ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ। ‘১৩০ কোটি’ জনসংখ্যার দেশে ভোটার ৯০ কোটি। বড় দেশ, বিপুল জনসংখ্যা, অসংখ্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী, সব কিছুর বিচারে ভারতের লোকসভার নির্বাচন যেন এক বিরাট মহাযজ্ঞ। যে কারণে একদিনে নয় বরং সাত দিনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। ৫৪৩ আসনের একটি বাদে সব আসনে ভোটগ্রহণ সমাপ্ত হয়েছে গতকাল। এ সময়ের মধ্যে ঘটে গেছে বহু ঘটনা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের তিক্ত বাগযুদ্ধও।
৫৪৩ আসনের লোকসভায় সরকার গঠন করতে কোনো দল বা জোটের কমপক্ষে ২৭২টি আসন প্রয়োজন হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ২৮২ আসনে জয় পেয়েছিল। আর বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছিল ৩৩৯ আসন। সেখানে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট পেয়েছিল মাত্র ৬০টি আসন। গতবারের সাফল্যের ওপর ভর করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে মরিয়া বিজেপি। তবে শেষ পর্যন্ত তাদেরকে কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলছে বিভিন্ন এলাকার শক্তিশালী কিছু আঞ্চলিক দল এবং পুনরুজ্জীবিত হওয়া প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস।
নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই বিভিন্ন দলের নেতাদের কথার যুদ্ধে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও তিক্ততার আভাস পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে কুকথা আর ব্যক্তিগত আক্রমণের যে তীব্রতা দেখা গেছে, এর আগে ভারতে আর কোনো নির্বাচনে তা হয়নি। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতাদের এতো কটাক্ষ, পরস্পরকে তাচ্ছিল্যের এমন প্রবণতাও দেখা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে গণতন্ত্রের কড়া থাপ্পর মারতে চেয়েছেন। তার এই বক্তব্য সব সীমা লঙ্ঘন করেছে বলে অনেকেই সমালোচনা করেছেন।
এবারের নির্বাচনে নেতাদের অনেক বক্তব্য হাসির খোরাক যুগিয়েছে, মানুষকে অবাক করেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে দাবি করেন, ১৯৮৭-৮৮ সালে তিনি ‘ডিজিটাল ক্যামেরা’ ব্যবহার করেছিলেন। ভারতে একমাত্র তার কাছেই ওই ক্যামেরা ছিল। সে সময় তিনি ই-মেইলও ব্যবহার করতেন।
নানা অভিযোগ, বিক্ষিপ্ত সহিংসতার মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ পর্ব শেষ হয়েছে। আগামী ২৩ মে ভোট গণনা হবে। পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পেতে একদিন দেরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছেন, তার দল বিজেপি একাই তিনশর বেশি আসনে জয় পাচ্ছে। বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই ক্ষমতায় আসছেন তিনি। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে কাজ শুরু করবেন বলে শুক্রবার প্রথমবারের মতো সাংবাদিক সম্মেলনে হাজির হয়ে জানান।
অন্যদিকে নির্বাচনের শেষ প্রান্তে এসে কংগ্রেসসহ বিরোধীদলগুলো ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত শনিবার অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইড়ু দিল্লিতে সাক্ষাত্ করেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর সঙ্গে। মহাজোট গড়তে সেদিনই তিনি উত্তর প্রদেশের বিএসপি নেত্রী এবং সমাজবাদী পার্টির নেতার সঙ্গে কথা বলেন। এছাড়া বিজেপি বিরোধী দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন তিনি। মনে করা হচ্ছে, ক্ষমতাসীন এনডিএ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে বিরোধীদের ভূমিকা কী হবে, তা ঠিক করতেই জোরদার আলোচনা চালাচ্ছেন তিনি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও বিজেপি একক বৃহত্তম দল হিসেবে যাতে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা না পায়, তা নিশ্চিত করতেই বিরোধী দলগুলোকে এক সূত্রে গাঁথতে চাইছেন তিনি।
শুধু চন্দ্রবাবু নন, তত্পরতা দেখা যাচ্ছে অন্য বিরোধী দলগুলোতেও। কংগ্রেস এবং বিজেপি বিরোধী জোট সরকার গড়ার ডাক দিয়ে দিয়েছেন তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এবং টিআরএস নেতাকে চন্দ্রশেখর রাও। এরই মধ্যে বিজেপির উদ্বেগ বাড়িয়ে কিছুটা উল্টো সুরে কথা বলছেন বিহারে তাদের জোটের শরিক মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। রাজনৈতিক দলগুলোর এই তত্পরতা কোন পথে যাবে তা জনতার রায় নির্ধারণ করবে। কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ২০০৪ সালের নির্বাচনে নানা হিসেবে এগিয়ে ছিল বিজেপি। কিন্তু নিরব ভোটাররা পার্থক্যটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এবারো তেমন কিছু হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।