বিষয় ডাক্তার-উকিলের ফি এবং মন্ত্রীর খেদোক্তি
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০১৩, ২০:৫৯
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক বলেছেন, যে রোগী একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সককে ৫০০ টাকা দিতে চান না, তিনি ৫০ হাজার টাকা খরচ করে উকিলের কাছে যান। আইনজীবীকে ফি দিতে গিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করেন না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। আ ফ ম রুহুল হকের কাছে প্রশ্ন ছিল, ব্যক্তিগত রোগী দেখার ক্ষেত্রে চিকিত্সকদের জন্য ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হবে কিনা? উত্তরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি মন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক হিসেবে একটা কথা বলতে চাই। বড় বড় আইনজীবীদের সামনে তো ৫০ হাজারের আগে দাঁড়াতে পারবেন না। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সককে ৫০০ টাকা দিতে সমস্যা হয়। যে রোগী এই টাকা ফি দিতে চান না, তিনিই আবার উকিলের কাছে গিয়ে ৫০ হাজার টাকা খরচ করেন।” স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, দরিদ্রদের জন্য সরকারি হাসপাতাল আছে। সেখানে বিনা মূল্যে চিকিত্সার ব্যবস্থা আছে। যার খরচ করতে অসুবিধা, তিনি সরকারি হাসপাতালে যেতে পারেন।
প্রভাবশালী সম্পদশালীরা নিতান্ত দায় না ঠেকলে সরকারি হাসপাতালে আসেন না। তাঁরা বিদেশে উন্নত চিকিত্সা নেন। এ দেশের চিকিত্সাসেবায় তাঁদের আস্থা নেই। এছাড়া তাঁদের জন্য অত্যাধুনিক প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ল্যাব ইত্যাদি তো রয়েছেই। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কোনো না কোনো সরকারি হাসপাতালের চিকিত্সক। সরকারি অফিসে চলে তাঁদের শুধু হাজিরা, বাদবাকি প্রাইভেট প্রাকটিস, কে কত টাকা কামাতে পারেন সে প্রতিযোগিতা চলে বাণিজ্যিকভাবে। এর একমাত্র কারণ কোথাও জবাবদিহিতা নেই। কাউকে কোথাও বদলি করলে রাজনৈতিক তদবির তো আছেই। ঘুরেফিরে বহাল তবিয়তেই থাকেন তাঁরা। তাঁদের অবহেলার কারণে দেশের বিশাল অঙ্কের টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে।
কোনো রোগী তার রোগ নিরাময়ে বা কষ্ট লাঘবের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে চাইলে প্রথমেই তাকে অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত অর্থ ফি প্রদান করতে হয়। দেশে সর্বোচ্চ আমলা একজন সচিবের মাসিক বেতন ৪০,০০০ টাকা হিসেবে দৈনিক এক হাজারের কিছু বেশি। একই দেশে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক তাঁর নিয়মিত চাকরির পর সন্ধ্যায় রোগী দেখে প্রতিদিন কমবেশি অতিরিক্ত ১০,০০০ টাকা ফি আদায় করেন। এটা জনপ্রতি ৫০০ টাকা হারে ২০ জন রোগীর কাছ থেকে দৈনিক আদায়। অনেকে ২০ জনেরও বেশি রোগী দেখে থাকেন। বাংলাদেশে মানুষের যে আয় তাতে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের সর্বোচ্চ আয়ের পরিমাণ বিবেচনা করলেও জনপ্রতি রোগী থেকে ১০০ টাকার বেশি নেওয়া অযৌক্তিক। চিকিত্সক তো মুনাফালোভী ব্যবসায়ী নন। অতিরিক্ত আয় যাঁদের জীবনের লক্ষ্য তাঁদের চিকিত্সাসেবা পেশায় না আসাই উচিত।
বাংলাদেশে দ্য মেডিকেল প্রাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেজিস্ট্রেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২ নামে একটি আইন আছে। যেখানে ডাক্তারদের প্রাইভেট প্রাকটিসের ক্ষেত্রে এবং প্রাইভেট ক্লিনিক স্থাপন ও পরিচালনায় সুস্পষ্ট নিয়ম প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইন অনুযায়ী কোনো সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত আছেন, এমন কোনো রেজিস্টার্ড চিকিত্সক অফিস চলাকালীন কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিক বা নার্সিং হোমে প্রাইভেট প্রাকটিস করতে পারবেন না এবং করলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। কিন্তু দেশের যত্রতত্র ক্লিনিক গড়ে উঠেছে এবং এর জন্য যথাযথ লাইসেন্স গ্রহণ করা হচ্ছে না। এসব ক্লিনিকে সংঘটিত অপরাধেরও বিচার হচ্ছে না। অপারেশনের ফিসসহ বিভিন্ন কারণে ভর্তি হওয়া রোগীদের কাছ থেকে কী পরিমাণ ফি নির্ধারণ করা হবে, তা এ আইনে উল্লেখ আছে, যা সচরাচর মানা হয় না। যেমন আইনে সিজারিয়ান অপারেশনের ক্ষেত্রে ৪০০ টাকা ফি নির্ধারণ করা থাকলেও বাস্তবে বহুগুণ বেশি আদায় করা হচ্ছে। এ আইনের ১৩ ধারায় বলা হয়েছে, এ অধ্যাদেশের বিধান লংঘন করা হলে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা। আইনে শাস্তির বিধান থাকলেও এর কোনো প্রয়োগ নেই বললেই চলে।
রোগীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই চিকিত্সক অনেক টেস্ট করাতে পরামর্শ প্রদান করেন। যদি ১০ রকম টেস্ট করানো হয়ে থাকে, তাহলে বেশিরভাগ টেস্টের ফলাফল থাকে নরমাল (স্বাভাবিক)। অর্থাত্ টেস্টে রোগীর কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। এতে সাধারণ মানুষের বদ্ধমূল ধারণা হয় যে, চিকিত্সকরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত টেস্ট করাতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে কেন তাঁরা রোগীদের অতিরিক্ত টেস্ট করাতে পরামর্শ প্রদান করেন? জবাব খুব সহজ, যখন কোনো রোগী চিকিত্সকের পরামর্শপত্র নিয়ে টেস্ট করানোর উদ্দেশে কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে উপস্থিত হন তখন রোগীর কাছ থেকে টেস্টের ন্যায্য চার্জের দ্বিগুণ আদায় করা হয় এবং পরামর্শ প্রদানকারী চিকিত্সকের নাম-ঠিকানা নোট করে রাখা হয়। পরে রোগীর কাছ থেকে আদায়কৃত চার্জের ৪০-৫০ শতাংশ গোপনে চিকিত্সককে দিয়ে আসা হয়। চিকিত্সকও নির্দ্বিধায় সে অর্থ গ্রহণ করেন। এটা কি রোগীদের সঙ্গে চিকিত্সকদের প্রতারণা বা দুর্নীতি নয়? সরকার চিকিত্সকদের পরামর্শ দিলে বা সতর্ক করলে এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব।
কুষ্টিয়া