শেষ ইচ্ছেটা পূরণ হল না মান্না দে’র
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০১৩, ২২:১৬
‘শুধু গান গেয়ে গেয়ে যেতে চাই। যেদিন গাইতে পারব না, সেদিন যেন এক মিনিটও বেঁচে না থাকি—ঈশ্বরের কাছে এটাই প্রার্থনা। গান গাইতে গাইতে চলে যেতে চাই। গানই তো আমার প্রাণ। সেটা চলে গেলে দেহের এই ভার নিয়ে বেঁচে থাকা যে কত যন্ত্রণার, কত কষ্টের—তা কি বলে বোঝানো যায়?’ কথাগুলো মান্না দে’র। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে কলকাতার এক পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাত্কারে নিজের শেষ ইচ্ছা এভাবেই প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তার শেষের কয়েকটা দিন কেটেছে বেঙ্গালুরুর এক হাসপাতালে। হাসপাতালের মুখপাত্র কে. বাসুকি বলেন, ‘প্রথম ধাক্কাটা উনি যেভাবে সামলে নিয়েছিলেন, তাতে আমাদের মনে হয়েছিল, এযাত্রা বিপদ মুক্ত। ভেন্টিলেশন খুলে নেয়া হল। উনি উঠে বসলেন। খুব বেশি কথা বলতেন না। তবে প্রায় সারাক্ষণ গান শুনতেন। কেরলের উত্সবের সময় কয়েকজন ডাক্তার এসে মান্না দে’র গাওয়া মালয়ম ভাষার গান তাকে মনে করিয়ে দেয়াতে উনি খুব খুশি হয়েছিলেন। আসলে উনি হাসপাতালেও গানে বুঁদ হয়ে থাকতেন।’
জীবনের শেষ অ্যালবাম করার একটা ইচ্ছা ছিল—কিন্তু সে ইচ্ছা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন গত ২৪শে অক্টোবর। স্ত্রী সুলোচনার স্মৃতিতে ৯৪ বছর বয়সেও এই অ্যালবাম করার জন্য বদ্ধপরিকর ছিলেন। অ্যালবামের শিরোনাম ঠিক করা হয়েছিল, ‘জানি আবার দেখা হবে’। সুলোচনার স্মৃতিতে গানগুলো লিখেছিলেন দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী। মান্না নিজেই সুর দিয়েছিলেন গান ক’খানির। মান্না দে বার বার বলতেন, ‘এই অ্যালবামটা না করে আমি মরব না।’
এতবড় শিল্পী হয়েও একটা আফসোস ছিল তার। তিনি মনে করতেন, বম্বেতে তাকে ততোটা সুযোগ দেয়া হয়নি। এক সাক্ষাত্কারে ফুটেও উঠেছে তার মনের এই বেদনার কথা। তিনি বলেছিলেন, ‘দেখেছি আমার গান হিট করেছে। দেদার রেকর্ড বিক্রি হচ্ছে। লোকের মুখে মুখে ফিরছে আমার গান। কিন্তু চলচ্চিত্র পরিচালক বা প্রযোজকরা আমাকে তাদের ছবিতে নিতে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না কখনো। আমি বঞ্চনার শিকার। নইলে আরো অনেক বেশি গানের রেকর্ড থাকতে পারত আমার। বাংলা গানের ক্ষেত্রে আমি সুরকার হিসাবে বঞ্চিত। বাংলা ছবির প্রযোজকরা আমাকে সুরকার হিসাবে বিশেষ সুযোগ দেননি। মনে হয়, আমার ওপর তারা সেভাবে ভরসা করতে পারেননি। আমার বিশ্বাস, আরো অনেক কিছু দেয়ার ক্ষমতা আমার ছিল।’ অথচ মান্না দে’র বাংলা গানে প্রথম পদচারণা সুরকার হিসাবে, গায়ক হিসাবে নয়। তিরিশের দশকে ‘বালুকা বেলায় অলস খেলায় যায় বেলা’ গানখানিতে সুর দিয়েছিলেন তিনি। এর আগে তিনি বাংলা গান রেকর্ড করেননি। গানখানি গেয়েছিলেন সে আমলের জনপ্রিয় শিল্পী সুপ্রীতি ঘোষ। সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সুপ্রীতি ঘোষ একবার বলেছিলেন, ‘আমার নতুন গান রেকর্ড হবে। শুনলাম সে গানখানিতে সুর দিয়েছেন প্রবোধচন্দ্র দে নামে কে একজন। এই নামে কাউকে তখন চিনতাম না। নতুন সুরকার। তাই বেঁকে বসলাম, প্রবোধচন্দ্র দে—সে আবার কে। আমি তার গান গাইব না। পরে আমাকে বলা হল যে, তিনি হলেন কৃষ্ণচন্দ্র দে’র ভাইপো। বয়স কম কিন্তু তার তালিম আছে। তাই শেষে রাজি হই। হিট করেছিল গানটি।’
ভবিষ্যত্ প্রজন্মের প্রতি তার উপদেশ সম্পর্কে মান্না দে বলেন, ‘রেওয়াজ। রেওয়াজটাই হল আসল। আমি প্রতিদিন সকালে উঠে ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করি। তারপর দুই ঘণ্টা রেওয়াজ। রেওয়াজের ব্যাপারে নো কম্প্রোমাইজ। যথার্থ গুরু পাওয়াও বড় ব্যাপার। আমি আমার কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দের পায়ের কাছে সে গান শিখেছি। তারপর শিখেছি আমান আলি খান, আবদুর রহমান খান, দবীর খান, গুলাম মুস্তাফা খানের কাছে। এরাই আমার প্রেরণা।