মা ল দ্বী প

গণতন্ত্র বনাম পুলিশ

মালদ্বীপে পুলিশের বিশাল ক্ষমতা! নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে দেয়া, আবার শেষ মুহূর্তে এসে নির্বাচন বাতিল করে দেয়ার শক্তি রাখে তারা। বলতে গেলে, সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশীদের মুখের গ্রাসই কেড়ে নেয়া হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তিনি ব্যাপক ষড়যন্ত্রের শিকার। প্রথম দফার নির্বাচনে ৪৫.৪৬ শতাংশ ভোট পেলেও সে ফলাফল বাতিল করে দেয়া হয়। অভিযোগ— ভোটার তালিকায় এমন ব্যাক্তিদেরও নাম ছিল যারা ইহলোকে আর নেই কিংবা পুরোপুরি বানোয়াট এবং এসব নামে ভোটও দেয়া হয়েছে। নাশীদ ভাবছিলেন, পুণঃনির্বাচনে কাঙ্খিত ৫০ শতাংশের বেশি ভোট ঠিকই পেয়ে যাবেন, যাতে তার দীর্ঘ ১৯ মাসের অপেক্ষার অবসান ঘটবে। কিন্তু তাও হল না। কেন্দ্রে ব্যালট পেপার পাঠানোর সময় নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে নির্বাচন স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়ায়। পুলিশের মুখপাত্র আব্দুল্লা নেওয়াজ এ বিষয়ে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর অনুমোদিত ভোটার তালিকা তালিকা দেখাতে পারেনি নির্বাচন কমিশন।’ কিন্তু প্রকৃত তথ্য হল— নাশীদের দুই প্রতিদ্বন্দী ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা, ভোটার তালিকা সংশোধন অথবা নির্বাচনের ব্যাপারে স্থিতাবস্থা চেয়ে হাই কোর্টে যে আবেদন করেছিল, তার প্রেক্ষিতে কোনো সুস্পষ্ট রায় দেয়া হয়নি। অথচ নাম ভাঙানো হচ্ছে হাই কোর্টের। নির্বাচন কমিশনের প্রধান ফুয়াদ তৌফিক অভিযোগ করেন, গত ১৯ অক্টোবর নির্বাচন সামগ্রী বিতরনকালে বেশ ক’জন পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর অফিসে ঢুকে সকল কাজ থামিয়ে দেয়। তাঁর মতে, পুলিশের লোকেরা নিঃসন্দেহে তাদের সীমা লঙ্ঘন করেছে এবং এই অযাচিত হস্তক্ষেপ কিছুতেই মানা যায় না। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন ফের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। আগামী ৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে সে নির্বাচন। তাতে কেউ কাঙ্খিত ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ১৬ নভেম্বর। এতেও সমস্যার সুরাহা আসবে বলে মনে হয় না। ধারনা করা হচ্ছে, নাশীদের প্রধান প্রতিদ্বন্দী ইয়েমিন আব্দুল্লাহ কাইয়ুম ও অপর প্রার্থী কাসিম ইব্রাহিম মিলে সে নির্বাচন বর্জন করতে পারেন। এমন হলে সাংবিধানিক সঙ্কটের সুযোগে সে নির্বাচনও বাতিল হয়ে যেতে পারে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওয়াহিদ হাসান মানিক এরই মধ্যে নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটিও মানিকের একটি চাল। ছলেবলে-কৌশলে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবেই থেকে যেতে চান। প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুলিশ বাহিণীর প্রথম পছন্দ তিনিই। প্রথম দফার নির্বাচনে মোহামেদ নাশীদের প্রাপ্ত ভোটের পরিমান ছিল ৯৫,২২৪। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দী সাবেক ‘স্বৈরশাসক’ মামুন আব্দুল গাইয়ুমের সত্ভাই ইয়েমিন আব্দুল্লা কাইয়ুম পেয়েছিলেন ৫৩,০৯৯ ভোট, যা প্রদত্ত মোট ভোটের ২৫.৩৫ শতাংশ। ৫০,৪৬২টি বা ২৪.০৭ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান দখল করেছিলেন রিসোর্ট টাইকুন, গাইয়ুম সরকারের অর্থমন্ত্রী এবং মালদ্বীপের সবচে’ ধনী লোক কাসিম ইব্রাহিম। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মোহামেদ ওয়াহীদ হাসান মানিকের ঠাঁই হয়েছিল সবার শেষে। তিনি পেয়েছিলেন মাত্র ৫ শতাংশ ভোট। ২০১২ সালে মোহামেদ নাশীদ ক্ষমতা ছাড়ার সময় ওয়াহীদ ছিলেন তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট। প্রধান বিচারক আব্দুল্লা মোহামেদকে পক্ষপাতিত্বের দায়ে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়ে জনরোষের মুখে ক্ষমতা ছেড়েছিলেন নাশীদ। কিন্তু তিনি দাবি করেন, মামুন আব্দুল গাইয়ুমের অনুগত পুলিশ বাহিণী অভ্যুত্থানের মাধমে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। নির্বাচনের প্রথম দফায় প্রায় ৯০ শতাংশ লোক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন। প্রায় ১২০০ দ্বীপ নিয়ে গঠিত মালদ্বীপের লোকসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। উল্লেখ্য, আর মাত্র ১০ হাজার ভোট পেলেই প্রেসিডেন্ট হয়ে যেতেন নাশীদ। তখন দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের প্রয়োজন পড়ত না। মালদ্বীপের ইতিহাসে প্রথম অবাধ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৮ সালে। তাতে আন্নি (নাশীদের ডাকনাম) জয় পাওয়ায় মামুন আব্দুল গাইয়ুমের দীর্ঘ ৩০ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছিল। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমতা ছাড়ার পর গ্রেফতারের ভয়ে আশ্রয় নিয়োছলেন ভারতীয় দূতাবাসে। তবে ক্ষনিকের জন্যও নিরাশ হওয়ার পাত্র তিনি নন; প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ফের নির্বাচনে লড়ার। তাঁর পুরো নাম এইচ.ই মোহামেদ নাশীদ। কর্মজীবনের শুরুটা ছিল সাংবাদিকতা দিয়ে। তবে এ লাইনে বেশিদিন টেকেননি; নেমে পড়েছিলেন রাজনীতিতে। ১৯৯৯ সালে রাজধানী মালে থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পরই তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইয়ুমের সঙ্গে বিবাদে জড়ানোর অপরাধে। উপরন্তু দেয়া হয়েছিল ১৬ মাসের জেল। ইংল্যান্ডে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করা নাশীদের মালডিভিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি’র যাত্রা শুরু ২০০৩ সালে। তিনি তাঁর সোজাসাপ্টা কথার জন্য বিখ্যাত। বিচক্ষণ ও সত্ মোহাম্মদ নাশীদ সকল ষড়যন্ত্রই আাঁাচ করতে পারছেন। ১৯ অক্টোবরের নির্ধারিত নির্বাচন না হওয়ার প্রতিবাদে নাগরিক অবাধ্যতার প্রমানস্বরূপ রাজধানী মালের এক রাস্তায় বসে চা পান ও নাস্তা সেড়ে নেন। যে কোনো অজুহাত দেখিয়ে আবার নির্বাচন বাতিল করা হতে পারে, এটি বুঝতে পেরেই তিনি আগামী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী জানিয়েছেন, যার প্রধান হিসেবে তিনি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নাম প্রস্তাব করেছেন। এখানেও শঙ্কা থেকে যায়, কারণ কারো কারো মতে, পুলিশ ও বিচার বিভাগ চলে সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইয়ুমের অনুসারীদের কথায়। তবে অনেকেই একটি বিষয় ভেবে অবাক হচ্ছেন, মালদ্বীপের গণতন্ত্র পুণরুদ্ধারে ভারত কেন এখনও হস্তক্ষেপ করছে না। মোহাম্মদ নাশীদের প্রতি তাদের কিছুটা দুর্বলতাও রয়েছে। ১৯৭০’র দশকে পৃথিবীর দরিদ্রতম ২০টি দেশের তালিকায় জ্বলজ্বল করতো মালদ্বীপের নাম। সে জায়গায় তারা উঠে এসেছে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কাতারে। নিঃসন্দেহে বিষ্ময়কর এই উত্থান। তাদের উন্নয়নের গতি দেখে ধারনা করা হচ্ছিলো, খুব শীঘ্রই মধ্যম আয়ের দেশ বনে যাবে তারা। কিন্তু গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ব্যাতিরেকে সহসাই মালদ্বীপের অর্থনৈতিক উত্তরণের কোনো সম্ভাবনাই নেই। উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ কামনা করেই দেশের বেশিরভাগ লোক মোহাম্মদ নাশীদকে ফের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চাচ্ছে; কিন্তু পুলিশ বাহিণী তা চাচ্ছে না।