নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা জরুরি

সরকারপ্রধান ও বিরোধীদলের নানামুখী কার্যকলাপ দেখে মনে হয় তাদের মনোজগতে এখনো সেকালের রাজা-বাদশাহ ও জমিদার ভাবটি বলবত্ আছে। দলগুলো নিজ নিজ প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য সেকালের দাম্ভিক রাজাদের মতো আপসহীনভাবে দাবি আদায়ে অহেতুক আন্দোলনের নামে দেশ ও দেশের অর্থনীতিকে অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরিশীলিত রাজনৈতিক চর্চা ও দলের ভেতর গণতন্ত্র নেই বললেই চলে। যদিও ’৯০-এ গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হবার পর ভাবা হয়েছিল দেশ থেকে প্রতিহিংসার রাজনীতি, দলীয় কুিসত বির্তক বন্ধ হবে, কিন্তু তা না হয়ে এখন হয়েছে এর উলটোটি। এদেশে ক্ষমতাসীন সরকারপ্রধানরাই ক্ষমতায় বসে মনে করেন তাঁদের হাতে ক্ষমতার রাজদণ্ডটি চিরস্থায়ী। আর এই ক্ষমতা চিরস্থায়ী করে রাখতেই তাঁদের যত কর্মপ্রচেষ্টা। এতে দেশ, সমাজ তথা জনগণের বিশেষ কী ক্ষতি হলো তা তাঁরা থোরাই কেয়ার করেন। আমাদের দুর্ভাগ্য দেশের রাজনৈতিক নেতারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলেন, সংবিধান সমুন্নত রাখার কথা ও সন্ত্রাস-দুর্নীতি দমনের কথা বলেন, কিন্তু বাস্তবে তাঁরা বাস্তবায়ন করেন না। কেননা তাঁরা ভালোভাবেই জানেন দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে তাঁদের ক্ষমতা চলে যাবে জনগণের হাতে। তাই তাঁরা চান না দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক এবং জনগণ ক্ষমতার মালিক হোক। তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত ও দলীয় পর্যায়ে ক্ষমতার প্রভাব ও বৈভব অর্জনের বাইরে ভালো কিছুর দিকে তাঁরা তেমন দৃষ্টি দেওয়ার সময় পান না, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কিন্তু আমরা মনে করি, রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে পুরো দেশ ও সমাজকে বদলে দেওয়া সম্ভব। তাঁরা চাইলে সকল প্রকার জঞ্জাল মুক্ত করে সুন্দর একটি দেশ গড়ে তুলতে পারেন। শুধু প্রয়োজন দলগুলোর গণতন্ত্রকে সফল করার বাসনা তথা সাংবিধানিক নিয়তান্ত্রিকতাকে বাস্তবায়িত করার জন্য দৃঢ় সংকল্প, জবাবদিহিতা, সৃজনশীল মন-মানসিকতা ও দেশপ্রেম। জাতীয় নির্বাচনের আর অল্প কিছুদিন বাকি থাকলেও দলগুলোর মধ্যে বিবদমান সমস্যা সমাধানের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সমঝোতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। নির্বাচন নিয়ে দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করলেও এখন পর্যন্ত যে যার জায়গায় অনড়। এখন পর্যন্ত সংসদকে সমস্যা সমাধানের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব হচ্ছে না। যে কোনো কিছুর বিনিময়েই হোক তাদের রাজ্যের দখলটা চাই-ই-চাই, না হলে যেন কঠিন অমানিশা তাদের জন্য অপেক্ষমান। বিরোধীদলগুলো দাবি আদায়ের নামে দেশ ও দেশের অর্থনীতিকে কঠিন এক অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের প্রতিহত করতে সরকারি দল মরিয়া। সেইকালের জমিদাররা প্রজাদের সঙ্গে যেমন আচরণ করতো বর্তমানে দলগুলো যেন ঐ ধারাটিই অব্যাহত রেখেছে। জমিদারদের স্বার্থে ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী ও তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদকারী প্রজাদের রাজকাচারিতে নিয়ে গিয়ে যেমন দোররা, চাবুক, জুতাপেটা বা লাঠিপেটা করে রাজ্য ছাড়া করা হতো তেমনি এখন নির্যাতনের পদ্ধতিগত কিছু পরির্বতনের কারণে জনগণের অর্থে পালিত সরকারি একশ্রেণির পেশাজীবীকে অবাধ লাইসেন্স দেওয়া হয় জনগণকে সাইজ করার জন্য! দেশের নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষায় যা মোটেও কাম্য নয়। দলগুলোর পক্ষে জনসমর্থন আদায়ে এহেন নোংরা দলাদলি, বির্তক ও রাজনৈতিক সংঘাত থেকে বিরত থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টিতে কাজ করাকেই অধিক শ্রেয় বলে মনে করি। এতে ঐ দলের পাশাপাশি দেশ ও জাতি উভয়ই উপকৃত হবে। দেশের মানুষ মনে করে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতির অগ্রগতির স্বার্থে রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে একে অপরের প্রতি আস্থা এনে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা অধিক জরুরি। এক্ষেত্রে দলগুলোকে একে অপরের প্রতি কুিসত ও নোংরা বিতর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা মনে করি সরকারি-বিরোধীদলের নেতাদের সদিচ্ছাই পারে গণতন্ত্রকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে এবং দেশে সংঘাতময় পরিস্থিতি রোধ করে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে। ঢাকা