‘ত্রাণ চাই না,পানি সরাও’

‘আমাগি বাড়িঘর সব তলায় গেছে। আমাগি সব কিছু শেষ হয়ে গেছে। ঘরে খাবার নেই, থাকার জায়গা নেই, হাতে কোন কাজ নেই। ঠিকমতো পানিও জোটে না। তাও আমরা ত্রাণ চাই না, পানি সরাও’। বাড়ির পাশে কাঁচা রাস্তার ওপরে আশ্রয় নেয়া জিয়াউর রহমান সরদার নিজের ঘর গোছাতে গোছাতে এভাবেই জানান পানিবন্দী জীবনের দুর্দশার কথা। তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের কানাইদিয়া গ্রামে নিজের পাকা ঘর পানিতে ডুবে যাওয়ায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে উঠেছেন রাস্তায়। পলিথিনের ছাউনি দিয়ে বানিয়েছেন ঝুপড়ি। থাকার সমস্যা হওয়ায় স্ত্রী আর সন্তানদের পাঠিয়েছেন শ্বশুরবাড়ি। সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের কানাইদিয়া গ্রামের জিয়াউর রহমানের মতো অবস্থা এই ইউনিয়নের প্রায় দুই হাজার পরিবারের। এ এলাকায় অতি বৃষ্টিজনিত বন্যায় বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। ধসে গেছে কাঁচা বাড়িঘর। ভেসে গেছে কয়েক হাজার বিঘা চিংড়ি ঘের। এবার এ এলাকায় বিভিন্ন ফসলের ভালো ফলন হলেও কৃষকরা কিছুই ঘরে তুলতে পারেননি। বাড়িগুলো পানিতে ডুবে যাওয়ায় বহু মানুষ বাঁধের ওপর কিংবা অন্যত্র উঁচু স্থানে ঠাঁই নিয়েছেন। পিচঢালা সড়ক পুরোপুরি ডুবে আছে পানির নিচে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তালা উপজেলার প্রায় ২০ হাজার পরিবারের ৮০ হাজার মানুষ এখন পানিবন্দী। ফসলি, বাড়িঘর, মাঠঘাট— সব কিছু পানিতে ডুবে থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে বহু মানুষ। কাজ না থাকায় তিনবেলা ভাত জোটানো মুশকিল হয়ে পড়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামান্য পরিমাণ সাহায্য বিতরণ করা হয়েছে। এর পরিমাণ পরিবার প্রতি পাঁচ কেজি চালের বেশি নয়। তবে জলাবদ্ধ এলাকার মানুষ ত্রাণ চান না। পানি অপসারণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার দাবি তাদের। কানাইদিয়া বলাইর মোড়ে ডুবে থাকা পিচঢালা রাস্তার ওপর থাকে বেশ কিছু নৌকা। এ নৌকাগুলোই জলাবদ্ধ এলাকায় এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি, এগ্রাম থেকে ওগ্রামে যাওয়ার একমাত্র ভরসা। অনেকে কোমর কিংবা গলা পানি পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছায়। দূরের গ্রাম থেকে খাবার পানি আনা, লাকড়ি সংগ্রহ, দোকান থেকে সদাইপাতি আনা— সবই চলে এভাবে। কানাইদিয়ার জলিল গাজী বললেন, পর পর তিন বছরের জলাবদ্ধতায় আমার সব তলিয়ে গেছে। গাছ মরে যাচ্ছে। ফসল নষ্ট হয়েছে। আমরা ত্রাণ চাই না। পানি সরানোর ব্যবস্থা করুন। ঠিকঠাকভাবে কপোতাক্ষ খনন করলেই পানি সরে যাবে। পানি নেমে গেলে আমরাও বাঁচি। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, জলাবদ্ধ এলাকার বহু সড়ক পানিতে ডুবে আছে। একবাড়ি থেকে অন্য বাড়ি যেতে নৌকা অথবা সাঁকোই একমাত্র ভরসা। একদিকে পানি সরতে পারছে না। অন্যদিকে অবিরাম বর্ষণে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ শুধুই বাড়ছে। ডায়রিয়া, সর্দিকাশি, নিউমোনিয়া ছাড়াও বিভিন্ন রোগ দেখা দিলেও চিকিত্সার কোনো ব্যবস্থা নেই। তুলনামূলকভাবে নারী ও শিশুর দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জোয়ারের সঙ্গে আসা পলিমাটিতে ভরাট হয়ে গেছে কপোতাক্ষ নদ। এর তলদেশ এখন আশপাশের কৃষি জমি থেকে দুই-তিন ফুট উঁচু। স্লুইচ গেটগুলো বন্ধ। অতিবৃষ্টিতে পানি উপচে ভাসিয়ে দেয় বাড়িঘর ও ফসলি মাঠ। তিন বছর ধরে এ মৌসুমে বন্যা দেখা দিচ্ছে। অতিবৃষ্টির কারণে এবারের অবস্থা খুবই নাজুক। প্রায় দুই মাস আগে থেকে বিভিন্ন এলাকায় পানি জমতে শুরু করেছে। তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এম মফিদুল হক লিটু বলেন, ইউনিয়নের দুই হাজার পরিবার জলাবদ্ধতার মধ্যেই জীবন-যাপন করছেন। প্রায় তিন মাস ধরে পানি বেড়েই চলেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ত্রাণ হিসেবে সামান্য পরিমাণ চাল পাওয়া গেছে। এ মুহূর্তে সমস্যা সমাধানে নদী খনন ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ইতিমধ্যে জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ৪৫ মে.টন চাউল বিতরণ করা হয়েছে, আরো বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে। বরিশালে জলাবদ্ধতা বরিশাল অফিস জানায়, টানা বর্ষণে এখানকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে । গতকাল শনিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। নগরীরর প্রাণকেন্দ্র সদর রোড, গির্জা মহল্লা, ফজলুল হক এভিনিউ ও কাউনিয়া এলাকার প্রধান সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে স্কুল ও কলেজগামী শিক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টার দিকে নগরীর কাউনিয়া এলাকার মনষা বাড়ী রোডে একটি রিকশা ড্রেনে পড়ে চালকসহ তিনজন স্কুল ছাত্রী আহত হয়। এ রকম ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটেছে নগরীর পলাশপুর, বেলতলা, পোর্ট রোডসহ বিভিন্ন এলাকায়। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও পুলিশ ছাড়া সাধারন মানুষ খুব একটা ঘর থেকে বের হয়নি। অধিকাংশ মার্কেট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ। পিরোজপুরে জনজীবন অচল পিরোজপুর অফিস জানায়, গতকাল শনিবার দিনভর টানা বর্ষণে পিরোজপুরের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে গতকাল শনিবার ভোর থেকে মুষলধারায় বর্ষণ হয়। এর আগে গত শুক্রবার দিনভর বিরতিহীনভাবে টিপটিপ বৃষ্টি ঝরে। বিকালেও থেমে থেমে মাঝারি ও হালকা বৃষ্টিপাত হয়েছে। আকস্মিক লাগাতার বৃষ্টিপাতে মানুষ গৃহবন্দী হয়ে পড়ে। নিম্ন আয় ও দিনমজুররা ঘর থেকে বেরুতে না পারায় তাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। শহর ও গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল কম। দোকানপাটে বেচা-বিক্রি হয়নি। রিকশাসহ বিভিন্ন যান চলাচল ছিল খুবই কম। নদী অববাহিকা ও চরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে জোয়ার ও বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হয়ে আটকা পড়ে কয়েক হাজার মানুষ। সন্ধ্যায় তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় আবহাওয়ায় শীতের আমেজ পাওয়া যায়। স্বরূপকাঠিতে খেটে খাওয়াদের দুর্ভোগ স্বরূপকাঠি (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, স্বরূপকাঠিতে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সারাদিন অবিরাম বর্ষণে জন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনমজুরসহ খেটে খাওয়া মানুষ পড়েছে দুর্ভোগে। স্কুল-কলেজে উপস্থিতি ছিল সামান্য। হাট-বাজারে ক্রেতা ছিল অন্যদিনের তুলনায় অনেক কম। শীতকালিন সবজির ক্ষতি হয়েছে। কাঠালিয়ায় চলাচলে বিঘ্ন কাঠালিয়া (ঝালকাঠি) সংবাদদাতা জানান, কাঠালিয়ায় গত দু’দিনের অবিরাম বর্ষণে জনজীবন বিপর্যস্ত পড়েছে। রাত-দিন টানা বর্ষণে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত হওয়ায় মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। হঠাত্ বর্ষণের ফলে দিনমজুররা কাজ করতে না পারায় অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। চিংড়াখালী গ্রামের দিনমজুর শাহারুম জানান, বৃষ্টির কারণে দু’দিন ধরে কাজ করতে না পারায় স্ত্রী ও ৪ সন্তান নিয়ে অনাহারে দিন কাটাচ্ছি। মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ায় শাক-সবজির অনেক ক্ষতি হয়েছে। সাতক্ষীরায় জনজীবন বিপর্যস্ত সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, শুক্রবার বিকাল থেকে অতিবর্ষণে সাতক্ষীরার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শনিবার দুপুর পর্যন্ত ৫৫.৪ মিঃ মিঃ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অবিরাম বর্ষণে জেলার ৭টি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার বল্লী, ঝাউডাঙ্গা, মাছখোলা, শাল্যে, ঝুটিতলা, তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা, কুমিরা, ইসলাম কাটি, কানাইদিয়া, জেঠুয়া, কলারোয়া উপজেলার জালালাবাদ, ধানদিয়া, জয়নগরসহ আশাশুনি, শ্যামনগরও কালিগঞ্জের বেশ কিছু নিম্ন অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে শতাধিক ঘের,পুকুর ও জলাশয়। কমপক্ষে দুই হাজার হেক্টর জমির আমন ধান ও সবজির ক্ষেত নষ্ট হয়েছে।