যখন একটি রাষ্ট্রের কিশোরদেরকে রাস্তায় নেমে আসতে হয়, নিরাপদ সড়কের দাবিতে তখন সত্যিই সড়কে সেই রাষ্ট্রটির মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ঠিক কতটুকু, সে বিষয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। সড়কে বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের জন্য একটি মৃত্যুও যখন হয়, তখন সেটিকে বলা উচিত হত্যা, দুর্ঘটনা নয়।
ঢাকায় সিটিং বাস নামে এক ধরনের অদ্ভুত যান চলে; সেটি নামেই সিটিং, জানালায় লাগানো স্টিকারে লেখা থাকে হাফ-পাস আর দাঁড়িয়ে যাত্রী নেওয়া নিষিদ্ধ; ছাত্রদের কাছ থেকে হাফ-পাস ঠিকই নেয় না, এটি নিষিদ্ধই থাকে; কিন্তু এ শহরে সিটিং বাসে লোকজন দাঁড় করে লোকাল বাস বানিয়ে নেওয়ার চিত্র নৈমিত্তিক। আর এই বাসগুলো বেশ বেপরোয়াভাবে চালানো হয়, কখনো কখনো ভ্রম হয়, আসলেই কী এটা একটি শহরের রাস্তা? নাকি রেসের ট্র্যাক? সিটিং বাস যে সিটিং বাস না, তা অবশ্য আমাদের পুলিশ সার্জেন্টরা দেখেন না, তাঁদের সামনে দিয়ে যখন বাস যায়, তখন ঠিকই বন্ধ থাকে বাসের গেট। ঢাকার রাস্তায় যাঁরা সিটিং বাস নামক যানে চলাচল করেন, তাঁরা আমার কথার সত্যতা নিশ্চয়ই এতক্ষণে যাচাই করে নিতে পেরেছেন। সরকারি বাস বিআরটিসিও অতিরিক্ত সময় স্টপেজে দাঁড়ায়, তুলতে থাকে একজন একজন করে যাত্রী।
উন্নত বিশ্বের মতো রাইড শেয়ারিং অ্যাপ আমাদের দেশেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। উবার আর পাঠাও রাইড শেয়ারিং অ্যাপের ব্যবহার দেখা যায় প্রতিনিয়তই। উন্নত বিশ্ব থেকে এই সেবাগুলো আমাদের দেশে এসেছে ঠিকই; কিন্তু তার মান কি ওইসব উন্নত দেশের মতো? রাইড শেয়ারিং অ্যাপে আমি চড়েছি বেশ কয়েকবার। গুগল ম্যাপস দেখে চালিয়ে যাত্রীর কাছে বা গন্তব্যে পৌঁছতে পারে না বেশিরভাগ রাইড শেয়ারিং অ্যাপের চালকরা। অথচ গুগল ম্যাপসের ব্যবহার জানা এই অ্যাপগুলো ব্যবহারেরই অংশ। কোনো কোনো চালক খুবই বেপরোয়া; বিশেষ করে মোটরবাইক সার্ভিসগুলোর চালকরা। যার ফলে ঘটা কিছু মৃত্যুও দেখতে পেয়েছি আমরা। আর এসব ক্ষেত্রে চালকের তথ্য দেওয়ার মাধ্যমে বা কোনোভাবে সহযোগিতাও করে না এই রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো; যা উঠে এসেছে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদনে। অনেক চালক শিক্ষানবিশ লাইসেন্স নিয়েও রাইড শেয়ারিং অ্যাপ চালান।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ অনাবাসিক। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য বাস সেবা দেওয়া হয়ে থাকে; কিন্তু এই বাসগুলোর পরিমাণ অপর্যাপ্ত; যার ফলে শিক্ষার্থীদের রীতিমতো বাদুড় ঝোলা হয়ে যেতে হয়। ফলশ্রুতিতে বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গে বলা চলে, এখানে বহিরাগত যান চলাচলের ফলে শিক্ষার পরিবেশ হুমকির মুখে।
আমাদের শহরের রাস্তায় একটা বড় সমস্যা হলো শব্দদূষণ। অপ্রয়োজনীয়ভাবে হর্ন বাজান চালকরা। এর ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে নাগরিকরা, বিশেষ করে শিশুদের ওপর এর প্রভাব মারাত্মক। হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট এলাকায় হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ হলেও সেখানেও এটি বাদ থাকে না। অথচ বহির্বিশ্বে, অনেক সভ্য সমাজে আমরা এভাবে অপ্রয়োজনে হর্ন বাজাতে দেখি না।
ওভারব্রিজ বা জেব্রাক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হওয়া একজন সচেতন নাগরিকের কর্তব্য; কিন্তু ঢাকার অনেক ওভারব্রিজই নেশাখোরদের দখলে। ঝুঁকি থাকে ছিনতাইয়েরও। তাই অনেক সময় নিয়ম মানতে আগ্রহী হলেও ওভারব্রিজ দিয়ে পার হতে ভয় পান সাধারণ মানুষ। ফলে মানুষগুলো যখন রাস্তা দিয়ে পার হয়, তখন তাদের পড়তে হয় জীবন নিয়ে ঝুঁকিতে।
মেট্রোরেল করছি; পদ্মা সেতুর মতো বৃহত্ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছি আমরা; কিন্তু সড়ক পথের এই সমস্যাগুলোর যদি সমাধান করা না যায়, তাহলে উন্নয়নের ফলে যে সুন্দর নাগরিক জীবন উপভোগ করা, তা সম্ভব হবে না পুরোপুরি। সিটিং বাস নামক এই ব্যবস্থাটির সংস্কার দরকার। সব ধরনের গণপরিবহনে ছাত্রদের জন্য থাকা চাই হাফ-পাসের ব্যবস্থা। কোনোভাবেই সিটিং নামধারী বাসগুলো যেন লোকাল বাস না হয়ে উঠতে পারে, সঠিক যাত্রীসেবা দেয়, সে ব্যাপারেও নজর রাখা দরকার। বেপরোয়া বাস বা গাড়ি চালনা রুখতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন পর্যবেক্ষণ এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ। কোনো বাস যেন অতিরিক্ত সময় স্টপেজে না দাঁড়াতে পারে, সেটিও পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা উচিত। রাইড শেয়ারিং অ্যাপ পরিচালনাকরী কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহিতার জায়গায় আনতে হবে। চালকদের যোগ্যতার জায়গাটিও যাচাই করে নিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানোর বিরুদ্ধে গড়তে হবে সামাজিক আন্দোলন। সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি চাই আইনের সঠিক প্রয়োগ। বাস্তবিকভাবে জাবালে নূর এবং সুপ্রভাতের মতো ঘাতকবাস কোম্পানিগুলো আর ফিটনেসবিহীন গাড়ি যেন রাস্তায় না চলতে পারে, সেটিও করা চাই নিশ্চিত। আর কখনো যেন আমাদের স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ভাইবোনদের রাস্তায় না নামতে হয় নিরাপদ সড়কের দাবিতে।
nলেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়