বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
পড়া উপলব্ধি করার মধ্যেই আনন্দ
ড. উত্তম কুমার দাশ, শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ, এনসিটিবি
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:২২
আগামী ৪ নভেম্বর তোমাদের জেএসসি পরীক্ষা শুরু। প্রত্যাশা করছি ইতোমধ্যে তোমরা প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছো। এখন আর আগের মতো নোট বা গাইডবই মুখস্থ করে তোমাদের পরীক্ষার হলে যেতে হয় না। পাঠ্যবইটি ভালো করে পড়ে গেলেই পরীক্ষায় ভালো করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে তোমার শ্রেণি ও বিষয় শিক্ষকের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। বিষয় শিক্ষকের শ্রেণির কার্যক্রম সৃজনশীল হলে তোমরাও সৃজনশীল হয়ে গড়ে উঠবে। তাছাড়া তোমাদের পাঠ্যবইটি পড়ার সময় বিষয়বস্তুর প্রতিটি অংশের বক্তব্য ভালোভাবে বুঝে পড়তে হবে। জীবনের সাথে মিলিয়ে পড়তে হবে। আসলে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু পড়া এবং উপলব্ধি করার মধ্যেই আনন্দ।
এবার আমরা জানব পরীক্ষায় কীভাবে ভালো করবো। পরীক্ষায় দু’ধরনের প্রশ্ন থাকে। প্রশ্নের একটি ধরণে আমরা চারটি বিকল্প উত্তর থেকে সঠিক উত্তরটি নির্বাচন করি এবং অন্য ধরনটিতে আমরা উদ্দীপক বা প্রশ্নের সূচনায় একটি বক্তব্য থাকে এটি ভালোভাবে পড়ে চারটি- ক, খ, গ এবং ঘ-এর উত্তর প্রদান করি। এ উভয় ধরনের প্রশ্নেই সৃজনশীল অংশ রয়েছে। তোমাদের পরীক্ষায় দু’ধরনের প্রশ্নপত্র থাকে। বহুনির্বাচনী এবং সৃজনশীল।
বহুনির্বাচনী প্রশ্নপত্রে তিন প্রকারের প্রশ্ন থাকে- সাধারণ বহুনির্বাচনী, বহুপদী সমাপ্তিসূচক এবং অভিন্ন তথ্যভিত্তিক। একটু খেয়াল করলে সহজেই বুঝতে পারবে। সাধারণ বহুনির্বাচনীর অধিকাংশ প্রশ্নই স্মৃতিনির্ভর। অর্থাত্ তোমরা মুখস্থ করে এ প্রকারের প্রশ্নের উত্তর করতে পারবে। তোমরা পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুর মধ্যে সংজ্ঞা, ধারণা, তত্ত্ব, তথ্য, সূত্র, নীতি, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া, বিধি, ধারা, লেখকের নাম, জন্ম, মৃত্যু, রচনা প্রভৃতি মুখস্থ করেছো এগুলোই এ প্রশ্নের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। ৪০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্নপত্রের সেটে এ ধরনের প্রশ্ন থাকে ১৬টি। তাই তোমরা এ ১৬টি প্রশ্নের উত্তর সহজেই করতে পার।
বহুপদী সমাপ্তিসূচক প্রশ্নের মাধ্যমে তোমরা মুখস্থ করার পাশাপাশি কতটুকু বুঝে পড়েছিলে তা এ প্রশ্নে মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। অর্থাত্ এ প্রশ্নের মাধ্যমে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত সংজ্ঞা, ধারণা, তত্ত্ব, সূত্র, নীতি, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া, বিধি, ধারা, মূল বক্তব্য, উক্তি প্রভৃতি কতটুকু মুখস্থ করার সাথে বুঝে পড়েছো তা যাচাই করা হয়। এ প্রশ্নের উত্তর করার সময় তোমরা ভালো করে অসমাপ্ত বাক্যটির সাথে সম্পর্কিত তথ্য বা বাক্যাংশটি পড়বে। এখানে একটি বা দু’টি বা তিনটি তথ্যই সঠিক হতে পারে। খুব সাবধানে এ প্রশ্নটির উত্তর করবে। একটি বহুনির্বাচনী প্রশ্নপত্রে এ প্রকারের প্রশ্ন ৪-৬টি থাকতে পারে।
সাধারণ বহুনির্বাচনী প্রশ্নের মাধ্যমেও তোমার পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত সংজ্ঞা, ধারণা, তত্ত্ব, সূত্র, নীতি, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া, বিধি, ধারা, মূল বক্তব্য, উক্তি প্রভৃতি বোঝা বা অনুধাবন করার ক্ষমতা পরিমাপ করা যেতে পারে। বহুনির্বাচনী প্রশ্নপত্রের মধ্যে এ ধরনের প্রশ্ন থাকে। তাই বুঝে পড়লে এ প্রশ্নের উত্তর তোমরা সহজেই দিতে পারবে। প্রশ্নপত্রে এ প্রকারের প্রশ্ন ৬-৮টি থাকতে পারে। সুতরাং অনুধাবনের প্রশ্ন থাকে মোট ১২টি এবং প্রশ্নের উত্তরও অনেকটা সহজ। বহুনির্বাচনী প্রশ্নপত্রে অভিন্ন তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন থাকে। প্রশ্নের শুরুতে একটি ভূমিকা উপাদান বা উদ্দীপক থাকে। এ ভূমিকা উপাদান বা উদ্দীপক অবশ্যই তোমার পঠিত বিষয়বস্তুর ধারণা, তত্ত্ব, সূত্র, নীতি, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া, বিধি, ধারা, মূল বক্তব্য, উক্তি প্রভৃতির সাথে সম্পর্কিত হবে। এটি প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে প্রশ্ন প্রণেতা কোন ঘটনা, চার্ট, ছবি, সারণি, উক্তি প্রভৃতি উপস্থাপন করেন। এর মধ্যেই তোমার পঠিত বিষয়বস্তুর সম্পর্ক রয়েছে। এটি দেখে ভয় পাবার কিছু নেই। ভালো করে পড় এবং তোমার পঠিত বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা কর। অবশ্যই তুমি তোমার পঠিত বিষয়বস্তুতে যা বুঝে বুঝে পড়েছো তার সাথে সম্পর্ক খুঁজে পাবে। অর্থাত্ তোমার বোঝা বা অনুধাবন করা বিষয়বস্তুর ধারণা, তত্ত্ব, সূত্র, নীতি, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া, বিধি, ধারা, মূল বক্তব্য, উক্তি প্রভৃতির সাথে একটা সম্পর্ক খুঁজে পাবে। যে সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছো তা তোমার প্রশ্নের উত্তরে উপস্থাপন কর। এখানেই তোমার বোঝা বিষয়বস্তুর অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ হয়ে যাবে। এ প্রশ্নটিই প্রয়োগমূলক। তোমরা নিশ্চিত থাক যদি সঠিকভাবে বিষয়বস্তু বুঝতে পার তবে অবশ্যই প্রয়োগ করতে পারবে। প্রশ্নপ্রত্রে এ দক্ষতার যাচাইয়ের প্রশ্ন থাকে ৮টি।
অভিন্ন তথ্যের উপর ভিত্তি করে তোমাকে আবার পঠিত বিষষবস্তুর আলোকে প্রশ্নের চাহিদা মোতাবেক মতামত বা সিদ্ধান্ত দিতে হতে পারে। কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ বা নতুন কিছু সৃষ্টি করতে হতে পারে। প্রশ্নের এ স্তরটিও জটিল কিছু নয়। তুমি যদি তোমার স্মৃতিতে ধারণ করা তত্ত্ব, সূত্র, নীতি, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া, বিধি, ধারা, মূল বক্তব্য প্রভৃতি প্রয়োগ করতে পার তাহলে এ প্রশ্নের উত্তরও তোমার কাছে সহজ। এ প্রশ্নকে বলা হয় উচ্চতর দক্ষতার প্রশ্ন। প্রশ্নপত্রে এ দক্ষতা যাচাইয়ের প্রশ্ন থাকে ৪টি। অভিন্ন তথ্যের উপর ভিত্তি করে সাধারণত ৪টি প্রয়োগ ও ৪টি উচ্চতর দক্ষতার প্রশ্ন করা হয়। তাহলে বহুনির্বাচনী প্রশ্নপত্রে ১৬টি জ্ঞান, ১২টি অনুধাবন, ৮টি প্রয়োগ এবং ৪টি উচ্চতর দক্ষতার প্রশ্ন থাকে। সবগুলো মিলে মোট ৪০টি প্রশ্ন থাকে।
সৃজনশীল প্রশ্নের শুরুতে একটি ভূমিকা উপাদান বা উদ্দীপক থাকে। এ ভূমিকা উপাদান হতে পারে একটি ঘটনা, ছবি, চার্ট, সারণি প্রভৃতি। এটি ভাল করে পড়বে এবং তোমার পঠিত বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করবে। এটি এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে যাতে তোমার পঠিত বিষয়বস্তুর প্রতিফলন এর মধ্যে লুক্বায়িত রয়েছে। তবে এটির মধ্যে কোন উত্তর খুঁজে পাবে না। উত্তরের একটা ইঙ্গিত পাবে। প্রশ্নের এ অংশের সাথে চারটি প্রশ্ন- ‘ক, খ, গ এবং ঘ’ সংযুক্ত থাকে। ‘ক’-প্রশ্নটি তোমরা পাঠ্যবই থেকে যা মুখস্থ করেছো তাই লিখবে। এ প্রশ্নের মাধ্যমে তোমার স্মৃতিতে ধারণ করার দক্ষতা পরিমাপ করা হয়। প্রশ্নে যা চাওয়া হয়েছে তাই লিখবে। অতিরিক্ত কোনো কথা লিখবে না। সঠিকভাবে লিখলে এ প্রশ্নে ১ নম্বর পাবে। ‘খ’- প্রশ্নটির মাধ্যমে তোমার বুঝে লেখার দক্ষতা পরিমাপ করা হয়। সুতরাং তুমি যা স্মৃতিতে ধারণ করেছ বা মুখস্থ করেছ তা নিজের মতো করে গুছিয়ে লিখবে। এ প্রশ্নের উত্তর করার ক্ষেত্রে তোমরা প্রথমে মুখস্থ করা অংশটুকু লিখবে, পরে এর উপর ভিত্তি করে যা বুঝেছো তাই লিখবে। এ প্রশ্নের নম্বর ২।
১ পাবে মুখস্থ করা অংশটুকু লিখলে এবং বাকি ১ পাবে মুখস্থ করা অংশ নিজের মতো করে গুছিয়ে লিখলে। একটি সৃজনশীল প্রশ্নের জন্য ১০ নম্বর থাকে এবং উত্তর করার জন্য ২২ মিনিট সময় পাবে। উদ্দীপক পড়া এবং বোঝার জন্য সময় লাগবে। সুতরাং ‘ক’ এবং ‘খ’-অংশের উত্তরের জন্য তোমরা সর্বোচ্চ ৫-৭ মিনিটের বেশি সময় ব্যয় করবে না।
সৃজনশীল প্রশ্নের ‘গ’ এবং ‘ঘ’ এর মাধ্যমে তোমাদের পঠিত বিষয়বস্তুর প্রয়োগ এবং উচ্চতর দক্ষতা পরিমাপ করা হয়। এ ক্ষেত্রে তোমরা উদ্দীপকটি ভালোভাবে পড়বে এবং পঠিত বিষয়বস্তুর সাথে কোন ক্ষেত্রে সম্পর্ক রয়েছে তা বুঝতে হবে। তোমরা যা পড়েছো এর বাইরের কিছু থাকবে না। ‘গ’ অংশের উত্তর করার সময় প্রশ্নে যা চাওয়া হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে তোমার পঠিত বিষয়বস্তুর মুখস্থ অংশটি লিখবে। পরে মুখস্থ অংশটি তোমার নিজের মতো করে বুঝিয়ে লিখবে। এর পরে উদ্দীপকে যা চাওয়া হয়েছে তার সাথে তোমার পঠিত বিষয়বস্তুর সম্পর্ক স্থাপন করে উত্তর উপস্থাপন করবে। অর্থাত্ তোমরা বিষয়বস্তু পড়ে যা বুঝেছ তার সঠিক প্রয়োগ করতে পারো কিনা তা যাচাই করা হয় এ প্রশ্নের মাধ্যমে। সুতরাং এ প্রশ্নের উত্তরে ৩টি অংশ -জ্ঞান, অনুধাবন এবং প্রয়োগ। প্রতিটি অংশের সঠিক উত্তরের জন্য ১ নম্বর করে মোট ৩ নম্বর পাবে। তিনটি অংশ ধাপে ধাপে লিখতে হবে না। তোমাদের নিজেদের মতো করে সাজিয়ে লিখলেই চলবে। এ প্রশ্নটির উত্তর করতে ৬-৭ মিনিটের বেশি সময় ব্যয় করো না। সৃজনশীল প্রশ্নের ‘ঘ’- অংশের উত্তর করার সময় উদ্দীপকটি মাথায় রাখতে হবে। প্রশ্নের চাহিদার সাথে উত্তরের সম্পর্ক থাকতে হবে। এ প্রশ্নটির মাধ্যমে তোমাদের বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করার দক্ষতা পরিমাপ করা হয়। এ প্রশ্নের উত্তরের ক্ষেত্রে তোমরা উদ্দীপকটি ভালো করে পড়বে এবং প্রশ্নের চাহিদা বুঝবে। তারপরে এ প্রশ্নের চাহিদা অনুযায়ী স্মৃতি বা মুখস্থ অংশ লিখবে, মুখস্থ অংশটি নিজের মতো করে গুছিয়ে লিখবে এবং প্রশ্নের চাহিদা অনুযায়ী অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ করবে। এ ক্ষেত্রে উদ্দীপকের প্রসঙ্গের সাথে প্রশ্নের চাহিদার মিল থাকতে হবে। পরবর্তী সময়ে বিশ্লেষণ করে নিজের মতামত প্রদান করবে। এ প্রশ্নের উত্তরে ৪টি ধাপ- জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ এবং বিশ্লেষণ/ মূল্যায়ন/ সৃষ্টি করা। প্রতিটি ধাপে ১ নম্বর করে মোট ৪ নম্বর। এ চারটি অংশ ধাপে ধাপে লিখতে হবে না। তোমাদের নিজেদের মতো করে সাজিয়ে লিখলেই চলবে। এ প্রশ্নটির উত্তর করতে ৬-৭ মিনিটের বেশি সময় ব্যয় করো না। তোমরা প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে লিখলে সৃজনশীল প্রশ্নের অংশে ৬০ এর মধ্যে ৬০ পাবে। বহুনির্বাচনী প্রশ্নে ৪০ এর মধ্যে ৪০ পেলেই ১০০ পেয়ে যাবে। সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর অনুশীলনে পারদর্শী হয়ে উঠলে দেখবে নতুন সৃষ্টির আনন্দে মেতে উঠেছো।