ব্যবহার হতে পারে না। এ সমস্যা দূর করতে সহায়তা শর্তহীন হতে হবে। পদ্মা সেতু নিয়ে টানাপোড়েনের ফলে দাতাদের নিয়ে বার্ষিক বৈঠক বিডিএফ (বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ফোরাম) এর নিয়মিত বৈঠক বন্ধ হয়ে গেছে। এ সরকারের যে সময় রয়েছে তাতে আর এ বৈঠক হওয়া সম্ভব নয়। এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে দাতাদের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মের উপযোগী করে বাণিজ্যনীতি গ্রহণ করতে হবে। শুধু অবকাঠামেরই নয়, বাণিজ্য বৃদ্ধিতে বন্দর, সমুদ্রযোগাযোগ ও ওয়্যার হাউজগুলোর উন্নতি করতে হবে। বৈদেশিক সাহায্য অবশ্যই শর্তমুক্ত হতে হবে। সঞ্জয় কাঠুরিয়া বলেন, দরিদ্র দেশে বাণিজ্য ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত এটা প্রকাশ করে যে, এদেশে অনেক বিনিয়োগ সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্যও বাণিজ্য বাড়ানো প্রয়োজন। দক্ষ শ্রমশক্তি তাদের মজুরি বৃদ্ধির জন্য দরকষাকষি করতে পারে। দেশের বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য সরকারের নীতি সহায়তার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক বাণিজ্য সচিব সোহেল আহমেদ চৌধুরী বিশ্বব্যাংকের সমালোচনা করে বলেন, পূর্বে দাতাদের অর্থ গ্রহণের অনেক মন্দ অভিজ্ঞতা রয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থ গ্রহণ করে দেখা গেছে এর অধিকাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে, তাদের নিয়োজিত পরামর্শকের পেছনে। বাণিজ্য উন্নয়নের জন্য সরকারকে বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন করতে বললেও বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব নিয়ম-কানুন মানতে গিয়ে অনেক কাজই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বাণিজ্যের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংককে বাদ দিয়ে ইউরোপীয় ইউনীয়নের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের তাগিদ দেন তিনি। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি সবুর খান বলেন, রপ্তানি বাড়াতে সরকার বিভিন্ন সময়ে নীতি প্রণয়ন করে থাকে কিন্তু এ ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কোন অংশগ্রহণ থাকে না। বর্তমানে ভারত ও চীনের সাথে বাংলাদেশের বড় আকারের বাণিজ্য ঘাটতি বিদ্যমান। এ ঘাটতি কমিয়ে আনতে সরকারের ও সংশ্লিষ্টদের আরো উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মূলপ্রবন্ধে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০০৬-২০১১ সাল পর্যন্ত অবকাঠামো উন্নয়নে বিশ্বে বাণিজ্যের জন্য সহায়তা (এএফটি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭৭ দশমিক ৯২ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ কমেছে।