বাগেরহাটের বাঘ!
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০১৩, ২১:০৭
এ পাশে ভৈরব ও পাশে রূপসা নদী; মাঝে এক সময় ঝিক ঝিক করে চলতো ট্রেন। ট্রেন হলে কী হবে! তাতে না ছিল বুলেটের গতি, না ছিল ‘এক্সপ্রেস’-এর ত্রাস। সেই ট্রেন চলতো দুলকি চালে, ধীর গতিতে। এমন ট্রেনের শহর বাগেরহাটে জন্মে কী আর পাঞ্জাব, মেলবোর্ন, লাহোর বা নড়াইল এক্সপ্রেস হওয়া যায়!
তাহলে বাগেরহাটের ছেলেটি কী ফাস্ট বোলার হতে পারবে না? অবশ্যই পারবে। এক্সপ্রেস ট্রেন না থাকলে কী হবে, বাঘ তো আছে! এই জেলাতেই বাস করে পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম, সুন্দরতম বাঘ দ্য রয়েল বেঙ্গল। ছেলেটি তাই বাঘই হয়ে উঠল। অন্তত গতপরশু মঙ্গলবার রাতে সারা ক্রিকেট দুনিয়া একবারে বুঝে ফেললো, আসলেই ছেলেটি একটি বাঘ— বাগেরহাটের বাঘ রুবেল হোসেন!
চিরকাল পেস বোলারের হাহাকার নিয়ে পথচলা বাংলাদেশের জন্য রুবেল হোসেন শুরু থেকেই একটা বড় সম্পদ ছিলেন। কিন্তু গত বছর দুই ধরে ইনজুরি আর ফর্মহীনতা মিলিয়ে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই পড়ে গিয়েছিলেন রুবেল। ফিসফিসটা গুঞ্জনে পরিণত হচ্ছিল—রুবেল কী ফুরিয়ে গেলেন! অবশেষে রুবেল প্রমাণ করলেন বাঘেরা ফুরায় না। হ্যাটট্রিকসহ ৬ উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশকে জেতালেন ম্যাচ, আর নিজে ফিরে পেলেন হারিয়ে না যাওয়ার স্বস্তি।
গতকাল সকালে হোটেল লবিতে বসে কথা বলতে বলতে রুবেল বারবার ফিরে যাচ্ছিলেন এই স্বস্তির ব্যাপারটায়। একবারও লুকানোর চেষ্টা করলেন না যে, এমন একটা পারফরম্যান্স তার অস্তিত্বের স্বার্থেই বড় জরুরী ছিল, ‘আসলে পিছিয়ে পড়ছিলাম আমি। বেশিরভাগ সময়ই ভালো বল করছিলাম কিন্তু উইকেট পাচ্ছিলাম না। বুঝতে পারছিলাম, কিছু বাড়তি কাজ করতে হবে। আর ইনজুরি... ওফ! একবার ইনজুরিতে পড়ি, ফিরে আবার কিছু করার আগেই বাইরে চলে যাই। শেষ বার পক্সের কারণে মাঠের বাইরে গেলাম। সবমিলিয়ে যেখানে থাকার কথা ছিল, সেখানে আমি থাকতে পারিনি। তাই এরকম একটা কিছু খুব জরুরী ছিল। আমি খুব খুশি কারণ, এই লড়াইটায় অন্তত নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছি।’
লড়াই ব্যাপারটা রুবেল হোসেনের শরীরে অবশ্য অনেক আগে থেকেই অভ্যেসের মতো করে জড়িয়ে আছে।
বাগেরহাটের দড়াটানা ডাক নামের ভৈরব নদীর বাঁকের মুখেই একেবারে সাধারণ এক পরিবারে জন্ম রুবেলের। আজকের রুবেল যখন পিচ্চি ছেলে, তখনই সারা জেলার লোকেরা তাকে চিনতো এই জোরে বল করতে পারা আর বড় বড় ছক্কা মারতে পারার কারণে। বাগেরহাট তো বটেই, খুলনা-যশোর পার করে নড়াইলেও চলে গিয়েছিল তার নাম। সেখানেই এক টেনিস বলের টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে তখনই জাতীয় তারকা হয়ে যাওয়া মাশরাফিকে বিনা রানে আউট করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন।
কিন্তু মাশরাফিকে আউট করে তো আর জাতীয় দলে আসা যায় না। সেটা এলেন গ্রামীণ ফোনের পেসার হান্ট কর্মসূচির ভেতর দিয়ে। রুবেল তখন ঢাকায় বাছাই লিগ পার করে তৃতীয় বিভাগে খেলেন। ক্রিকেট ছেড়ে দিতে হবে বলেই মনে হচ্ছিল তার। নিজেই কাল আবার বলছিলেন, ‘আর ক্রিকেট চালিয়ে যেতে পারতাম না। ওই লেভেলে খেলে বাংলাদেশে কোনো পেসারের পক্ষে দৃষ্টি কাড়া প্রায় অসম্ভব। আসলেই পেসার হান্টটা না হলে আমার কোনো খোঁজ থাকতো না।’
এই আশীর্বাদ হয়ে আসা পেসার হান্টে ঘটনাচক্রে নিজের জেলা থেকে নয়, সাতক্ষীরা থেকে পরীক্ষা দিয়ে দেশের সেরা পেসার হয়ে চলে এলেন ঢাকায়। আর সেখানেই চোখে পড়লেন পেসার হান্টে কাজ করা, সাবেক জাতীয় দল কোচ সারওয়ার ইমরানের। ‘ইমার স্যার’-এর কথা বলতে বলতে রীতিমতো ছল ছল করে উঠলো রুবেলের চোখ, ‘আজ আমি যা, মনে হয় প্রায় পুরোটাই স্যারের অবদান। সেই প্রথম যেদিন স্যার সাতক্ষীরায় দেখেছিলেন, সেই থেকে সবসময় আমাকে দেখে রেখেছেন। আমি ক্যাম্পে ডাক পাওয়ার আগে স্যার ফোন করে আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসতেন জাতীয় দলের নেটে বল করার জন্য; যাতায়াত খরচটাও স্যার দিয়ে দিতেন!’
সেই নেটে বল করতে গিয়েই আসলে প্রথম ‘তারকা’ হয়ে গেলেন রুবেল। জাতীয় দল তখন যাবে শ্রীলঙ্কা সফরে। তখন রুবেল বল করতেন অনেকটাই লাসিথ মালিঙ্গার মতো সিলিং অ্যাকশনে। ফলে পত্রিকায় লেখা হল—বাংলাদেশের নেটে মালিঙ্গা!
তারপর অনূর্ধ্ব-১৯ দল, জাতীয় দল; আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি রুবেলকে। ২০১১ সাল পর্যন্ত এই নামের প্রতি সুবিচার করে সাফল্যও পেয়েছেন। কিন্তু সমস্যাটা হতে শুরু করল ২০১১ সালের জিম্বাবুয়ে সফরের পর থেকে। ওই সফরের পর থেকে গত পরশুর আগ পর্যন্ত টেস্টে ইনিংসে ৩ উইকেটও আর পাননি, ওয়ানডেটেও পাননি এক ম্যাচে ৩ উইকেট! অবশ্য ওয়ানডেটা এই সময়ে ইনজুরির চোটে খুব একটা খেলতেও পারেননি।
ইনজুরি ছাড়াও এই উইকেট না পাওয়ার ব্যাপারটা ভাবাচ্ছিল রুবেলকে। সমাধান? সমাধান সেই ইমরান স্যার। রুবেল নিজেই বললেন, ‘এই সময়ে খুব কষ্ট করেছি। ফিটনেস বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। সবচেয়ে বেশি কাজ করেছি স্যারের সঙ্গে। স্যার কিছু জিনিস ঠিকঠাক করে দিয়েছেন। সবমিলিয়ে এই মৌসুমের শুরু থেকেই বুঝতে পারছিলাম, আবার সেরা অবস্থায় ফিরে আসছি।’
সেটা রুবেলের বুঝতে পারার কথা। লিগের প্রথম দুই ম্যাচে ১১ উইকেট আর এক হ্যাটট্রিক নিয়ে শুরু হয়েছে এ বছরটা তার। ফলে এমন একটা সাফল্য তিনি অনুমান করতেই পারেন। তাই বলে এই আন্তর্জাতিক ম্যাচে হ্যাটট্রিকসহ ৬ উইকেটের সাফল্য কী পৃথিবীর কেউ অনুমান করতে পারে? রুবেল হাসলেন, ‘বৃষ্টির পর উইকেটটা খুব পেস সহায়ক হয়ে গিয়েছিল। ফলে ৬ উইকেটটা হয়তো ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু হ্যাটট্রিক! আসলে হ্যাটট্রিক তো লাক, টাইমিং অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। শুধু বলতে পারি দলের সবার দারুণ সাপোর্ট আর আল্লাহ চেয়েছেন বলে হ্যাটট্রিক হয়েছে। হ্যাটট্রিক তো রোজ রোজ হবে না; দোয়া করবেন, এমন পারফরম্যান্স যেন করে যেতে পারি।’
সেটা করে গেলেই তো লোকে মেনে নেবে যে, রুবেল আসলেই বাগেরহাটের বাঘ!