তার নাম লেখা থাকবে ভক্তদের হূদয়ে

‘যদি কাগজে লেখো নাম/সে কাগজ ছিড়ে যাবে/যদি পাথরে লেখো নাম/সে পাথর ক্ষয়ে যাবে/যদি হূদয়ে লেখো নাম/সে নাম রয়ে যাবে’—জনপ্রিয় এই গানটির গায়ক কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন পরপারে। তবে সত্যিকার অর্থে সবার প্রিয় এই মানুষটির নাম চিরকাল লেখা থাকবে ভক্তদের হূদয়ে। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রইল আনন্দ বিনোদনের এ আয়োজনটি। লিখেছেন খালেদ আহমেদ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রবাদপ্রতিম সংগীতশিল্পী মান্না দে ১৯১৯ সালের ১ মে কলকাতার একটি সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আসল নাম প্রবোধ চন্দ্র দে হলেও দীর্ঘ ষাট বছরের সংগীতময় জীবনে ‘মান্না দে’ নামেই খ্যাতি লাভ করেন। তার বাবার নাম পূর্ণ চন্দ্র এবং মা মহামায়া দে। জন্মের পর পিতা-মাতার সংস্পর্শ ছাড়াও, পিতৃসম্পর্কীয় সর্বকনিষ্ঠ কাকা সংগীতাচার্য (সংগীতে বিশেষভাবে দক্ষ শিক্ষক) কে সি দে (কৃষ্ণ চন্দ্র দে) তাকে খুব বেশি অনুপ্রাণিত ও উত্সাহিত করেছেন। ‘ইন্দু বাবুর পাঠশালা’ নামে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর স্কটিশ গির্জা কলেজিয়েট এবং স্কটিশ গির্জা কলেজ থেকে স্নাতক শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। স্কটিশ চার্চ কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি তার সহপাঠীদের গান শুনিয়ে আসর মাতিয়ে রাখতেন। কাকা কৃষ্ণ চন্দ্র দে এবং ওস্তাদ দাবির খানের কাছ থেকে গানের শিক্ষা লাভ করেন তিনি। ওই সময় আন্তঃকলেজ গানের প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে তিন বছর তিনটি আলাদা শ্রেণীবিভাগে প্রথম হয়েছিলেন মান্না দে। ১৯৪২ সালে কাকা কৃষ্ণ চন্দ্র দের সঙ্গে মুম্বাই দেখতে যান তিনি। সেখানে শুরুতে কৃষ্ণ চন্দ্র দের অধীনে সহকারী হিসেবে এবং তারপর শচীন দেব বর্মণের (এসডি বর্মণ) অধীনে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি অনেক স্বনামধন্য গীতিকারের সান্নিধ্যে আসেন এবং তারপর স্বাধীনভাবে নিজেই কাজ করতে শুরু করেন। ওই সময় বিভিন্ন হিন্দি চলচ্চিত্রের জন্য সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি ওস্তাদ আমান আলি খান এবং ওস্তাদ আবদুল রহমান খানের কাছ থেকে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেন তিনি। ১৯৪৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘তামান্না’ চলচ্চিত্রে গায়ক হিসেবে মান্না দের অভিষেক ঘটে। সুরাইয়ার সঙ্গে দ্বৈত সংগীতে গান করেছিলেন এবং এর সুরকার ছিলেন কৃষ্ণ চন্দ্র দে। ওই সময় গানটি ভীষণ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৫০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মশাল’ ছবিতে শচীন দেব বর্মণের গীত রচনায় ‘ওপার গগন বিশাল’ নামে একক গান গেয়েছিলেন মান্না দে। এ গানের কথা লিখেছিলেন কবি প্রদীপ। ১৯৫২ সালে মান্না দে বাংলা এবং মারাঠী ছবিতে একই নামে এবং গল্পে ‘আমার ভূপালী’ শীর্ষক একটি গান। এসবের মধ্য দিয়েই সংগীতাঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত ও পাকাপোক্ত করেন তিনি এবং জনপ্রিয় গায়ক হিসেবে সংগীতপ্রেমীদের কাছ থেকে স্বীকৃতি পান। মান্না দে ভীমসেন জোসির সঙ্গে একটি জনপ্রিয় দ্বৈত গান ‘কেতকী গুলাব জুহি’ গান করেন। তিনি কিশোর কুমারের সঙ্গে আলাদা গোত্রের দ্বৈত গান হিসেবে ‘ইয়ে দোস্তি হাম নেহি তোরেঙ্গে’ (শোলে) এবং ‘এক চতুর নার’ (পদোসান) গান করেন। এ ছাড়াও মান্না দে শিল্পী ও গীতিকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়সহ বেশকিছু গীতিকারের সঙ্গে বাংলা ছবিতে গান গেয়েছিলেন। দ্বৈত সংগীতে লতা মুঙ্গেশকারের সঙ্গে ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ (শঙ্খবেলা) গান করেছেন। রবীন্দ্র সংগীতসহ প্রায় ৩৫০০ গান গেয়েছেন এ সংগীতজ্ঞ। ১৯৫৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর দক্ষিণাঞ্চলের কেরালার মেয়ে সুলোচনা কুমারনকে বিয়ে করেন মান্না দে। তাদের সংসারে শুরোমা ও সুমিতা নামে দুই কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে। গায়ক হিসেবে আধুনিক বাংলা গানের জগতে সর্বস্তরের শ্রোতাদের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ও সফল সংগীত ব্যক্তিত্ব মান্না দে। বিশেষ করে, হিন্দি ও বাংলা সিনেমায় গায়ক হিসেবে অশেষ সুনাম কুড়িয়েছেন তিনি। কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার এবং মুকেশদের মতো তিনিও ১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ২০০৫ সালে বাংলা ভাষায় তার আত্মজীবনী ‘জীবনের জলসাঘরে’ খ্যাতিমান আনন্দ প্রকাশনীর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরে এটি ইংরেজিতে ‘মেমরিজ কাম অ্যালাইভ’, হিন্দিতে ‘ইয়াদেন জি ওথি’ এবং মারাঠী ভাষায় ‘জীবনের জলসাঘরে’ নামে ভাষান্তর হয়। মান্না দের জীবনী নিয়ে ‘জীবনের জলসাঘরে’ নামে একটি তথ্যচিত্র মুক্তি পায় ২০০৮ সালে। মান্না দে সংগীত একাডেমি তার সম্পূর্ণ আর্কাইভ বিকশিত ও রক্ষণাবেক্ষণ করছে। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় মান্না দে’র সংগীত সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ষাট বছরের সংগীত জীবনে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতের সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ এবং ‘পদ্মবিভূষণ’ খেতাবসহ অসংখ্য খেতাব অর্জন করেন তিনি। এ ছাড়া ২০০৪ সালে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও ২০০৮ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ডি.লিট সম্মাননা লাভ করেন। ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ শীর্ষক বিখ্যাত গানের এ গায়ক বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, আসামিসহ বিভিন্ন ভাষায় অজস্র গান গেয়ে বিশ্ব সংগীতাঙ্গনে নিজের স্থান করে নিয়েছেন। বৈচিত্র্যের বিচারে তাকেই হিন্দি গানের ভুবনে সর্বকালের সেরা গায়ক হিসেবে স্বীকার করে থাকেন অনেক সংগীতবোদ্ধা। মা ন্না দে’ র কি ছু জ ন প্রি য় গা ন বাংলা  কফি হাউজের সেই আড্ডা  সবাই তো সুখী হতে চায়  যদি কাগজে লেখো নাম  পৌষের কাছাকাছি রোদ মাখা সেইদিন  কতদিন দেখিনি তোমায়  এই কূলে আমি  কথা দাও  খুব জানতে ইচ্ছে করে  আমি সারারাত  এ নদী এমন নদী  মাঝরাতে ঘুম  এই আছি বেশ  এই রাত যদি  কি এমন কথা  ক’ফোঁটা চোখের জল  সে আমার ছোটবোন  দীপ ছিল শিখা ছিল  যদি হিমালয়-আল্পসের সমস্ত জমাট বরফ  শাওন রাতে  আমার ভালবাসার রাজপ্রাসাদে  স্বপ্নে বাজেগো বাঁশি  তীর ভাঙা ঢেউ  না না যেও না  তুমি আর ডেকো না  সুন্দরী গো দোহাই দোহাই হিন্দি  ইয়ারি হে ইমান মেরা ইয়ার মেরি জিন্দেগি  না মাঙ্গু সোনা চান্দি  জিন্দেগি ক্যায়সি হে পাহেলি হায়  পেয়ার হুয়া ইকরার হুয়া  লাগা চুনরি মে দাগ  এ মেরি জোহরা জাবিন  চুনরি সামহাল গোরি  এক চতুর নার কারকে সিঙ্গার  ইয়ে দোস্তি হাম নেহি তোরেঙ্গে  মুড় মুড় কে না দেখ