নারী পরিচালকদের কাজ নিয়ে প্রদর্শনী

চলচ্চিত্র পরিচালনা এবং নির্মাণ বেশ চ্যালেঞ্জিং এবং সৃজনশীল একটি কাজ। পশ্চিমা দেশের নারী পরিচালকরা যেখানে চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ পুরস্কার একাডেমী অ্যাওয়ার্ড তথা অস্কার জয় করছেন সেখানে আমাদের নারীরা দেশীয় সিনেমার মান বিচারে ভালোই করছেন বলে মনে করেন সিনেমা বোদ্ধারা। তবে সাধারণ দর্শকের মাঝে দেশের নারী পরিচালকদের সেই পরিচিতি নেই। নিজেদের কাজ প্রদর্শনের জন্য নারী পরিচালকদের নিজেদের যেমন নেই কোনো প্রচারযন্ত্র বা প্রচারের বিশেষ পরিকল্পনা তেমনি আমাদের দেশের কারো পক্ষ থেকে নারী পরিচালকদের পাশে দাঁড়ানোর কোনো উদ্যোগ এর আগে দেখা যায়নি। তবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এবং ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি এবার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে নারী পরিচালকদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্টও তুলে দেয়া হয়। মূলত আমাদের দেশীয় নারী পরিচালকদেরকে সম্মাননা দেয়ার জন্য নিজেদের জায়গা থেকে ওই সংগঠন দুটি এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান, ‘ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক বেলায়াত হোসেন মামুন। এটি বাংলাদেশের নারী নির্মাতাদের নিয়ে প্রথম উত্সব। এর আগে আমার জানা মতে এমন উদ্যোগ আর নেয়া হয়নি। চলচ্চিত্র পরিচালনা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। এর জন্য প্রয়োজন সৃষ্টিশীলতা। আমাদের পুরুষশাসিত সমাজেও যেখানে পুরুষরা এই পেশায় এসে টিকতে পারছেন না সেখানে অনেক নারী তাদের সৃজনশীলতা নিয়ে আমাদেরকে সুন্দর সুন্দর কাজ উপহার দিয়ে চলেছেন। সেই সত্তুরের দশক থেকে। কিন্তু আমরা তাদের খোঁজ রাখি না বা তাদেরকে একটু আলাদা করে সম্মান জানাই না। এই চিন্তা থেকেই আমরা প্রদর্শনীটির আয়োজন করি।’ নারী নির্মাতাদের চলচ্চিত্র নিয়ে এই প্রদর্শনীটি আয়োজনের পর কেমন সাড়া পড়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যে পরিমাণ সাড়া পড়েছে তাতে আমরা খুবই খুশি। প্রতিদিন শত শত দর্শক এসেছেন। চলচ্চিত্র উপভোগ করেছেন। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের নারী নির্মাতাদেরকে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে পেরেছি।’ এই প্রদর্শনীতে চলচ্চিত্র নির্মাতা শামিম আখতারের ‘সে’ এবং ‘শিলালিপি’ এই দুটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘সে’ চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন শামিম আখতার এবং প্রয়াত পরিচালক তারেক মাসুদ। দীর্ঘদিন চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন শামিম আখতার। সেই সুবাদে তারেক মাসুদের সাথে তার পরিচয়। সাংবাদিকতা পেশার সাথে জড়িত থাকলেও নিজের কাজের বাইরে শুধু শখের বশে এবং ভালো লাগা থেকেই পরিচালনায় এসেছেন এই নারী নির্মাতা। ২০০১ সালে প্রথম নিজের পরিচালনায় চলচ্চিত্র বানান তিনি। তিনিও মানছেন নারীদের জন্য পরিচালনা করা বেশ কঠিন একটি কাজ, নারী হিসেবে আমি কাজে বিভিন্ন সময় নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। তবে তাতে দমে না গিয়ে আরো উদ্যম নিয়ে এগিয়ে গিয়েছি। এই নারী পরিচালক একাধারে সাংবাদিক, নারী আন্দোলনের কর্মী, মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন এবং চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। তিনি মনে করেন, আমাদের দেশের নারী পরিচালকদের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে যথেষ্ট। এই দিকটাতে সংশ্লিষ্টদের আরো দৃষ্টি দেয়ার উপর গুরুত্ব দেন তিনি। কথা হলো আরেক নারী নির্মাতা রেশমি আহমেদের সাথে। এই প্রদর্শনীতে তার পরিচালিত ‘আমার প্রতিবাদ’ এবং ‘দিপান্বিতা’ এই দুটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মাণের বুনিয়াদটা তিনি ছোটোবেলাই পরিবারের কাছ থেকেই পেয়েছেন। স্টেজে পারফর্ম করতেন অনেক আগে থেকেই। সেই থেকে শুরু। আর এ নিয়ে পরিবারের কাছ থেকে কখনো কোনো বাধার সম্মুখীন তো হনইনি; বরং উত্সাহই পেয়ে এসেছেন, আমার দাদি এবং মা শিক্ষিত ছিলেন। তাই আমাদের পরিবারে অনেক আগে থেকেই নারীদেরকে কাজের ব্যাপারে উত্সাহ দেয়া হতো। পরিবারের কাছ থেকে যতোটুকু সমর্থন পাওয়ার দরকার ছিল তা আমি পেয়েছি। মূলত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর ভর করেই এই নারী নির্মাতা চলচ্চিত্র বানিয়ে থাকেন। আশির দশকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে থাকতেন। সেখানে দেখেছেন আমাদের দেশের স্বাধীনতা বিরোধী চক্র কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। আর এটা দেখে জিদ চেপে বসে তার উপর। সিদ্ধান্ত নেন, এই অপপ্রচার ঠেকাতে হবে। আর তার জন্য হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন ডকুমেন্টারিকে। প্রথমে অন্যের কাছ থেকে ক্যামেরা ধার করে ডকুমেন্টারি বানাতেন। এরপর নিজে একটি ক্যামেরা কেনেন। তারপর চলেছে আপন গতিতে পথচলা। তরুণ প্রজন্মের অনেক নারী পরিচালনায় আসছে এবং তারা এই পেশার চ্যালেঞ্জকে ভালোভাবে মোকাবিলা করছে বলে মনে করেন তিনি। তবে তরুণদেরকে এই পেশায় আসার আগে নিজেকে ভালোভাবে প্রস্তুত করে নেয়ার উপর জোর দেন তিনি, আমাদের দেশে নারীর জন্য পথচলাটা একটু কঠিন। তবে যোগ্যতার উপরে কোনো কিছু নেই। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং প্যাশন থাকলে নারীদের পিছিয়ে থাকতে হবে না। আর নারী বলে ঘরের কোণে বসে না থেকে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে, পরিশ্রম করতে হবে। তাহলে সফলতা ধরা দেবেই। নারী হোক কিংবা পুরুষ হোক; সফলতার জন্য পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। এই নারী নির্মাতা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান। নারী নির্মাতাদের এই প্রদর্শনী প্রথম পর্যায়ে শুধু ঢাকাতে হলেও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এবং ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি উদ্যোগ নিয়েছে তাদের এই প্রদর্শনীটি সারা দেশের বাকি ছয়টি বিভাগেও নিয়ে যাবেন। বাকি ছয়টি বিভাগে এই প্রদর্শনী চলতি বছরেই হবে হলে জানান, বেলায়াত হোসেন মামুন। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের গুটিকয়েক নারী নির্মাতাকে হয়তো আমরা চিনি। তাদের কাজ সম্পর্কে হয়তো টুকটাক ধারণাও রাখি। কিন্তু হলফ করে বলা যায়, আমাদের দেশের কোনো সিনেমা বোদ্ধাই অধিকাংশ নারী নির্মাতার নাম বা তাদের কাজ সম্পর্কে জানেন না। তাই মানুষের কাছে নারী পরিচালকদেরকে এবং তাদের কাজগুলোকে পরিচিত করিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এবং ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।