প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না কাঁসা পিতলের তৈজস
মুন্না রায়হান, ধামরাই থেকে ফিরে
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০১৩, ২২:২৬
মেলামাইন সিরামিক প্লাস্টিক তৈজসপত্র ও গৃহস্থালী সামগ্রীর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না কাঁসা-পিতলের সামগ্রী
উত্তরবঙ্গের মহাস্থানকেন্দ্রিক সভ্যতার সাথে কাঁসা-পিতলের প্রচলন বলে মনে করেন অনেকে
ঢাকার ধামরাই এলাকায় ছিল কয়েক শ’ কারখানা। আজ রয়েছে মাত্র ৩টি
কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতল শিল্প। একসময় কাঁসা পেটানোর শব্দে দিনে-রাতে মুখর থাকতো যে গ্রাম। সে মুখরতা আজ মিলিয়ে গেছে। ছুটি হয়ে গেছে কারিগরদের।
সমপ্রতি সরেজমিনে ঢাকার ধামরাই ও শিমুলিয়াতে গিয়ে সে চিত্রই দেখা যায়। এখন সেখানে কাঁসা- পিতলের কারখানা খুঁজে পাওয়াই দায়। কিন্তু কেন এ অবস্থা?
কাঁসা-পিতল শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, এ শিল্পে প্রথম আঘাত আসে ’৪৭-এ বাংলাদেশ ভাগের সময়। এরপর আসে ’৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। তখন অনেক হিন্দু ব্যবসায়ী ও কারিগর ভারতে চলে যান। সর্বশেষ আঘাত আসে নব্বই-এর দশকে মেলামাইন, প্লাস্টিক, সিরামিক পণ্যের বহুল প্রচলন শুরু হলে। অপেক্ষাকৃত কম দামি এসব পণ্যের কাছে মার খায় দামি কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র। এছাড়া চাহিদামতো কাঁচামাল না পাওয়ার পাশাপাশি নেই সরকারের কোন সহযোগিতা। এই শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে, শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।
কাঁসা-পিতলের শুরু কখন
বাংলাদেশে কিংবা অবিভক্ত বাংলায় কাঁসা-পিতলের প্রচলন কখন, কিভাবে শুরু হয়েছিল তা নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এটি প্রাচীন সভ্যতার আমলে শুরু, যখন ব্রোঞ্জশিল্প ছিল। আবার অনেকেই এই শিল্পকে মহাস্থানগড় কেন্দ্রিক সভ্যতার সাথে সম্পৃক্ত বলে মনে করেন। ১৫৭৬-১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে মোঘল আমলে উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে কাঁসা-পিতলের ব্যবহার শুরু হয়। তখন এসব ধাতু দিয়ে ঢাল, তলোয়ার, তীর-ধনুক ইত্যাদি যুদ্ধসরঞ্জাম তৈরি করা হতো। ব্রিটিশ শাসন আমলেও এ শিল্পের প্রসার ঘটে এবং বাংলার ঘরে ঘরে এর ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেসময় ঢাকার ধামরাই, শিমুলিয়া ছাড়াও টাঙ্গাইলের কাগমারী, জামালপুরের ইসলামপুর, বগুড়ার শিববাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং-এ কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করে। এসময় এই এলাকাগুলো কাঁসা, তামা ও পিতলশিল্পের জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করে। কারখানার শিল্পী-কারিগররা তাদের সুনিপুণ হাতে কাঁসা-পিতল দিয়ে থালা, গ্লাস, কলস, পূজার ঘট, ঘণ্টা, গামলা, চামচ, বালতি, ডেগ, কড়াই প্রদীপ, বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, সঙ্গীত সাধনার যন্ত্র, খেলনা, ইত্যাদি তৈরি করতেন।
সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের গন্ডি পেরিয়ে...
টাঙ্গাইলের কাগমারীর কলস-এর সুনাম ছিল দেশজুড়ে। শুধু কি কলস অন্যান্য গৃহস্থলী ও ব্যবহার্য সামগ্রীর সুনাম দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছিল। ১৯৪২ সালে ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম শহরে সারাবিশ্বের হস্তশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে জামালপুরের কাঁসাশিল্পী প্রয়াত জগত্চন্দ্র কর্মকার শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসাবে স্বর্ণপদক লাভ করেন।
উপহার মানেই কাঁসা-পিতল
একসময় প্রায় প্রতিটি পরিবারে কাঁসা-পিতলের থালা-বাসনসহ বিভিন্ন জিনিস ব্যবহার করা হতো। বিয়ে-শাদীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র ছাড়া যেন ভাবাই যেত না। কিন্তু এখন সবই অতীত।
ধামরাই, শিমুলতলীতেই ছিল
কয়েকশ’ কারখানা
শুধু ঢাকার ধামরাই ও শিমুলতলীতেই ছিল কয়েকশ’ কারখানা। আর সেসব কারখানায় কাজ করত হাজার হাজার কারিগর। তাদের নিপুণ হাতে তৈরি জিনিসপত্র দেশের চাহিদা মিটিয়ে নিয়মিত বিদেশে রপ্তানি হতো। এখন ধামরাইয়ে আছে মাত্র তিনটি কারখানা। তা-ও চলে ধুঁকে ধুঁকে। ‘ধামরাই মেটাল ক্রাফ্ট’-এর স্বত্বাধিকারী সুকান্ত বণিক বলেন, আমাদের পাঁচ পুরুষের ব্যবসা কাঁসা-পিতলের জিনিসপত্রের। কিন্তু আজ এই শিল্প বিলুপ্তির পথে। এখন আর কাঁসা-পিতলের ব্যবহার্য জিনিসপত্র প্রায় চলেই না। তবে কাঁসা-পিতল দিয়ে তৈরি বিভিন্ন সৌখিন জিনিসপত্র, দেব-দেবীর মূর্তি ইত্যাদির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু কাঁচামালের অভাবে ও দাম বেড়ে যাওয়ায় তাও নিয়মিতভাবে তৈরি করা যায় না। কারিগরদের বসে থাকতে হয়। ভারতে কাঁসা-পিতল পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একই কথা জানিয়ে ‘ধামরাই মেটাল হ্যান্ডিক্রাফ্ট’-এর স্বত্বাধিকারী রাশেদা মোশারফ বলেন, মেলামাইন, প্লাস্টিক, সিরামিকের প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে টিকতে পারছে না অপেক্ষাকৃত দামি কাঁসা-পিতলের জিনিসপত্র। এছাড়া চাহিদামতো কাঁচামাল না পাওয়ার পাশাপাশি নেই সরকারের কোন সহযোগিতা।
তিনি বলেন, বিদেশিরা কাঁসা-পিতলের জিনিসপত্র কিনতে আসেন আমাদের কাছে। কিন্তু বিমানবন্দরে সেসব পণ্য পরীক্ষার নামে নানা ভোগান্তি হয়। অনেক সময় দেরি হচ্ছে দেখে সেটি রেখেই বিদেশিরা চলে যান। পুরাকীর্তি বলে সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে সেটি পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলে এ সমস্যা হতো না।
কাঁসা পেটানোর শব্দে আর
মুখরিত হয় না গ্রাম
ধামরাইয়ের ব্যবসায়ী ক্ষীতিশ ঘোষ বলেন, একসময় তার কারখানায় প্রায় ১শ জন শিল্পী-কারিগর কাজ করতেন। এখন ১০ থেকে ১৫ জন। তাও সারা মাস কাজ থাকে না। কারিগররা এখন অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এই কারখানার কারিগর শুকুর আলী বলেন, জীবন পার করলাম এই কাজ কইরা। কিন্তু কিছুই পাইলাম না। জীবনের মাঝ বয়সে এসে হিসেব মেলাতে পারছেন না কারিগর গৌরাঙ্গ পাল। আক্ষেপ করে বলেনঃ এখন আর কেউ এ পেশায় আসে না। আমরা যে কয়েকজন কারিগর আছি, তারা মরে গেলে আর কেউ কাঁসা পেটাতে আসবে না। হতাশ সাধন মন্ডল। যিনি প্রায় ৫০ বছর কাঁসা-পিতলের সাথে ঘর করার পর বাঁচার তাগিদে গত ৫/৬ বছর হলো ছেড়ে দিয়েছেন এ কাজ। এখন এলাকায় দিয়েছেন একটি মুদির দোকান। কিন্তু মন পড়ে থাকে কাঁসা-পিতলে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আমাদের প্রতিনিধি মো. তসলিমউদ্দিন জানান, দেশের উত্তর পশ্চিমের সীমান্তবর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী কাঁসাশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। কোনরকমে ধুঁকে ধুঁকে কতিপয় ব্যবসায়ী টিকিয়ে রেখেছেন শিল্পটিকে। শহরে বসবাসকারী বাসিন্দাদের মাঝে কাঁসা-পিতলের জিনিসপত্রের ব্যবহার নেই বললেই চলে। গ্রামে-গঞ্জেও ব্যবহার আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। অথচ এই জেলায় কাঁসা, পিতল ও তামার তৈজসপত্র প্রচলিত ছিল।
‘মধুমিতা বাসনালয়ের মালিক আব্দুল গফুর জানান, পুরাতন জাহাজের ভাংড়ির মধ্যে তামা, পিতল, দস্তা এবং ভরণ কাঁসাশিল্পের কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করা হয়। ওইসব ভাংড়ি অধিক মূল্যে বাজার থেকে খরিদ করতে হয়। ফলে কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র তৈরিতে খরচ পড়ে বেশি। এই কারণে মহাজনরা কাঁচামালের দুর্মূল্যের করণে এই পেশা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন এই শিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিকরা।