কেমন প্রকৌশলী চাই
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১৫
আমাদের দেশের ভবিষ্যত্ নির্ভর করছে টেকসই, পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের উপর। উন্নয়ন হতে হবে সুপরিকল্পিত, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা-চেতনার আলোকে। টেলিযোগাযোগের মতো সডক, রেল, নৌ যোগাযোগে নিয়ে আসতে হবে আমূল পরিবর্তন। থাকতে হবে উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়া, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা। শক্তি খাতকে দিতে হবে সর্ব্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সেইসাথে শক্তির নতুন নতুন উত্স অনুসন্ধান এবং এর সর্ব্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারে জনগণকে উত্সাহ প্রদান এবং প্রণনাদনামুলক কর্মসূচি রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করতে হবে। শিল্পায়ন, নগরায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিব্যবস্থা আমাদের দেশকে গড়ার জন্য আশু প্রয়োজন। তরুণ প্রজন্মকে বেকারত্ব আর হতাশার অভিশাপ থেকে মুক্তিদিয়ে কর্মমুখি করতে হবে, দক্ষ জনবলে রূপান্তরিত করতে হবে এবং দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নের জন্য প্রত্যক্ষভাবে জড়িত আছে আমাদের প্রকৌশলী সমাজ। সেই সমাজের একজন নগণ্য সদস্য হিসেবেই আজকের এই ক্ষুদ্র লেখা।
অনেক আগে থেকেই আমাদের প্রকৌশল শিক্ষার অনেক সুনাম রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আমাদের প্রকৌশলীদের অবদান স্বীকৃত। বর্তমানে খুবই কষ্ট পাই যখন দেখি বিদেশি প্রকৌশলীরা বিশেষ করে ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, কোরিয়ার প্রকৌশলীরা আমাদের দেশে কাজ করে। শুধু তাই নয়, আমাদের প্রকৌশলীদেরকে তত্ত্বাবধান করে তারা। তাই প্রশ্ন জাগে, আমাদের প্রকৌশল শিক্ষার ঐতিহ্য কি হারিয়ে যাচ্ছে? আমাদের মনোবল শক্ত হচ্ছে না, আমরা পরিশ্রমী না, আমাদের সততা ও আন্তরিকতা নিয়ে জনগণের ঢালাও মন্তব্য, কর্মক্ষেত্রে আমরা বন্ধুবত্সল না ইত্যাদি অনেক অভিযোগই রয়েছে। আমাদের তরুণ প্রকৌশলীরা প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির অংক মেলাতে নিদারুণ মনোকষ্টে আছে। প্রকৌশল অঙ্গন যে অসীম, এ কথা আমরা ভুলতে বসেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে আর জ্ঞানচর্চার প্রয়োজন নেই, এমন মানসিকতা আত্মঘাতী। আমাদের নিজেদেরকে এবং এ দেশকে গড়তে প্রযুক্তির নব নব সব উপাদান উপকরণের সাথে আমাদের পরিচিতি ও তার প্রায়োগিক জ্ঞান রপ্ত করতে হবে। শুধু তাই নয়, একজন মিস্ত্রির কাছ থেকেও শিখতে হবে এবং তাকে শেখাতে হবে আমাদের প্রকৌশল জ্ঞান দিয়ে কীভাবে তার কাজ আরও সুন্দর করা যায়, সহজে করা যায়, দৃষ্টিনন্দন করা যায়, কম খরচে করা যায়, নিরাপদে করা যায় ইত্যাদি।
এক সিরামিক প্রকল্পে ঠিকাদার হিসাবে কাজ করার সময় দেখলাম এক ভারতীয় প্রকৌশলীকে। প্রকল্পের সবার কাছে অতিপ্রিয় একটি নাম, সদাহাস্য, সদালাপী এবং পরিশ্রমী, সর্বক্ষণ একটা সাইকেল নিয়ে ছুটছে প্রকল্পের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে; সিদ্ধান্ত দিচ্ছে, কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছে ও নিচ্ছে। প্রায় ১২ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এ তড়িত্ প্রকৌশলী এ প্রকল্পের ম্যানেজার। সমুদয় প্রকল্পের সকল যন্ত্রাংশ সংস্থাপন, পরীক্ষামূলক চালুকরণ এবং কমার্শিয়াল উত্পাদন নিশ্চিতকরণ তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। প্রায় ১০০ মিলিয়ন টাকার এ প্রকল্প ১ বছরের মধ্যে শেষ করার টার্গেট। নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম আর ধৈর্যের মাধ্যমে কাজ করে সে উক্ত প্রকল্প অত্যন্ত সাফল্যের সাথে শেষ করল। একই প্রকল্পে মালিক পক্ষের দেশিয় প্রকৌশলীদের কাজ করতে দেখেছি। আমাদের এক সিনিয়র প্রকৌশলী জিএম হিসাবে যোগদান করলেন এবং মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে চলে গেলেন। কারণ কী? কারণ হলো প্রকল্প সাইট ঢাকা থেকে দূরে, সাইট অফিস ভাল না, ফুলটাইম ট্রান্সপোর্ট নাই ইত্যাদি।
আমাদের অনুপস্থিতিতে আমাদের প্রকৌশলী ও ভারতীয় প্রকৌশলী সম্পর্কে অশিক্ষিত শ্রমিক মিস্ত্রিরা যে ভিন্ন ধারার মন্তব্য করত তা শুনে খুব কষ্ট লাগত।
এই লেখা কাউকে কষ্ট দেওয়ার জন্য নয়। এরপরও কেউ কষ্ট পেলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা তরুণ প্রকৌশল সমাজকে শাণিতকরণের জন্য, যারা আগামীতে আমাদের দেশকে গড়বে, দেশ-বিদেশে আমাদের প্রকৌশল শিক্ষার মানকে ও ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখবে, হীনমন্যতা দূর করবে, বিদেশি প্রযুক্তি ও প্রকৌশলীদেরকে গুডবাই বলবে।
হ্যাঁ, আমরা সেই প্রকৌশলী চাই।
প্রকৌশলী মো. শাহজাহান আলম
পার্টনার, মার্জস পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং