পথে-ঘাটে

- ক্যাড়াবেড়া লেগে যাবে। টেলিভিশনের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে বললেন একজন বয়স্ক লোক। - কেউ এক ইঞ্চিও নড়বে না। সুর মিলিয়ে বলল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরো একজন। হরতাল। কাজ নেই বললেই চলে কাওরান বাজারের ব্যবসায়ীদের। কাজ নেই এই বাজার এলাকা ঘিরে থাকা কুলিদেরও। টেলিভিশনের সামনে এখন ভিড় বেশি। চায়ের দোকানের সাথে টেলিভিশন। চায়ের সাথে খবর ফ্রি। এই আকর্ষণে দোকানে ভিড়। পাশাপাশি দুই চায়ের দোকান। দুইটিতেই টেলিভিশন। একটিতে খবর। অন্যটিতে বিনোদন। কাওরান বাজারের বিনোদন চলা চায়ের দোকানে তেমন ভিড় নেই। বেশ অবাক করার মতো। পাশে খবর চলতে থাকা চায়ের দোকানে টেলিভিশন দেখতে হচ্ছে দূর থেকে। দোকানে চারটি বেঞ্চ ছাড়িয়ে সাপ খেলা দেখার মতো ভিড়। পেছন থেকে গলা লম্বা করে খবর শোনার ভান। কিছুক্ষণ পরে স্বভাব-সুলভ কথোপকথন শুরু। পরিচিত অপরিচিত দেখার বালাই নেই। যেন সবাই একই পথের পথিক। সবাইকে এ কথা শুনতেই হবে। যেন পেট থেকে সয়ংক্রিয়ভাবে কথা বের হয়ে আসছে। পাশেই একজন বলতে শুরু করল। - ক্যাচাল বাঁধবো। - তত্ত্বাবধায়ক দেবে, তবে লাশ ফেলবো অনেকগুলো। হেই জন্যি অপেক্ষা করছে। - সহজে মানতো না কেউ। - কিভাবে যে সমাধান হবে ভাইবে পাই না। - পাবলিক মাইরে হের পর তত্ত্বাবধায়ক দিব। - কিছু লাশ হবে তারপর। খুব কম কম কথা সবার মধ্যে। একই কথা ঘুরে ফিরে। কেউ একজন তার নিজের মতো করে কথা বলছে। মাঝে মাঝে সেই কথার চেয়ে যেন খবরটাই বেশি জরুরি। তাই টেলিভিশনের পর্দার কথা শুনতেই বেশি আগ্রহী। কে কি বলল তার দিকে খেয়াল নেই। কারো লুঙ্গি পরা। কারো ঘাড়ে গামছা। বিজ্ঞাপন চলছে। একজন লম্বা গল্প শুরু করলেন। - হেই একবার একজনে হরতালের মধ্যে এক এক করে দশ ট্রাক কাঁঠাল কিনলেন। এক দিন, দুই দিনে হরতাল শেষ হইয়া যাইবো। সে কাঁঠাল কিনতেই থাকে; কিন্তু হরতাল আর শেষ হয় না। ১৫ দিন একটানা হরতাল গেল। এরমধ্যে কাঁঠাল পাইকা গলে গেছে। আর তাই দেখে সেই লোক জায়গায় স্ট্রোক কইরা মরছে। এই আমার নিজের চোখে দেখা। - সব ধরা। সব ধরা। এইভাবে হরতাল হলি পরে সব ধরা খাইতে হইবো। খবর শেষ হয়ে টক শো শুরু হলো। তবু ভিড় কমলো না। টক শোতে একজন আওয়ামী লীগ একজন বিএনপি আর একজন সাজার মতো। যখন যিনি কথা শুরু করছেন তখন তিনি বলেই চলেছেন। উপস্থাপক থামাতে পারছেন না। দর্শকসারির একজন উপস্থাপকের ভূমিকা নিলেন। বলে উঠলেন, আরে চুপ কর অন্যরে বলতে দে। তোর কথা আবার তো কইতে পারবি। পাশে আরো একজন আস্তে আস্তে বললেন, এই হানেই চুপ থাকতে পারছে না, আর এক লগে বইবো। উপস্থাপকের থামতে বলতে থাকা আর আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতার চুপ না করার দৃশ্যে মজাই পাচ্ছে কেউ কেউ। কয়েকজন হেসে উঠলো ‘লাইগা গেছে’ বলে।