রাজনৈতিক সহিংসতায় পাঁচ দিনে প্রাণ গেলো ২১ জনের

২৫ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে রাজনৈতিক সংঘর্ষে ২০ জন নিহত ও সহস্রাধিক আহত হয়েছেন। ভাংচুর করা হয়েছে অসংখ্য গাড়ি, বাড়িঘর ও দোকানপাট। সারাদেশে শতাধিক যানবাহন জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে ব্যক্তি ও সরকারি মালিকানাধীন স্থাপনা। আহতদের অনেকেই পঙ্গু হয়ে গেছেন। কেউ যানবাহনে অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিত্সাধীন, আবার কেউবা বোমার আঘাতে পঙ্গুত্বও বরণ করেছেন। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় পৃথক মামলা হয়েছে। পুলিশের হাতে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার। তবে এর বেশিরভাগই বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও নিরীহ মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঢাকা মেট্রোপলিটন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ও বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। বিশেষ করে রাজধানীতে এই পাঁচদিনে সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ককটেল হামলার ঘটনা ঘটেছে। এরপরও আইন ভঙ্গ করে মিছিল সমাবেশ ও পরবর্তীতে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ২৫ অক্টোবর চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৮ দলীয় জোট নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে ৩ যুবদল কর্মী নিহত হয়। কক্সবাজারের চকরিয়ায় ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে ১৮ দল মিছিল সমাবেশ করলে পুলিশ ও বিজিবি গুলি ছুঁড়লে ২ জন বিএনপি কর্মী প্রাণ হারান। নীলফামারীর জলঢাকায় পুলিশের গুলিতে একজন শিবির কর্মী ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরে একজন বিএনপি কর্মী হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় আওয়ামী লীগের ছোঁড়া ইটের আঘাতে ঐ কর্মী নিহত হয়েছেন। ২৬ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কাজলা গেটে পুলিশ ও র্যাবের সাথে শিবিরের সংঘর্ষে এক শিবির কর্মী নিহত হন। এরপরে ১৮ দলীয় জোটের ডাকা ৬০ ঘন্টার হরতালের প্রথম দিনে সারাদেশে ৪ জন নিহত হন। যশোরের অভয়নগরে যুবলীগ নেতা, ফরিদপুরের নগরকান্দায় বিএনপি নেতা, পিরোজপুরের জিয়ানগরে যুবলীগ কর্মী ও পাবনার ঈশ্বরদীতে জামায়াত কর্মী নিহত হয়। হরতালের দ্বিতীয় দিনে ঝিনাইদহে বিএনপি নেতা, জামালপুরে যুবলীগ কর্মী, টাঙ্গাইলে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে যুবদল কর্মী, চাঁদপুরে শিশু ও চট্টগ্রামে পিকেটারদের ধাওয়ায় ট্রাক চালক নিহত হন। ৬০ ঘন্টার হরতালের শেষ দিনে গতকাল মঙ্গলবার মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সংঘর্ষের সময় পুলিশ গুলি চালালে মারুফ হোসেন (১৮) নামে এক কিশোর নিহত হয়। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া পুলিশের গুলিতে ৩ জন শিবির কর্মী নিহত হয়েছেন। তবে জামায়াত ইসলামীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে ৫ জন নিহত হয়েছেন। রাতে তিনটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতরা হলেন, আবু সিদ্দিক (৫৫), মোঃ ইউনুস (৩৫) ও মোঃ ইসমাইল (৪০)। এরা জামায়াতের কর্মী বলে দাবি করা হয়েছে। গত শুক্রবার চকোরিয়ায় মৃত্যুর ঘটনা এবং গতকাল কুতুবদিয়ায় মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে কক্সবাজার জেলায় কাল বৃহস্পতিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছে ১৮ দলীয় জোট। বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী বলেছেন কক্সবাজার জেলায় এই হরতাল পালন করা হবে। তবে জামায়াত বলেছে, হরতাল হবে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগে। সারাদেশে ৬৪ জেলার মধ্যে শেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, ঝালকাঠি, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, বান্দরবান, নড়াইল ও গোপালগঞ্জে বড় ধরনের কোন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। ঢাকা, চাঁদপুর, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, কক্সবাজার, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, নীলফামার, যশোর, পাবনা, চট্টগ্রাম, জামালপুর ও রাজশাহীতে বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে রাজধানীতে আনুমানিক পাঁচ শতাধিক ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। ৪০টি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। ঢাকার বাইরে সারাদেশে প্রায় ৬০টি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। সারাদেশে সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিত্সা নিচ্ছে। এদের মধ্যে ২০ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। ঢাকায় ৭১ টেলিভিশনের দুই সংবাদ কর্মীসহ সারাদেশে ১০ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। পুলিশ সদর দফতরের একটি সূত্র জানায়, এসব ঘটনায় সারাদেশে প্রায় ২শ’ মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় এ পর্যন্ত সাড়ে ৫ হাজার জন গ্রেফতার হয়েছে।